মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের শ্রদ্ধা নিবেদন

আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকাননে শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম  সরকার। তারপর থেকেই দিনটি মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

তবে এ বছর সরকারীভাবে কোন কর্মসূচী নেওয়া হয়নি। তবে, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

আজ শুক্রবার সকাল ৯ টার সময় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে জাতীর শ্রেষ্ট সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক, মুক্তিযোদ্ধা হাজী আহসান আলী খাঁন, মুক্তিযোদ্দা সন্তান সংসদ কমান্ডের মুজিবনগর উপজেলো সভাপতি মোখলেছুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম সহ অন্যান্য সদস্যরাউপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক বলেন, ‘১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস কোন রাজনৈতিক দিবস নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যে সরকারই আসুক না কেন এদিনটি সরকারি ভাবে পালন করা উচিৎ। যদিও আজ দিনটি সরকারি পালন হচ্ছে না। আমরা ব্যথিত হয়েছি।’
 এদিকে, বিকাল ৩ টার দিকে ঢাকা থেকে আগত নাগরিক সমাজ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা রয়েছে।



বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষি ওরা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ খ্রিস্টান পল্লী মেহেরপুরের মুজিবনগর।  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর-এর আম্রকাননে শুধু একটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়নি; সেখানে ইতিহাস গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত, নিঃশব্দ শ্রম আর সাধারণ মানুষের অসাধারণ অংশগ্রহণে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ একটি দিন, একটি দৃশ্য, একটি নিঃশব্দ প্রত্যয়ের নাম। মুজিবনগর-এর সেই বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন আজও যেন বাতাসে বহন করে সেই গোপন প্রস্তুতির গন্ধ, গ্রামবাসীর নিঃশব্দ সাহসের প্রতিধ্বনি। সকালের রোদ তখন নরম। আমগাছের ছায়া মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। ১৩ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকানন-এ দাঁড়িয়ে মনে হলো এই নীরবতা কখনোই নিছক নীরব ছিল না। ১৯৭১-এর সেই দিনটিতে, এই মাটিই ছিল উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্র। 

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পপথ গ্রহণ করেন। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিলুপ্তি হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (বর্তমানে মুজিবনগর) গ্রামের সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশ না নিলেও, তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সরকার গঠন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হতে পারতো না। তাদের ভূমিকা ছিল সমর্থন, সহানুভূতি, নিরাপত্তা, এবং সরবরাহ সংক্রান্ত সহায়তায়।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য যেকোনো ধরনের প্রস্তুতির জন্য গ্রামবাসীরা সহায়তা করেছিলেন। যেমন- মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের জন্য স্থান তৈরি, খাবার এবং পানীয় সরবরাহ, অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। তারা এই কাজগুলো নিজেরাই করেছিলেন।

সূর্য সেদিন ছিল নির্মম। বৈশাখের খরতাপ যেন মাটিকেও দগ্ধ করছিল। সূর্যও যেখানে মুজিবনগর আম্রকাননকে কুর্ণিশ করে। সেই মুজিবনগর আম্রকানন-এর গাছের ছায়াও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই তাপদাহ উপেক্ষা করেই ইতিহাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। সেদিন মেহেরপুরের ১২ জন আনসার সদস্য। সাধারণ পোশাকে, কিন্তু চোখে কঠোর দৃঢ়তা। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার-কে।

দেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেনÑ আমাদের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বড় ভূমিকা ছিল। ১৬ এপ্রিল জাতীয় নেতারাসহ ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন    মুজিবনগরে এসে স্থান নির্ধারণ করে যান। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সফল করার দায়িত্ব ছিল বিএসএফের। ১৭ এপ্রিল কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের একত্রিত করে বিশাল গাড়ী বহর নিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সবাই মুজিবনগরে হাজির হয়েছিল। সেদিন মুজিবনগরের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতনা।

সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দোয়াজ আলী বয়সের ভারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। স্মৃতি হাতড়ে জানান- সেদিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার, নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মূখার্জি এবং বিএসএফের ৭৬ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে: কর্ণেল চক্রবর্তী দুজনে সাদা পোশাক পরে আসেন। আমি সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জেনে মুজিবনগর আমবাগানের একটি স্থানকে চিহ্নিত করে একটি তোরণসহ মঞ্চের চর্তুরদিক বাঁশ দিয়ে ঘেরার নির্দেশ দিয়ে ফিরে গেলেন। তখনও জানিনা তারা এখানে কিসের অনুষ্ঠান করবে। নির্দেশমত এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে চৌকি, কাপড়, দড়ি, ঝাঁড় থেকে বাঁশ এবং দেবদারুর পাতা এনে স্থানীয়দের সহায়তায় তৈরী করা হয় তোরণ ও বড় মঞ্চ। সারারাত ধরে এই কাজ করা হয়। খুব সকালে তারা এখানে আসলে দেখেন ভারতীয় হেলিকপ্টার আকাশে মহড়া দিচ্ছে। এরপরপরই মুজিবনগর সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে অসংখ্য জীপ ও ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। এই সমস্ত গাড়ি করে জাতীয় নেতারাসহ বিদেশী সাংবাদিক ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা আসেন। বিএসএফ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অনুষ্ঠানের জন্য চেয়ার, মাইক, টেবিল সবই আসে ভারত থেকে। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাধারণ জনতাকে যে মিষ্টি ও পাউরুটি দেয়া হয়েছিল সেটাও এসেছিল ভারত থেকে।  

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় খ্রিস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পাঠ করা হয় ধর্মগ্রন্থ। ইতিহাসের সূত্রে জানা যায়, এক হিন্দু ভদ্রলোক গীতা পাঠ করেন- যা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের এক প্রতীকী ঘোষণা। এরপর বাজে জাতীয় সঙ্গীত- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। কণ্ঠে হয়তো ছিল কম্পন, কিন্তু সেই সুরে ছিল স্বাধীনতার দৃঢ় অঙ্গীকার। সেদিন গানটা ছিল বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা।

মুজিবনগরের দারিয়াপুর ডিগ্রী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত  সহকারী অধ্যাপক বাকের আলী সেই শপথ অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলোয়াত করেছিলেন। তিনি জানান, সেদিন খুব সকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে উপস্থিত হন। তিনি তাদের চিনতেন না। স্থানীয় নেতাদের সাথে তিনি জাতীয় নেতাদের সন্মুখে গেলে অনুষ্টানে তাকে কোরআন তেলোয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ তার নাম লিখে নিলেন এবং রিহার্সালের সময় তেলোয়াত শুনলেন। মাত্র ৩০ মিনিট অনুষ্ঠানটির স্থায়ীত্ব থাকলেও উপস্থিত সকলের মধ্যে ছিল স্বাধীনতার উম্মাদনা ও জীবনবাজির শপথ। 

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সামরিক কায়দায় সালাম দিয়েছিলেন মেহেরপুরের ১২জন আনসার সদস্য। ইতোমধ্যে ১০ জন মারা গেছে। বেঁচে আছেন দুইজন। এদেরই একজন বয়োবৃদ্ধ মো. সিরাজ উদ্দীন। প্রতিদিন তিনি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে আসেন। তিনি বলেন- সেদিন আমাদের ডাক পড়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে রাস্ট্রিয় মর্যাদায় সালাম জানানোর। আমরা গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম ১২ জন আনসার। ওইদিনই  ট্রেনিং দিয়েছিলেন তৎকালীন ঝিনাইদহের সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা গার্ড অব অনার দিই সরকারকে। আর এক আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন বলেন- তখন আনন্দ ভয় উত্তেজনা কাজ করছিলো। দেশি বিদেশী সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষের সামনে প্রথম সারকারকে সালাম জানানোর সময় মনে যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম তা বলে বোঝানো যাবেনা। পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। 

প্রত্যক্ষদর্শীর সুভাষ মল্লিকের ভাষায়- ওদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না, কিন্তু যে ভঙ্গিতে সালাম দিল- মনে হচ্ছিল এটাই স্বাধীন দেশের প্রথম সেনাবাহিনী। সেই অভিবাদন ছিল প্রতীকী, কিন্তু তা-ই হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সূচনালগ্নের প্রতিচ্ছবি।

মুজিবনগর স্মৃতিপ্রকল্প এলাকায় দেখা মেলে প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী  আহম্মদ খাঁ (৭১) রিক্সা ভ্যানে করে শষা ফেরি করছেন। তিনি বলেন- সে বছরই আমার বিয়ে হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানের দিন হঠাৎ করেই হাজার মানুষ জড়ো হলো মুজিবনগরের এই আমবাগানে। তখন বাগানটি ভাগাড় হিসেবে গ্রামের মানুষ ব্যবহার করতো। সেদিন আমিসহ একদল যুবক বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুড়ি সংগ্রহ করে মানুষকে খেতে দিই। আশপাশের বাড়ি থেকে বউ ঝিরা পানি এনে মানুষের পিপাসা মিটায়। সেদিন সেই সরকারের পরিচালনায় দেশ স্বাধীন হয়। এখন আমি গর্বভরে বলি আমিও স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সাক্ষি।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণা রোকসানা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেনÑ তখন আমি গৃহবধু এই বাড়ির। বৈশাখের দাবদাহে সবচেয়ে বড় দরকার  ছিল পানি। চারপাশে তখন নিরাপত্তার ঝুঁকি, খোলা চলাফেরা কঠিন। গ্রামের কিশোর কিশোরিরা কলস কাঁখে নিয়ে কূপ থেকে পানি এনে দিচ্ছিল। আমরা আগে নিজেরা খাইনি, আগে তাদের পানি দিয়েছি। তখন মনে হচ্ছিলÑ ওরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। ওরা যখন আমাদের দেয়া মুড়ি, রুটি আর পানি খাচ্ছিল,  দেখে মনে হচ্ছিল, নিজের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি।

সেদিন চারপাশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামের তরুণরা। কেউ গাছে উঠে, কেউ দূরের পথের দিকে তাকিয়েÑ যদি পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়। একটি সংকেত ঠিক করা ছিলÑ কিছু হলে দ্রুত খবর পৌঁছে যাবে। আমরা ছিলাম চোখ, যাতে অনুষ্ঠানটা চোখের আড়ালেই থেকে যায় শত্রুর। বললেন স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম।  সব কিছু শেষ হওয়ার পরও কোনো উল্লাস ছিল না। ছিল নিঃশব্দ স্বস্তি।

কারণ সবাই জানত- এটা শেষ নয়, শুরু।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুল হক মন্টু বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে ভাষ্কর্যের মাধ্যমে। ৫ আগস্ট পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি পক্ষ সেসব ভাষ্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছে। সেগুলি শুধু পাথর বা কংক্রিটের ছিল না। সেখানে ছিল আমাদের ইতিহাস, আমাদের পরিচয়। ওগুলো ছিল আমার বাবার মতো হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের দৃশ্যমান সাক্ষী। প্রতিমাসের একটি শুক্রবার আমি আমার সন্তানকে নিয়ে মুজিবনগর আসি। ছেলেকে দেখিয়ে বলতাম- দেখ- তোমার দাদুদের গল্প এখানে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমি তাকে কী দেখাবো?

ভবেরপাড়া গ্রামের প্রবীণ  সুভাষ মল্লিক, বয়স এখন আশির কোঠায়। ৭১-এ ভবেরপাড়া মিশনের ফাদার ছিলেন।  তিনি বলেনÑ আমরা তখন বুঝিনি এত বড় কিছু হতে যাচ্ছে। শুধু জানতাম, কিছু বড় মানুষ আসবে, দেশ বাঁচানোর কথা বলবে। ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল আশা। শপথগ্রহণের পর শুধু অনুষ্ঠান শেষ হয়নিÑ শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। গ্রামের অনেকেই সরাসরি যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধে। কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ খাবার, কেউ তথ্য। আমরা বন্দুক ধরিনি সবাই, কিন্তু যারা ধরেছে, তাদের পেছনে আমরা ছিলাম।

মুজিবনগর সরকার-এর শপথ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের সংগঠিত রূপ, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। একটি গ্রামের অমরত্ব

আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু সেই ১২ আনসারের সালাম, গীতা পাঠের মৃদু উচ্চারণ, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক কলস পানি- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। এই ইতিহাস শুধু বড় নেতাদের নয়- এটি সেই নামহীন মানুষের, যারা নিজেদের আড়ালেই রেখে একটি দেশকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল। 

আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু এই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিস্ফোরণ স্বপ্নের, সাহসের, আত্মত্যাগের। এই গ্রামবাসীরা ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়াননি, কিন্তু ইতিহাসকে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের নাম হয়তো বইয়ে নেই, কিন্তু তাদের অবদান ছাড়া ১৭ এপ্রিলের সেই শপথ শুধুই একটি অসম্পূর্ণ আয়োজন হয়ে থাকত। মুজিবনগরের বাতাস আজও যেন বলেÑ আমরা ছিলাম, আছি, থাকবÑ বাংলার স্বাধীনতার নীরব প্রহরী হয়ে। আর

মুজিবনগরের মাটি বলে- স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, অসংখ্য ছোট ছোট ত্যাগের সমষ্টি।




মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে তিন শতাধিক ভাস্কর্যে ক্ষত

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণের স্থান মেহেরপুরের মুজিবনগরে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন এই কমপ্লেক্সের তিন শতাধিক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দফায় দফায় ভাঙচুর চলে। এরপর প্রায় ২০ মাস ভাঙচুর অবস্থায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ত্রিমাত্রিক শিল্পরূপগুলো।

এগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।দুই যুগেরও আগে ৭২ একর জমি অধিগ্রহণ করে ১১টি মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণের কাজ। এই প্রকল্পের মধ্যে ছিল পর্যটক মোটেল, শপিং মল, শিশুপরিবার, ডাকঘর, হেলিপ্যাড, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ছয় দফাভিত্তিক মনোরম গোলাপবাগান, অত্যাধুনিক মসজিদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র ও জাদুঘর।
এখন পর্যন্ত এসব কোনো স্থাপনাই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপের কাজ শেষ হয় অন্তত ১০ বছর আগে। সর্বশেষ সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে বড় মিলনায়তন নির্মাণের কাজ শেষ হয়।

তবে এখনো প্রশাসনিক প্লাজা, অ্যাপ্রোচ রোড, জেনারেটর ক্রয় (১০০-কেভিএ), মানচিত্রের স্টেজে কাঠের কাজ, সিঁড়িতে এসএস রেলিং, জলছাদ, র‌্যাম্প ও এসপিএমসিবি পাওয়ার সকেট, আন্ডারগ্রাউন্ড সার্ভিস লাইনের কাজ শেষ হয়নি।

নির্মিত বেশ কিছু স্থাপনায় ইতিহাস বিকৃত করারও অভিযোগ ওঠে। ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধে সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশ মানচিত্র নির্মাণকাজ শেষ হয়ে ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। মানচিত্রে মুজিবনগরের শপথ নেওয়ার কোনো চিত্র স্থান পায়নি। গার্ড অব অনারের ভাস্কর্যে ১২ জন আনসার সদস্যের বিপরীতে দেখানো হয় আটজনকে। সেক্টরভিত্তিক কমান্ডারদের ভাস্কর্যও রাখা হয়নি।
প্রথম দিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ভাস্কর্য স্থান পেলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পর সেই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়, যা নিয়ে বিএনপি সে সময় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।

মানচিত্রের বাইরে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যসহ অন্যান্য ভাস্কর্যগুলো এতটাই নিম্নমানের ছিল, যা মাঝেমধ্যেই ভেঙে পড়ত। অনেকটির ভেতরে রডের বদলে চিকন তার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে শিলাবৃষ্টি বা ঝড় হলে সেগুলো প্রায়ই ভেঙে যেত। কয়েক দফা সেগুলো ফের মেরামতও করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণের স্থান, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাসমৃদ্ধ তথ্য ও নিদর্শন দেশবাসী ও তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং বিদেশিদের কাছে মূর্ত করে তুলতে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে কাজ শুরু করে মাঝে প্রকল্পটি কাটাছেঁড়া করা হয়। বেশির ভাগ কাজ শেষ হয় ২০১১ সালে। প্রকল্পের কিছু কাজ অসমাপ্ত থাকা অবস্থাতেই ভাস্কর্যগুলো স্বাধীনতাবিরোধী দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলে।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শিল্পী রানী রায় বলেন, মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য প্রতিস্থাপনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, তার কোনো প্রতিউত্তর এখনো আসেনি।

নতুন আরো একটি প্রকল্প :

২০২১ সালের ২০মে নতুন করে ৪০৯ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন সরকার। যে প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্কাল্পচার গার্ডেন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার মেমোরিয়াল মুর‌্যাল, তিনতলা বিশিষ্ট অ্যাডমিন ব্লক, দুইতলা বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ব্লক, চারতলা বিশিষ্ট ট্রেনিং সেন্টার, চারতলা বিশিষ্ট অফিসার্স ও স্টাফ কোয়ার্টার, সুইমিং পুল, ফুড জিয়স্ক ও রেস্টরুম, রেন্টাল শপ, ওয়াচ টাওয়ার, ভিভিআইপি ও ভিআইপি পার্কিং, সাধারণ পার্কিং, মাছ ধরার ডেক, রোপওয়ে, দুইতলা বিশিষ্ট বোট ক্লাব, সুপেয় পানির ডিসপেনসার, ব্যাংক প্রটেকশনসহ লেক, ব্রিজ, কনটোর্স, আইল্যান্ড, ওয়াচওয়ে, চালকদের আবাসন, শিশু পরিবার ও ডরমিটরি, দুইতলা বিশিষ্ট স্কুল, টেনিস কাম বাস্কেটবল কোর্ট, প্লেগ্রাউন্ড, লেজার শো ও ওয়াটার শিল্ডসহ আরো কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন ৫৬.০৫ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রটির আয়তন ১২৭ একরে রূপ নেওয়ার কথা। জমি অধিগ্রহণসহ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ ধরা হয় প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। প্রয়োজনে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধিরও কথা ছিল।

আমবাগান পরিচর্যার জন্য অপেক্ষা :

মুজিবনগরের ঐতিহাসিক আম্রকাননে বর্তমানে এক হাজার ১০০টি গাছ বেঁচে রয়েছে। পরিচর্যার অভাবে এরই মধ্যে শতাধিক গাছ মারা যাওয়ায় বাগানটি ক্রমেই শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। জীবিত গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য মেহেরপুর হর্টিকালচার সেন্টার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। দ্রুত গাছ বাঁচানোর প্রকল্পের বরাদ্দ ছাড় হলে কাজ শুরু করা হবে বলে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে।

স্বাধীনতা সড়ক :

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের কলকাতা থেকে যে মেঠোপথ ধরে জাতীয় চার নেতাসহ দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা এসেছিলেন সেই পথটিকে স্বাধীনতার অর্ধশত বছর উদযাপন উপলক্ষে ‘স্বাধীনতা সড়ক’ নাম দেওয়া হয়। মেঠোপথটির বাংলাদেশের অংশ ৫০০ মিটার সড়ক এক কোটি চার লাখ টাকা ব্যয়ে এরই মধ্যে পাকাও করা হয়। ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে এই সড়কের উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা হয় এই সীমান্তপথে দুই দেশের মধ্যে চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি স্থলবন্দর নির্মাণ হবে। এর সরকারি গেজেটও প্রকাশ হয়। কিন্তু এই কাজের আর কোনো অগ্রগতি নেই।




আজ মুজিবনগর দিবস; নেই সরকারি কোন আয়োজন

আজ ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।

তার আগে ওই বছরের ১০ এপ্রিল  পাকিস্তানে বন্দি থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়।

প্রবাসী এবং অস্থায়ী সেই সরকারের শপথ গ্রহণের স্থান বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। মুজিবনগরে তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। সেদিনের  সেই মহতী অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং বিশিষ্ট বাজনীতিবিদরা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে একটি রেডিও সেন্টার স্থাপন করে প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান সারা দেশে সম্প্রচার করা হয়েছিল এবং মুজিবনগর সেদিন পেয়েছিল ঐতিহাসিক মর্যাদা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার ধারাবাহিকতায়   মুজিবনগরে শপথ নেওয়া অস্থায়ী  সরকারের সফল নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অর্জন  হয়।

এবার নেই সরকারি কোনো কর্মসূচি :

প্রতিবছর সরকারিভাবে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হলেও এবার এ বিষয়ে সরকারি কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) শিল্পি রানী রায় বলেন, ‘১৭ এপ্রিল মুজিবগনর দিবস পালন নিয়ে এখন পর্যন্ত (১৬ এপ্রিল দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত) সরকারি কোনো নির্দেশনা আসেনি। সরকারি নির্দেশনা যা আসবে আমরা তা প্রতিপালন করব।’

বেঁচে আছেন সেদিনের দুই আনসার সদস্য :

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের  প্রথম অস্থায়ী সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী ১২ আনসার সদস্যের মধ্যে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন দুজন। তাঁরা হলেন সিরাজ উদ্দিন ও আজিম উদ্দিন শেখ। দুজনই বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। এ বছরও ১৭ এপ্রিল দিবসটি সরকারিভাবে পালন না করাতে আক্ষেপ জানালেন তাঁরা।

আনসার সদস্য সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা খুব দুঃখ পেলাম। এবার ১৭ এপ্রিল উপলক্ষে ডিসি, ইউএনও, এমনকি কোনো পুলিশ অফিসার আমাদের কিছু বলেননি। সরকার পালন না করলেও আমরা যাব, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও আমাদের সহযোদ্ধা যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের জন্য দোয়া করব।’




দামুড়হুদায় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলার সমাপনী

দামুড়হুদায় দুই দিনব্যাপী ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ, বিজ্ঞান মেলা, ১০ম বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও বিজ্ঞান বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় উপজেলা অডিটোরিয়াম হলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের বাস্তবায়নে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এ মেলায় উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ব্যাপক অংশগ্রহণ করে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উবায়দুর রহমান সাহেল।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন আলম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হাসান তনু, দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামছুজোহা পলাশ, দামুড়হুদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফাহমিদা রহমান এবং উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি আবেদ উদ-দৌলা টিটনসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

মেলায় মোট ১৩টি স্টল নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ২টি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জুনিয়র, সিনিয়র ও বিশেষায়িত গ্রুপে অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে ফার্স্ট মাল্টিমিডিয়া মডেল স্কুল, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে দর্শনা দারুস সুন্নাত সিদ্দীকিয়া ফাজিল মাদ্রাসা এবং তৃতীয় স্থান লাভ করেছে দামুড়হুদা রেসিডেন্সিয়াল আইডিয়াল স্কুল।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

শেষে সফলভাবে মেলার আয়োজন সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।




গাংনীতে বজ্রপাতে প্রান গেলো কৃষকের

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কসবা-ভাটপাড়া গ্রামে বজ্রপাতে জারজিস হোসেন (৫৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ভাটপাড়া গ্রামের জোলের মাঠ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত জারজিস হোসেন ওই গ্রামের দাউদ হোসেনের ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জারজিস হোসেনসহ আরও দুই কৃষক কলাক্ষেতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় হঠাৎ আকাশে কালো মেঘ জমে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। একপর্যায়ে বজ্রপাত হলে জারজিস গুরুতর আহত হন।

পরে স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাহিদ হাসান তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খবর পেয়ে গাংনী থানা পুলিশের একটি দল হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে পরিবারের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।




মুজিবনগরে মাদক ব্যাবসায়ির হামলায় যুবক আহত

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার দারিয়াপুরে চোরাই মোবাইল কেনাবেচা নিয়ে দ্বন্দ্বে যুবকের গলায় চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যার চেষ্টায় হুসাইন নামের এক যুবক আহত হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত নয়টার দিকে দারিয়াপুর গ্রামে এঘটনা ঘটে। আহত হুসাইন দারিয়াপুর গ্রামের আকবর আলীর ছেলে।

আহত হুসাইন জানান, গতকাল বুধবার রাতে বিধ্যারপুর গ্রামের মাদক ব্যাবসায়ি আললিনের ছেলে জুয়েল আমার ছোট ভাইয়ের কাছে একটা চোরাই মোবাইল বিক্রি করতে আসে। এসময় আমি আমার ছোট ভাই কে তার কাছ থেকে মোবাইল কিনতে নিষেধ করলে সে উত্তেজিত হয়ে আমার উপর হামলা করে। ঘটনাস্থলে জুয়েল তার কাছে থাকা চাকু বের করে আমার গলায় টান দিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা আহত অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতলে নিয়ে এসে চিকিৎসা প্রদান করে।

স্থানীয়রা জানান, জুয়েল একজন মাদক কারবারি সন্ত্রাস। তার বিরুদ্ধে মেহেরপুর ও মজিবনগর থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।




মেহেরপুরে মসজিদের টাকা আত্মসাৎ ও মাটি বিক্রির প্রতিবাদে মানবন্ধন

মেহেরপুর সদর উপজেলার আশরাফপুর চালতলাপাড়া জামে মসজিদের অর্থ আত্মসাৎ ও মসজিদের জমির মাটি অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগে কাজী হাবিবুর ইসলাম বাবলুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল ১১ টাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আশরাফপুর চালতলাপাড়া জামে মসজিদ কমিটি ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, কাজী হাবিবুর ইসলাম বাবলু দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি মসজিদের জমির মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করে সেই অর্থও আত্মসাৎ করেছেন বলে দাবি করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিয়ে এমন অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

আশরাফপুর চালতলাপাড়া জামে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, মসজিদের অর্থ আত্মসাৎ ও জমির মাটি বিক্রির মতো অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক।

আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

আরও বক্তব্য রাখেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক,আমদাহ ইউনিয়নের সেচ্ছাসেবক দলেন সম্পাদক মেহেদী হাসান জনি, তুষার, জাহিদ, ইব্রাহিম হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন।




মহেশপুরে উদ্বোধনের আড়াই বছরেও চালু হয়নি ২০ শয্যার হাসপাতাল

উদ্বোধন হয়েছে আড়াই বছর আগে কিন্তু আজও চালু হয়নি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা ভৈরবা এলাকায় নির্মিত ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি।

ফলে উপজেলার অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রামের লাখো মানুষ প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।

জানা যায়, ঝিনাইদহ জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে ভৈরবা সাকোরখাল এলাকায় ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটি সীমান্তবর্তী মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মাণ করা হলেও এখনও তার কার্যক্রম শুরু হয়নি।

চালু না হওয়ায় হাসপাতালের ভবনটি নষ্ট হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাসপাতালের কিছু যন্ত্রাংশও চুরিও হয়ে যাচ্ছে।

সম্রাট নামের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আমরা ভেবেছিলাম হাসপাতাল চালু হলে আর দূরে যেতে হবে না। কিন্তু এখনো অসুস্থ হলে উপজেলা বা জেলা শহরে যেতে হয়। এতে সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হচ্ছে।

খাদিজা বানু নামের এক বৃদ্ধা বলেন, আমাগের এই হাসপাতাল কইরলো ম্যালা টাকা দিয়ে। কিন্তুক আজ পর্যন্ত দেখলাম না কোন ডাক্তার আসতি। তাহলি হাসপাতাল করে লাভ কি হলো। আমরা চাই এডা যেন তারাতারি চালু করা হয়।

হাসপাতাল চালুর ব্যাপারে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেই দ্রুত চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, হাসপাতালটি চালু হলে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারবে, যা সীমান্তবর্তী এলাকার চিকিৎসা সংকট অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।




ঝিনাইদহে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

ঝিনাইদহ জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের পাতানো নির্বাচন বাতিলের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে শ্রমিকদের একাংশ।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সাধারণ শ্রমিকদের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবী করা হয়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শ্রমিক নেতা আমির ফয়সাল মহাব্বত।

শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, আগামী ২৫ এপ্রিল সংগঠনটির ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন হওয়ার আগে থেকে নানা অনিয়ম করা হচ্ছে। প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র একটি পদে কিনলেও তা কাটা-ছেড়া করে অন্য পদে জমা দিয়েছে কিছু শ্রমিক নেতা। ইলেকশন হলেও সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৪ টি পদে পছন্দের শ্রমিকদের সিলেকশন করা হয়েছে।

মহব্বত অভিযোগ করে বলেন, আমি কার্যকরী সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র কিনেছিলাম। টাকা জমা দিয়েছিলাম ১৬ হাজার ৪০০ টাকা। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর আমারটা পদ কেটে সহ-সভাপতি পদে জমা দেওয়া হয়েছে। যেটা সম্পুর্ণ বেআইনি।

হানিফ খাঁন নামের এক শ্রমিক অভিযোগ করেন, আমি মনোনয়নপত্র কিনেছিলাম যুগ্ম সম্পাদক পদে। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত টাকাও জমা দিয়েছি। কিন্তু আমার সেই পদ কেটে দেওয়া হয়েছে সহ-সাধারণ সম্পাদক। ৪ জনকে সিলেকশন করার জন্য কিছু শ্রমিক নেতা এই অনিয়ম করেছে। পাতানো নির্বাচনের অভিযোগ এনে শ্রমিকরা এই তফসীল বাতিল করে পুনরায় তফসীল ঘোষণা করে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবী জানান। আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে নির্বাচন বাতিল করা না হলে সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচীর ঘোষণা দেন তারা।

এ ব্যাপারে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সহকারী নির্বাচন কমিশনার রোকনুজ্জামান রানু বলেন, কিছু শ্রমিক যে অভিযোগ করেছেন তার সত্যতা নেই। তারা নিজেরাই স্বাক্ষর করে নিজ নিজ পদে ফরম সংগ্রহ করেছেন।

আর সিলেকশনের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সরে যাওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় কিছু পদে ভোট হচ্ছে না। বাকি পদগুলোতে সঠিক নিয়মেই নির্বাচন হবে। নিয়মের বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই।