
বৈধ পথে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি ঝিনাইদহের সোহেল রানা। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো, আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পরে লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৮ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ঝিনাইদহের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় মানব পাচার, নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল তাঁকে কাতারে পাঠানো হয়। ৯০ দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাঁকে কাজ দেওয়া হয়নি। পরে দেশে ফেরার টিকিট পাঠানো হলেও তাঁকে ফিরতে না দিয়ে মিসর হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ, ওই টাকা দেওয়ার পর ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট তাঁকে মিসরে পাঠানো হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, সোহেলের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে তাঁকে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। পরে বেলারুশ হয়ে তাঁকে লাটভিয়ায় নেওয়া হয়। গত ২৫ আগস্ট তাঁর ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তারিখে টাকা পাঠানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ৯ অক্টোবর ইতালি থেকে অভিযুক্তদের একজন ফোন করে আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করেন বলেও মামলায় বলা হয়েছে।
সোহেলের শ্যালক ইশতিয়াক আহমেদ জানান, দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, ৬ অক্টোবর লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা সোহেলকে জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
একই চক্রের শিকার এক সহযাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁকেও বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে কাতারে নেওয়া হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, ইতালি পৌঁছাতে তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পথে সীমান্ত পার হতে হবে। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাঁর দাবি, একইভাবে আরও ১২ জনের দেশে ফিরতে না পারা বা বিভিন্ন দেশে আটকে থাকার বিষয়ে তিনি জানেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, রামচন্দ্রপুর ও হলিধানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার তথ্য তিনি পেয়েছেন।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, একই এলাকার কয়েকজন যুবক প্রায় এক যুগ ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গাড়ামারা গ্রামের রসুল মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া এবং রামচন্দ্রপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার আব্দুল্লার ছেলে হামেদ আলী ও মৃত তাইজেল মাস্টারের ছেলে জগত আলী রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, তাঁরা একসঙ্গে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালদের মাধ্যমে যাত্রা করেছিলেন। এরপর থেকে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মামলার বাদী জেসমিন সুলতানার অভিযোগ, টাকা ফেরত চাওয়া ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। ১৫ অক্টোবর তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় গেলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ পান বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন।
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায়, অনিশ্চিত যাত্রা এবং একের পর এক যুবকের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগে এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সোহেলের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিদেশে আটকে থাকা যুবকদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

