ভাঙাগড়ার রাজনীতি

যেকোনো ভাঙন পরবর্তী সময়ে নতুন এক প্রতিবেশের রূপকল্প জেগে ওঠে। কখনো কখনো বৃত্তচ্যুতির আনন্দ উল্লসিত করে মনকে। কিন্তু সব ভেঙে ফেললেই কি আরাধ্য পৃথিবীর জন্ম হয়?

কি ভাঙবো কতটা ভাঙবো কেন ভাঙবো তার পরিমিতিবোধ বা প্রশ্নও কি জরুরী নয়? ” সবকিছু ভেঙে পড়ে” উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ আমাদের এক মর্মন্তুদ পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যেখানে তুলে আনা হয়েছে নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার কাতরতা,; সামাজিক অপরাপর সম্পর্ক ভেঙে পড়ার করুন দৃশ্যপট। বর্তমানে আমরা আজাদের উপন্যাসের মতই এক অসহায় পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে নিয়তির মতো সবকিছু ভেঙে পড়ছে। সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে, অনাস্থার দোলাচালে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে, সহাবস্থানের রাজনৈতিক ব্যপ্তি ভেঙে পড়ছে, মানুষের গর্ব দীপ্ত অর্জিত মিনারগুলো ভেঙে পড়ছে, আমাদের আদর্শিক অর্জিতের ৭১ ও ৭১ পরবর্তী সময়শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।ভাঙাটাই কি সৃষ্টি ? ভাঙ্গন পরবর্তী কি কোনো সৃষ্টি হচ্ছে বা হয়েছে?

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেঙে পড়ল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ত্রাসন। চেতনার ভিত্তির উপর দাঁড় করানো ক্ষমতা ভেঙে পড়ল। ঐতিহাসিক ৩২, স্বোপার্জিত স্মৃতির মিনার, কবর, বাউলের আখড়া বাড়ি ভেঙে পড়ল, চেতনার তীব্র বধের ফলায় ভেঙে ফেলা হলো আরেক চেতনা। এখানে টিকে থাকার বিকল্প হিসেবে আদিম উপায় গুলোকে ব্যবহার করা হলো ইচ্ছে মতো। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর মোটাদাগে শুরু হলো চেতনা বনাম চেতনার লড়াই। ব্যক্তি ব্যর্থতার দায় চেপে গেল ৫২ ৬৬ ৬২ ৬৯ ৭১ এর কাঁধে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হলো ইতিহাসের শরীর। এখন নতুন ইতিহাসের অভূতপূর্ব জন্মভার বইছে বাংলাদেশ। যেখানে লেখা হতে চলেছে দায়মুক্তির এক নতুন ইতিহাস। কিসের দায়মুক্তি? এই দেশ নাকি ভুল ইতিহাসের লজ্জার ফসল। তাই ইতিহাস মেরামতের কাজ চলছে।

মানুষকে মিথ্যা ইতিহাসের বাতাবরণ থেকে মুক্তি দিতে এখানে ইতিহাসের স্কুল চালু হয়েছে। চেনা ৭১ কে নতুনভাবে চেনানো হচ্ছে। একাত্তরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ; শহীদের প্রকৃত সংখ্যা বিতর্ক তুলে ; স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের কবিয়াল লড়াই শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ভেঙে দেয়ার কাজ চলছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থাপত্যের মূর্ত প্রতীক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স। ৫ই আগস্ট এর হাতুড়ি গুড়িয়ে দিয়েছে তার তিন শতাধিক ভাস্কর্য। শাহজাদপুরে রবি ঠাকুরের কাছারিবাড়ীর স্মৃতিচিহ্ন, ছায়ানোটির সংগ্রহশালা। কি দোষ সেগুলোর? দোষ একটাই নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে অন্তরায় এগুলো। তাই ভাঙো এবং ভেঙে ফেলো। তোমরাই তো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সভ্যতার অনিবার্য অংশ। উপহার হিসেবে তোমার মাথায় দেওয়া হবে দায়মুক্তির মুকুট ।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স এর ভাস্কর্য গুলো অনল বর্ষী ইতিহাসের স্মারক। মহান মুক্তিযুদ্ধকে একচিলতে মানচিত্রে তুলে আনার নিপুণ শিল্পকর্ম। এখন এমন এক বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। যেখানে কোন শক্ত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে কোন আইনি প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়নি। দেশজুড়ে এই ভাঙনদূর্বৃত্তির মূলে রয়েছে ইতিহাসকে মুছে ফেলার সুক্ষ নকশা।

কিন্তু ভাঙলেই কি মোছা যায়৷ ইতিহাসের মজ্জাগত ক্রমধারা। যা ধাবিত হয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ইতিহাস নদীর মতোই ধাবমান। শত বাধা পেরিয়ে আপন পথ সে ঠিকই খুঁজে নেয়। সন্দেহ নেই এখন ভাঙাটাই সৃষ্টি। কিন্তু তার আগে গড়ে তোলার জন্য চাই উপযুক্ত উপকরণ। তবেই গড়ে উঠবে আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবী। দেয়াল তুললেই কেবল ঘর নয় সৃষ্টি হতে পারে আয়নাঘরও।




সাংবাদিকতার দায়: পক্ষ, বিপক্ষ, নিরপেক্ষ

সাংবাদিকতাও কি একটি পেশা?

পেটের দায়ে তো মানুষ কত কিছুই করে, প্রচলিত পেশার মধ্যে কুলিয়ে উঠতে না পেরে কেউ কেউ নতুন নতুন পেশার উৎসমুখ নিজে থেকেই খুলে নেন, নতুন খাতে পেশাগত দক্ষাতা রচনা করেন, নতুন পেশাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হন এবং বহু গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও প্রচেষ্টায় ওই পেশার কাঠমোগত রূপরেখা দাঁড় করিয়ে নেন। ওই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারটাও জরুরি হয়ে ওঠে। গোড়াতে ধর্মপ্রচারের কাজটি অবৈতনিক স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ তথা ‘ ব্রত’ বলে গণ্য হলেও দিনে দিনে তারও পেশাগত আদল দাঁড়িয়ে গেছে। মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিনের জন্যেও বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করে তবেই নিয়োগ দেয়া হয়।

বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্যে বড় বড় আলেম মওলানা স্বনির্ধারিত ফি কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে তারপর মঞ্চে ওঠেন। ওখন অর্থের চোরাগলিতে নিভৃতে মুখ লুকায় ধর্মপ্রচারের মহান ব্রত। আল্টিমেটলি ব্যাপারটা পেশা হিসেবেই দাঁড়িয়ে যায়। আর মসজিদ-মাদ্রাসা-ধর্মসভার জন্যে চাঁদা আদায়কারীর মাথায় টপি, মুখে দাড়ি এবং ধর্মের বুলি থাকলেও এখান থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন ভোগ করাকেই তিনি জীবিকা নির্বাহের উপায় বা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটু চেপে ধরলেই তাঁরা সরল সত্যটুকু সহজেই কবুল করেন— তাঁদেরও ঘরসংসার আছে, পেটের দায় আছে। তা বটে। প্রাণী মাত্রেরই পেট আছে। পেটের চিন্তা আছে। নির্দিষ্ট পেশা থাকাটাও খুবই সঙ্গত ও প্রত্যাশিত। নানাভাবে ঘাটাঘাটি করতে করতে মানুষ একটা পেশাতে থিতু হয়ে দাঁড়াতে চায়। তাই বলে কি সাংবাদিকতাকেও পেশা বলতে হবে?

তা যদি বলতে হয় তাহলে এই পেশটির রূপরেখা, যোগ্যতা- ব্যর্থতা, বেতন ও সুযোগ সুবিধার সব দিক খোলাসা এবং স্বচ্ছ হওয়াও জরুরি। স্বাধীন সাংবাদিকতার নামে সাংবাদিকের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন কাম্য নয়, এ পেশায় যুক্ত সবার জন্য অনুসরণীয় ও পালনীয় নীতিমালার বাস্তবায়নে গড়িমসিও তেমনই কাম্য নয়। ওয়েজ বোর্ডের নীতিমালার কথা শোনা যায় বটে, তা কত দূর পর্যন্ত কার্যকর আছে, সেটা দেখভালের আদৌ কোনো কর্তৃপক্ষ আছে?

সাংবাদিকদের নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলা হয়। আদর্শের কথা শোনানো হয়। পেশা নয়, সাংবাদিকতাকে পবিত্র ব্রত বলে মহান করেও তোলা হয়। কিন্তু সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকেরা ঘরের খেয়ে আর কত বনের মোষ তাড়াবে, সে কথা স্পষ্ট করে কেউ বলে না। কথায় কথায় তাদের বিপথগামিতার কথাও কেউ কেউ বলেন। তারা কি ভেবে দেখেছেন- রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনাই কি তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে না? হলুদ সাংবাদিকতার কথাও ওঠে কখনো কখনো। কথিত এই হলুদ সাংবাদিকতা অবশ্যই নিন্দনীয়, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি-কেন এ পথে গেল একজন সাংবাদিক? অস্বচ্ছ রাজনীতির ঘোলাজলে পা ডুবিয়ে যারা কালো টাকার পাহাড় গড়েন এবং সেই কালো টাকা সাদা করার ফন্দি থেকে গড়ে তোলেন মিডিয়া হাউজ, তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় ও মদদে হলুদ সাংবাদিকতা প্রশ্রয় পায়; কই তাদের বেলায় তো এ সমাজ কোনো প্রশ্ন তোলে না। বরং চোখ বন্ধ রেখে প্রকারান্তরে তাদেরই সমর্থন জানায়। আর যত দোষ হয় সাংবাদিকের।

প্রশ্ন ওঠে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভালো ঘটনা যেমন ঘটে, মন্দ ঘটনাও অনেক ঘটে চলেছে। একই ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে এক রকম পরিবেশন ঘটে, নেতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে হয় অন্যরকম। সুসংবাদ বা ভালো ঘটনা যতটা নিউজ ভ্যালু পায়, মন্দঘটনা বা দুঃসংবাদ তার চেয়ে বেশি কাভারেজ পায় সাংবাদিকতায়। এ সব ক্ষেত্রে এই যে অদৃশ্য পোষকতা তা-ই অনেক সময় সাংবাদিককে অনিরপেক্ষতার দিকে ঠেলে দেয়। গণবিচ্ছিন্ন অশুভ রাজনীতি আছে সব নষ্টের মূলে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান-সমূহকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকতে দেয় না শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরকারি অফিস-আদালত পর্যন্ত অনিরপেক্ষ করে তোলে যাঁরা, তারা তো সাংবাদিককেও যে-কোনো মূল্যে পেতে চায় তাদের পক্ষেই। বক্তৃতায় নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার বুলি আওড়ালেও বিবদমান তালগাছটি তারা পেতে চায় নিজেদের ভাগে এবং সাংবাদিকদেরও রাখতে চায় নিজেদের পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় এই অপশক্তির অক্টোপাসের মুখে দাঁড়িয়ে। বিশেষত মফস্বল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মেরুদন্ড শক্ত করে নিরপেক্ষ অবস্থানে দৃঢ় থাকা সত্যিই কঠিন।

তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে অনেকেই পথ ভুলে চলে এসেছেন সাংবাদিকতার পবিত্র আঙিনায়। সাংবাদিক হয়ে ওঠার পূর্ব প্রস্তুতি যেমন নেই তাদের বুকের ভেতরে বড় কোনো অঙ্গীকারও নেই। ফলে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই আঙিনার পবিত্রতা নষ্ট করে চলেছে, নিজেদেরও নামিয়ে আনছে অসম্মানের শেষ স্তরে। আড়ালে আবডালে নয়, সাংবাদিক দেখে কেউ কেউ প্রকাশ্যেও ‘সাংঘাতিক’ বলে

পরিহাস করে এবং কী আশ্চর্য ঘটনা — এমন আপত্তিকর মন্তব্য বেশ হজমও করে মুখ বুজে। এদের দিকে আঙুল তুলে গোটা সাংবাদিক সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করার এই অশুভ প্রক্রিয়া রুখতে হলে অপ-সাংবাদিকদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে হবে শুভবোধসম্পন্ন দায়িত্বশীল সাংবাদিকদেরই। অপ্রিয় এই ক্ষেত্রেও দায় নিতে সাংবাদিকদের।

দীর্ঘকালের অপশাসন এ দেশের সাধারণ মানুষের মনে যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে তা খুবই ভয়াবহ। মানুষ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে নির্বাচনে মেতে ওঠে, তারপর অচিরেই টের পায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার কথা বলে না, তার ন্যায্য দাবির সঙ্গে সংহতি জানায় না।

সরকারি অফিস-আদালতের সব দুয়ারেও তার সমান অধিকার নেই। তাহলে সে দাঁড়াবে কোথায়, কোন ভরসায়? আশাহত এই সব মানুষের প্রাণের স্পন্দন তথা জীবনের ভাষা বুঝতে হবে সাংবাদিকদের। দাঁড়াতে হবে এই সব মানুষের পাশে। তাদের বুকে জাগাতে হবে ভরসা। ঋষিসুলভ উদাসীনতা বা তথাকথিত নিরপেক্ষতার মুখোশে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা নয়, এ দেশেরই সন্তান হিসেবে এক-পা এগিয়ে এসে গণমানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশের দায় কাঁধে নিতে হবে সাংবাদিকদের। এই পক্ষপাতিত্বের মধ্যেই নিহিত আছে পবিত্রতম নিরপেক্ষতা। চারণ সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ, জলধর সেন, একালের সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন, প্রবীর সাহা আমাদের সেই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক।




নিপাট ইতিহাস পাঠ: গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা

মেগাস্থিনিস কি মেহেরপুর এসেছিলেন? টলেমি দেখেছিলেন মেহেরপুরের প্রাণ ও প্রকৃতি? হিউয়েন সাং কর্ণসুবর্ণ ঘুরতে এসে মেহেরপুরের মাটিতে পা রেখেছিলেন? খনা-মিহির কি সত্যিই মেহেরপুরে অবস্থান করেছিলেন?

প্রাচীন জনপদ মেহেরপুরকে ঘিরে কৌতহুল জাগানিয়া নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই, তবে সম্ভাব্যতার নির্দেশনা আছে। সেই নির্দেশনা মেহেরপুর জনপদের প্রাচীনত্বকে তুলে ধরে। মেহেরপুরের প্রাচীনত্ব কল্পনা করা যায়- খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতাব্দী আগের ভারতের ষোড়শ মহাজনপদের সময় থেকেও। ওই মহাজনপদের পাশে ছিল প্রাচীন বঙ্গ জনপদ। ভাবা যেতে পারে এমনও যে, মেহেরপুর সেই জনপদেরই একটি অংশ। ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত মেহেরপুরের শেকড়।

গ্রিক পর্যটক, ইতিহাস ও ভূগোলবিদ মেগাস্থিনিস (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০ অব্দ) ‘ঞধ ওহফরশধ’ গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন, তাতে মেহেরপুর জনপদের সম্ভাব্যতা অনুমান করা যায়। দ্বিতীয় শতাব্দীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমি (১২৭ থেকে ১৫১ খ্রিষ্টাব্দ) বর্ণিত মানচিত্রে পদ্মা বা গঙ্গা নদীর অববাহিকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের উপস্থিতি তুলে ধরা হয়।

এসব দ্বীপের একটি হচ্ছে মেহেরপুর অঞ্চল। ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীনকালের প্রথম কোষগ্রন্থের প্রণেতা টলেমি তাঁর ‘অ্যালমাজেস্ট’ ও ‘গাইড টু জিওগ্রাফি’ গ্রন্থে যে বিবরণ দেন ও মানচিত্র অঙ্কন করেন, তাতে ভারতের বহু প্রাচীন নগরী ও নদী-জনপদের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের সীমানা ছিল পশ্চিমে ভাগীরথী নদী, উত্তরে পদ্মা নদী, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ ও মেঘনা নদী এবং দক্ষিণে সমুদ্র। মেহেরপুর জনপদ ভৈরব নদের পাশে অবস্থিত। এই নদ পদ্মার শাখা নদী জলাঙ্গী হয়ে মেহেরপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পঞ্চম শতাব্দীতে সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য ‘রঘুবংশ’-তে বর্ণিত বঙ্গের বিবরণ অনুযায়ী সেই সময় মেহেরপুর ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত। সমুদ্রগুপ্ত এই সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন। ঐতিহাসিক বিবেচনায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর বঙ্গ ছিল রাজা শশাঙ্কের (শাসনকাল আনুমানিক ৫৯৫-৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) গৌড় রাজ্যের অধীনে। শশাঙ্ক ছিলেন বঙ্গের প্রথম স্বাধীন রাজা। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ।

মেহেরপুরে থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদের পাশে অবস্থিত এই কর্ণসুবর্ণ। গৌড় ও মেহেরপুর এলাকার নদীয়া একাকার হয়ে অখণ্ড বঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণকালে মেহেরপুর বঙ্গ বা গৌড়ের অধীনে ছিল। ওই সময় থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের আগমন পর্যন্ত মেহেরপুর বঙ্গ বা গৌড়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ধারাবাহিক ইতিহাস পরিক্রমায় স্পষ্টতই বলা যায়, শশাঙ্ক-শাসন পরবর্তী সময়ে গোপালকে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা নির্বাচিত করা হয়। তাঁর মাধ্যমে মেহেরপুরসহ গৌড়-বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মবলম্বী পালদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৪০০ বছর পালদের আঠারো পুরুষ রাজ্য পরিচালনা করেন। এরপর প্রাচীন যুগের শেষার্ধে কর্ণাটক থেকে আসা হিন্দু ধর্মাবলম্বী সামন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন (শাসনকাল ১০৯৭-১১৬০) গৌড়-বঙ্গ অধিকার করেন। মেহেরপুর অঞ্চল সেন বংশের অধীনে চলে যায়।

১১৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন এবং ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ¥ণ সেন রাজ্যভার গ্রহণ করেন। সেনরা কখনও লখনৌতি ও বিক্রমপুর, কখনও নবদ্বীপ বা নদীয়ায় অবস্থান করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। মেহেরপুর শহর থেকে নবদ্বীপের দূরত্ব মাত্র ৭১ কিলোমিটার। বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত একটি মন্দিরের অস্তিত্ব মেহেরপুর অঞ্চলে খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের আমলে মেহেরপুরের বাগোয়ান ও আমদহ সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। মেহেরপুরের ভবানন্দপুর গ্রামে সেই আমলের দুটি মুদ্রাও পাওয়া যায়। মেহেরপুর শহরের অদূরে আমদহ গ্রামে আবিষ্কৃত ঢিবি থেকে পাওয়া নিদর্শন পাল যুগ বা তারও আগের যুগের প্রত্নসম্পদ হতে পারে বলে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন। আমদহ থেকে বেলে পাথরের তৈরি একটি স্তম্ভ উদ্ধার করা হয়। স্তম্ভটি মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়। আমদহ মেহেরপুর শহর থেকে মুজিবনগর সড়ক ধরে এগোলে পাঁচ দশমিক চার কিলোমিটার এবং বাগোয়ান ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জোর দিয়ে বলা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই মেহেরপুরে জনপদ ছিল। মেহেরপুর শহরের নামকরণের সবচেয়ে প্রাচীন মতটি হচ্ছে, বিখ্যাত বচনকার খনা ও তাঁর স্বামী মিহির এক সময় মেহেরপুরের ভৈরব নদের তীরে বসবাস করতেন। মিহিরের নামানুসারে মিহিরপুর এবং অপভ্রংশে মেহেরপুর নামকরণ হয়েছে। এই নামকরণ সম্পর্কে আরেকটি মত হচ্ছে, মুন্সী মেহের আলী নামের একজন ব্যক্তি, যিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে মেহেরপুরে এসেছিলেন ষোড়শ শতকে বা তার কিছু পরে। তাঁর নামানুসারে মেহেরপুর নামকরণ করা হয়েছে।

মেহেরপুরের ইতিহাস নিয়ে রচিত পুরনো বিভিন্ন গ্রন্থে প্রধানত মিহিরের নাম থেকে মিহিরপুর ও পরবর্তীতে মেহেরপুর নাম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। মিহির হচ্ছেন বিখ্যাত দার্শনিক, জ্যোতিষবিদ, গণিতবিদ ও কবি বরাহ মিহিরের পুত্র (আনুমানিক ৫০৫-৫৮৭) এবং কবি বা বচনকার ও জ্যোতিষবিদ খনার স্বামী। খনা ও মিহির পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বর্তমান বারাসতের দেউলিয়া (চন্দ্রকেতুগড়) গ্রামে বাস করতেন। সেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে খনা ও মিহিরের ঢিপি। ঘটনাচক্রে খনা-মিহির এক সময় মেহেরপুরে বাস করেছিলেন। মেহেরপুর থেকে ২৪ পরগনার দূরত্ব ১৯৫ কিলোমিটার। যোগাযোগ ও দূরত্ব বিবেচনায় মেহেরপুরে খনা ও মিহিরের বসবাস অসম্ভব নয়।

মধ্যযুগের শুরুতে, ১২০২ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া দখল করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। নদীয়া জনপদের মেহেরপুরও মুসলিমদের শাসনের মধ্যে আসে। ১২০২ থেকে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস ক্ষমতা দখল ও পাল্টা দখলের মধ্য দিয়ে পার হয়। এর মধ্যে ১৪৯৪ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল হোসেন শাহীর শাসনামল বা বাংলায় সুলতানি আমল। সেন ও সুলতানদের মাধ্যমে মেহেরপুর অঞ্চলের মানুষ শাসিত হয়। সুলতানি আমলে পরগনা ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। মেহেরপুরের বিখ্যাত পরগনা বাগোয়ান ওই আমলের প্রথম দিকেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খান কররানিকে পদচ্যুত করে মুঘল সেনাপতি মুনিম খান বাংলায় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্য দিয়ে সম্রাট জালালউদ্দিন মুহম্মদ আকবরের (শাসনকাল ১৫৫৫-১৬০৫) শাসনাধীনে আসে মুর্শিদাবাদ-নদীয়া-মেহেরপুরসহ বাংলা অঞ্চল। পরবর্তীতে আকবরের পুত্র সম্রাট নুরুদ্দিন সেলিম জাহাঙ্গীরের (শাসনকাল ১৬০৫-১৬২৭) শাসনামলে এই অঞ্চল শাসিত হয়। এরপর মুঘল সম্রাট শাহজাহান (শাসনকাল ১৬২৭-১৬৫৮) ও আওরঙ্গজেব আলমগীরের (শাসনকাল ১৬৫৮-১৭০৭) মাধ্যমে এ অঞ্চল শাসিত হয়। মুঘল শাসনের মধ্যেই আসে বাংলায় কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনামল। এই দুই শাসনামলে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা মেহেরপুর অঞ্চলের মানুষকে কখনও সরাসরি, কখনও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজা ও জমিদারদের মাধ্যমে শাসন করেন। কোম্পানি ও ব্রিটিশদের শাসনকালকে এক কথায় ব্রিটিশ শাসনামল বলা হয়। নানা ঘটনা পরম্পরায় ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সিরাজউদদৌলার পতন ঘটিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসনকাল শুরু করে। ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সরাসরি ব্রিটিশরা এদেশ শাসন করে।

সম্রাট আকবর ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে মুঘল সেনাপতি মানসিংহ মেহেরপুরের বাগোয়ান হয়ে যশোর গিয়েছিলেন। বাগোয়ানে যুদ্ধ ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। বাগোয়ান থেকে যশোর যেতে নৌকায় ভৈরব নদ পার করে দিয়েছিলেন স্থানীয় মাঝি ঈশ্বর পাটনী। তিনি মানসিংহের কাছে এই বলে বর চেয়েছিলেন যে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। প্রসিদ্ধ বাগোয়ান পরগণার ভবানন্দ মজুমদার নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতি মানসিংহকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যকে দমনে সহায়তা করার পুরস্কার হিসেবে বাগোয়ানসহ ১৪টি পরগণা পান। তিনি প্রথমে বাগোয়ান পরগণার বল্লভপুর ও পরে মাটিয়ারিতে নদীয়া রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। নদীয়া রাজবংশ পরে স্থানান্তরিত হয় কৃষ্ণনগরে। মেহেরপুর অঞ্চল মুঘল ও নবাবি আমলে এইসব রাজা-জমিদারদের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসিত হয়। আওরঙ্গজেবের আমলে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে সংঘটিত মেহেরপুরের এনায়েত খাঁর নেতৃত্বাধীন ‘ফৌজদার লড়াই’ ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন মুর্শিদকুলি খান (শাসনকাল ১৭১৭-১৭২৭) বাংলার নবাব হন তখন মেহেরপুর তার শাসনাধীন এলাকার মধ্যে ছিল। নবাব আলীবর্দী খান (শাসনকাল ১৭৪০-১৭৫৬) এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার (শাসনকাল ১৭৫৬-১৭৫৭) শাসনামলে মেহেরপুরসহ সমগ্র বাংলার রাজস্ব আদায় করা হতো। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত ও হত্যা করা হয়। এরপর ব্রিটিশ শাসনামল শুরু হয়। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মেহেরপুরেও ব্রিটিশরা বাণিজ্য করার অধিকার পান। এই অধিকারবলে তারা মেহেরপুরে নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেন। মেহেরপুর শহরের শ্রীবর্ধনকারী গোয়ালা চৌধুরীদের বাড়ি ছিল বাগোয়ানে। জনশ্রুতি এই যে, নবাব আলীবর্দী খাঁ বাগোয়ানে শিকারের উদ্দেশ্যে আসেন। প্রত্যাবর্তনকালে দুর্যোগের জন্য তিনি রাজু ঘোষানী নামের এক গোয়ালা নারীর আতিথ্য গ্রহণে করতে বাধ্য হন। রাজুর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব রাজু ঘোষানীর গো-চারণের জন্য মেহেরপুরের পরগনা রাজপুর (রাজাপুর) দান করেন। রাজু ঘোষানীর পুত্রকে রাজা উপাধি দেওয়া হয়।

তিনি রাজা গোয়ালা চৌধুরী নামে খ্যাত হন। রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সময় থেকেই মেহেরপুরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। এই সময় বঙ্গাল মুলক মারাঠা বর্গীদের অত্যাচারে ব্যতিব্যস্ত হয়। মেহেরপুরের শ্রীবৃদ্ধি বর্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বর্গীরা বারবার মেহেরপুর আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে। অবশেষে বর্গীদের হাতে রাজু ঘোষানীর বংশধররা নির্বংশ হন। তাঁদের প্রাসাদতুল্য অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ মেহেরপুর শহরের গড়-পুকুরের পাশে মাটিচাপা পড়ে আছে। গোয়ালা চৌধুরীদের পর কাশিমবাজার কুঠির আওতাধীন মেহেরপুর অঞ্চল মুর্শিদাবাদের রাজমহলের প্রভাবশালী ভূস্বামী রাজা রাঘবেন্দ্রের অধীনে ও পরবর্তীতে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অধীনস্ত হয়। রানী ভবানীর পর কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ কুমারের দখলে যায় এই বিস্তৃত জমিদারি। পরে তার পুত্র রাজা কৃষ্ণনাথ জেমস হিল নামে এক নীলকরকে মেহেরপুরের পত্তনি দেন। ব্রিটিশ ও স্থানীয় জমিদাররা এখানে নীলচাষ শুরু করেন। জমিদার মুখোপাধ্যায় ও মল্লিকদের বংশ নানা কারণে মেহেরপুরের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ অঞ্চলে নীলচাষ ও নীল বিদ্রোহের জন্য মেহেরপুরের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। মেহেরপুরে সেকালে অনেক নীলকর বাস করতেন এবং নীলের বাণিজ্য করতেন। আমঝুপি, বিদ্যাধরপুর, কসবা, বামুন্দী, ভাটপাড়ায় তাদের প্রধান নীলকঠিগুলো অবস্থিত ছিল। মেদিনীপুর জমিদারি কোম্পানির নীলের কারবার মেহেরপুর মহকুমায় বিস্তৃত ছিল এবং আমঝুপি নীলকুঠি ছিল এই অঞ্চলের প্রধান দপ্তর।

ব্রিটিশ আমলে, নদীয়া জেলার অধীনে পাঁচটি মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এগুলো হচ্ছে- কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া। মেহেরপুর মহকুমা স্থাপিত হয় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। এর আগে মেহেরপুর ও গাংনী থানা স্থাপিত হয় ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। মেহেরপুর পৌরসভা স্থাপিত হয় ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। মেহেরপুর মহকুমার অধীনে মেহেরপুর ও গাংনী ছাড়াও ছিল তেহট্ট ও করিমপুর থানা। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভাগের সময় তেহট্ট-করিমপুর ভারতের অধীনস্থ হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে মেহেরপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীন এখন তিনটি থানা ও উপজেলা- মেহেরপুর, মুজিবনগর ও গাংনী। ব্রিটিশ আমলে অখণ্ড মেহেরপুর মহকুমার আয়তন ছিল ৬৩২ বর্গ মাইল বা ১০১৬.৮৮৮ বর্গ কিলোমিটার। তখন এই মহকুমার বিস্তৃতি ছিল পলাশীর পাশে ভাগীরথী নদীর তীর পর্যন্ত। মেহেরপুরের বর্তমান আয়তন ৪৪৪.৬৩৬ বর্গ মাইল বা ৭১৬ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় খুলনা, বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া পাকিস্তানের রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬০ সালে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মহকুমাসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়া, খুলনা, বৃহত্তর যশোর এবং তদানীন্তন বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) খুলনা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়। বরিশাল এখন স্বতন্ত্র বিভাগ।

১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয়। এর পূর্ব ও পরবর্তী সব আন্দোলনে মেহেরপুরের মানুষ অংশ নেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাদেশ অঞ্চল প্রথমে পূর্ব বাংলা ও পরে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত হয়। পাকিস্তানের অপর অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা বৈষম্যের সৃষ্টি করে। উপেক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সূচিত এই আন্দোলন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তীব্র হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং ওই বছরের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের সদস্যরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা অঅমবাগানকে মুজিবনগর নাম দেন। আর এই সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি ও বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। মেহেরপুর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হয়। এর ফলে মেহেরপুরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মেহেরপুরের উপজেলা সংখ্যা তিনটি- মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী। ঝংকৃত ইতিহাসের মেহেরপুরের প্রাচীনত্বসহ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও ওইতিহ্য রয়েছে।

মেহেরপুরের সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা রমনীমোহন মল্লিক সম্পাদিত মাসিক জ্যোৎস্না , অবিনাশচন্দ্র বিশ্বাস প্রকাশিত মাসিক সাধক, রেয়াজ উদ্দিন সম্পাদিত ইসলাম প্রচারক ও সোলতান। ব্রিটিশ আমলে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত এ পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়। এর পথ ধরে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে বেশ কিছু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

কিন্তু সবই ক্ষণস্থায়ী। এ অবস্থায় গত আট বছর ধরে মেহেরপুর থেকে এমএএস ইমনের প্রকাশনায় ও ইয়াদুল মোমিনের সম্পাদনায় দৈনিক ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’ প্রকাশিত হচ্ছে। এই পত্রিকাসহ মেহেরপুরের অন্যান্য গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীদের দায়িত্ব বাড়ছে। ইতিহাসের গভীর ও নিপাট পাঠ থেকে তাঁরা সমৃদ্ধ ও স্বপ্ন জাগানিয়া মেহেরপুরকে তুলে ধরবেন- এই প্রত্যাশা।

লেখক: মেহেরপুরে জন্মগ্রহণকারী ও ঢাকায় বসবাসকারী কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক।




সাংবাদিক-লেখকদের চ্যালেঞ্জ, রাষ্ট্রের দায়

শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সাংবাদিক-লেখকদের মুক্তমত-চর্চা অবদমনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। কালে কালে মুক্তমত প্রকাশ করার জন্য, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কলম ধরার জন্য লেখকরা নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হয়ে যাচ্ছেন।

সব সময় শাসকগোষ্ঠী মনে করেছে, গণমানুষ প্রশ্ন করা শিখলে তাদের কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব কমে যাবে। শাসক শ্রেণির ভয়টা মূলত এখানেই। তারা কখনোই চায় না দেশের বৃহত্তর জনগণ সত্য অন্বেষণ করতে শিখুক। তাই সাংবাদিক ও লেখকরা যখনই সাধারণ মানুষের মধ্যে চিন্তাশীল প্রবণতাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তখনই কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার কাঠামো কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছেন। লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে রাষ্ট্র, প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার।

এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ আইসিটি অ্যাক্টের কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। এই অ্যাক্টের আওতায় বিগত এক দশকে বেশ কয়েকজন লেখক-সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নানা-ধরনের’ অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে লেখক, শিল্পী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অসংখ্য মানুষকে। স্মর্তব্য যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তারকৃত লেখক মুশতাক আহমেদ কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিক আনিস আলমগীরের কথাও আমরা স্মরণ করতে পারি।

মুক্তমনা সাংবাদিক-লেখকদের কোনো সরকারই—বিপ্লবী হোক কিংবা প্রতিবিপ্লবী, ডান হোক কিংবা বাম অথবা মধ্যপন্থা—স্বাধীনভাবে কথা বলতে দিতে চায় না। যে কারণে প্রথাবিরোধী লেখকদের কারাবরণ করতে হয়, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজাও ভোগ করতে হয়। এর বাইরেও তাদের নানাভাবে প্রতিহত করা হয়।

ইতিহাস থেকে আমরা দেখি, মলিয়েরের মতো বিখ্যাত নাট্যকারের মৃত্যুর পর শেষকৃত্য হয়নি। তাকে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া সমাহিত করা হয় রাতের অন্ধকারে, তাও ব্যাপটাইজ না করা শিশুদের কবরস্থানে। কারণ তিনি সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানীদের বিদ্রূপ করেছেন। তথাকথিত ধার্মিকদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করার জন্য তার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে চার্চ। তার নাটক প্রদর্শনীর ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পার্লামেন্ট। নীতিবাগীশদের অভিযোগেও নিষিদ্ধ হয়েছে তার নাটক।

তৃতীয় বিশ্বের মুক্তমনা লেখক-সাংবাদিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। আফসোসের বিষয়, একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের গণমাধ্যমের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের প্রধান কাজ হয়েছে মুক্তমত ও বিরুদ্ধমতকে দমন করা। যেসব লেখক-সাংবাদিক দলীয় চিন্তার বাইরে গিয়ে, সরকারি সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন, ক্ষমতা কাঠামো ও প্রগতিবিরুদ্ধ ধ্যানধারণার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরই জেলে যেতে হয়েছে, অনেকে দেশান্তরি হয়েছেন, কাউকে কাউকে জীবন দিতে হয়েছে নির্মমভাবে।

অথচ, ইতিহাসে দেখা যাবে, প্রথাবিরুদ্ধ সত্যভাষী মানুষরাই—যাদের কারারুদ্ধ করা হয় বা করতে চায় শাসকগোষ্ঠী—তারাই পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। তাদের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে সর্বমানবিক রাষ্ট্র ও সাম্যবাদী সমাজ কাঠামোর ধারণা। লেখক-সাংবাদিকদের কাজ সেই ঐতিহ্য ও দায়কে মাথায় রেখে কলম ধরা। তারা কোনো দলীয় কর্মী নন, তারা সর্বমানবিক, সর্বপ্রাণবিক মুক্তির কথা বলতে আসেন।

আমাদের দেশের বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও লেখকদের এই ভূমিকা আরও বেশি প্রত্যাশিত। তাই বর্তমান সংবাদকর্মী ও কলমযোদ্ধাদের বলতে চাই, রাষ্ট্রচেতনা আর জনচেতনা দিয়ে সমাজচেতনা বা শিল্পচেতনা গড়ে ওঠে না। বরঞ্চ এ দুটোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্যই টিকে আছে আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের শিল্পসাহিত্য। একারণেই বলি, পপুলিস্ট কথা বলা সাংবাদিক-লেখকশিল্পীদের কাজ না। তারা রাজনীতিবিদের মতো নির্বাচনে দাঁড়াবেন না যে তাকে সাধু থেকে চোর সবার ভোট দরকার হবে। তারা পপুলার ধারণার বাইরে গিয়ে গ্রেটার ট্রুথের কথা বলবেন।

যে ন্যারেটিভকে গণমানুষ বিশ্বাস করে, বাস্তবতা বলে মেনে নেয়, সেই ন্যারেটিভ রাষ্ট্র তৈরি করে, সরকার তৈরি করে, নীতিবাগীশরা তৈরি করেন, ধর্ম তৈরি করে, জাতীয়তাবাদ তৈরি করে। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে লেখক ও সংবাদকর্মীরা সত্যটা তুলে ধরবে। তারা হবেন আনবায়াসড ট্রুথ।

তবে যে রাষ্ট্র লেখক-সাংবাদিকদের মুক্তমত চর্চা ও প্রথাবিরুদ্ধ-চেতনাকে স্বাগত জানায়, সেই রাষ্ট্র একটি মানবিক প্রগতিশীল সমাজ উপহার দেয়। যে সরকার সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার ভেতর দিয়ে মিডিয়ার সমালোচনা ও বিরুদ্ধ চেতনাকে মোকাবিলা করে, সেই সরকার একটি বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে কাজ করে।

জনগণের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’। ন বছরে পদার্পণ করেছে পত্রিকাটি। নানা প্রতিকূলতার মধ্য থেকে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটা পত্রিকার জন্য এটা একটা বড়ো ঘটনা। আমার প্রত্যাশা থাকবে জনগণের মুখপত্র হিসেবেই মেহেরপুর প্রতিদিন টিকে থাকবে, শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে না। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা তাদের কষ্ট বেদনা, তাদের দুর্ভোগ দুর্দশা, তাদের যাপনের দ্রোহ সবকিছু ধারণ করে টিকে থাকুক




এ তরি বাইতেই হবে . . .

৯ বছরে পদার্পণ কর‌লো আমাদের প্রিয় পত্রিকা মে‌হেরপুর প্রতি‌দিন। জেলা থে‌কে প্রকা‌শিত জনপ্রিয় দৈ‌নিক। সীমান্ত‌ঘেষা ছোট্ট জেলা মে‌হেরপুর থে‌কে এক‌টি দৈ‌নিক প‌ত্রিকা প্রকাশ অব‌্যাহত রাখা ‘নুন আন‌তে পান্তা ফু‌রো‌নো’ অবস্থা। যেখা‌নে ছাপাখানা নেই, প‌ত্রিকা মেকাপ করার মেকাপ ম‌্যান পাওয়া যায় না, প্রিন্ট করার জন‌্য যে ট্রেসিং পেপার ও কা‌লি প্রয়োজন হয় সেগু‌লোও পাওয়া যায় না। এর বাই‌রেও প‌ত্রিকার রসদ যোগা‌নো বিজ্ঞাপনদাতা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানও নেই। কা‌লেভ‌দ্রে শু‌ভেচ্ছা বিজ্ঞাপন পে‌তেও যে প‌রিমাণ বেগ পে‌তে হয়, তা আর নাই বললাম। অসংখ‌্য অসঙ্গ‌তির ম‌ধ্যে দি‌য়ে এক‌টি দৈ‌নি‌কের ৮ বছর অ‌তিক্রম করার ব‌্যাপার‌টি ছোট করে ভাবারও কিছু নেই। আমরা দলগতভাবে সেই ভাবনার কাজ‌টি ক‌রে চ‌লে‌ছি।

মেহেরপুরে সংবাদপত্রের ইতিহাসে এত বছর ধরে কোন পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি নানা কারণে। সকল প্রকার বাঁধাকে অতিক্রম করে মেহেরপুর প্রতিদিন ৮ বছর ধরে পাঠকের কাছে প্রতিদিন পৌছে দিয়েছে কড়কড়া পত্রিকা। সংগত কারণেই এ নিয়ে আমরা আনন্দিত, গর্বিত। মে‌হেরপুর প্রতি‌দিন‌কে আমরা পাঠকের মনের মনিকোঠায় নিতে পেরেছি। এই যাত্রায় আমাদের সঙ্গে আছেন অগণিত পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ী।

আপেল মাহমুদের গানের সেই লাইনগুলি মনে পড়ে বারবার।
জীবন কাটে যুদ্ধ করে
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে
জীবনের স্বাদ নাহি পাই

জানি শুধু চলতে হবে
এ তরী বাইতে হবে….।

পাঠকদের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে এ তরি আমরা বাইতেই চাই। মে‌হেরপুরসহ দ‌ক্ষিণ-প‌শ্চিমাঞ্চ‌লের সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা আমাদের প্রধান শক্তি। পাঠকসাধারণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে পত্রিকাটি আমরা ক‌রোনার অ‌তিমা‌রি‌তেও প্রকাশ করে গেছি। জুলাই গণঅভুত্থ্যানের সময় যখন সারাদেশে ইন্টারনেট সেবা অচল হয়ে গিয়েছিলো, সেসময়েও আমরা আমাদের প্রকাশনা অব্যহত রেখেছিলাম। আমরা বিশ্বাস করি, পাঠকই আমা‌দের সবচাইতে বড় শক্তি, বড় শ্রদ্ধার জায়গা। তাদের হাতে প্রতিদিন একটি গ্রহণযোগ্য পত্রিকা তুলে দেওয়ার চেষ্টা ৮বছর ধরে আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছি। আগামী দিনেও এই নিষ্ঠা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখব।

জনগ‌ণের মুখপত্র` এই স্লোগা‌নের স্বাক্ষর রে‌খে যা কিছু জনগ‌ণের জন‌্য কল‌্যাণ ব‌য়ে আ‌নে সেধর‌ণের সংবাদ প‌রি‌বেশ‌নের ক্ষে‌ত্রে আমা‌দের সহকর্মীরা নিরলস কাজ কর‌ছে।

সংবাদের ভিতরকার সকল স‌ত‌্য প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। অসততা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। আমরা নিরপেক্ষ নই। আমরা মানুষের পক্ষে। প্রতিটি সাধারণ মানুষ, প্রতিটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে আমা‌দের কলম চল‌বে। মানুষই আমাদের মূলশক্তি।

২০১৮ সা‌লের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিব‌সের দিন যাত্রা শুরু করেছিল মে‌হেরপুর প্রতি‌দিন। স্বাধীনতার এই মার্চ থে‌কে ডি‌সেম্বর পর্যন্ত ৯ মা‌সের যু‌দ্ধে আমরা পে‌য়ে‌ছি এক‌টি স্বাধীন রাষ্ট্র।

শুধু পত্রিকা প্রকাশ করেই আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করিনি। মাদকও অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ কবল থেকে যুবসমাজ রক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা মেহেরপুর প্রতিদিন ফুটবল টুর্নামেন্টেরও আয়োজন করেছিলাম। আয়োজন করা হয়েছিলো উদ্যোক্তা সম্মেলন ও চাকরি প্রার্থীদের চাকরি মেলা। পত্রিকার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে আমাদের প্রতি সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে লাইভ ‘টক শো’ অনুষ্ঠান চলমান রয়েছে। সবশেষে নতুন যুক্ত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ভার্সন। ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমেও দর্শকদের মাঝে এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা গল্প তুলে ধরছে আমাদের সহকর্মীরা।

পরিশেষে আমাদের পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও মেহেরপুর প্রতিদিনকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের প্রত্যেককে শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

লেখক: সম্পাদক, মেহেরপুর প্রতিদিন




মেহেরপুরের সীমান্ত এলাকা থেকে ৬ হাজার ১৭৫ লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দ, আটক ২

মেহেরপুর সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী দক্ষিণ শালিকা গ্রামে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করে রাখা ৫ হাজার ৩৭৫ লিটার এবং ফতেপুর গ্রাম থেকে আরও ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমানের নেতৃত্বে সদর থানা ও ডিবি পুলিশের একটি যৌথ টিম এ অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানটি চালানো হয় গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় অবস্থিত ‘ফারাবী ট্রেডার্স’-এর গোডাউনে ও ফতেপুরে পৃথক অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এ সময় ফারাবি ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী আবু সুফিয়ান ও ফতেপুরের মোয়াজ্জেম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

মেহেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি গোডাউনে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে রাখা হয়েছে।

পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে ড্রাম ভর্তি ২৬টি ব্যারেল থেকে মোট ৫ হাজার ৩৭৫ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। ফতেপুরে কয়েকটি ব্যারেল হতে ৮০০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়।

তিনি আরও জানান, জব্দকৃত তেলের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি । এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ওসি জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।




বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মেহেরপুর প্রতিদিন সকলের মনে স্থান করে নিয়েছে

একটি প্রান্তিক ও সীমান্তবর্তী ছোট জেলায় একটি দৈনিক পত্রিকা ৮ বছর পেরিয়ে স্বমহিমায় প্রতিদিন প্রকাশ করা একটি বীরত্বগাঁথা পরিচয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আসা অতিথিরা।

গতকাল মঙ্গলবার ৩১ মার্চ প্রতিষ্ঠার ৯ বছর উপলক্ষে মেহেরপুর প্রতিদিন আয়োজন করে দিনব্যাপী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর নানা আয়োজন।

সকাল সাড়ে ১০টায় উদ্বোধণী অনুষ্ঠানে মেহেরপুর প্রতিদিনের সম্পাদক ইয়াদুল মোমিনের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার উজ্জল কুমার রায়, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান, মেহেরপুর জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তোজাম্মেল আযম, বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক।

দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও সাবির্ক দায়িত্ব পালন করেন মেহেরপুর প্রতিদিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাহাবুব চান্দু।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার উজ্জল কুমার রায় বলেন, সাংবাদিকতা পেশা আর দশটা পেশার মতো নয়। এই পেশা হচ্ছে মানুষের কল্যাণের জন্য এটি একটি ব্রত, এটি একটি সেবা। পত্রিকাকে বলা হয় সমাজের দর্পণ, জাতির বিবেক। বস্তনিষ্ঠ এবং সমাজের ছোট ছোট ঘটনা গুলো যেগুলো সমাজকে বিপথে নিয়ে যায়, আমাদের বিবেককে তাড়িত করে এই ধরনের প্রকাশনার মাধ্যমে মানুষের পরিবর্তন সাধিত হয়।

আমি মনে করি মেহেরপুর প্রতিদিন একটি প্রান্তিক জেলায় এবং সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে আট বছর পরেও দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায় এটি একটি বীরত্বগাঁথা পরিচয়। আপনারা দেখেছেন অনেক জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। কোন পত্রিকা শুরু করাটা যতটা সহজ কিন্তু এটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া তার চেয়েও অনেক কঠিন।

মেহেরপুর প্রতিদিনের সাথে যারা যুক্ত তারা কিন্তু তাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন বলেই এই পত্রিকাটি এখনও চলমান রয়েছে। আমি মনে করি এই পত্রিকাটি আগামীতেও তাদের বস্তুনিষ্ঠ এবং জনগণের কন্ঠস্বর হয়ে আমাদের দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে যথেষ্ট অবদান রাখবে, সেই প্রত্যাশা রাখি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক বলেন, মেহেরপুর প্রতিদিন জনগণের একটাই ভরসার জায়গা যে তারা কোন লেজুড়বৃত্তিক সংবাদ প্রকাশ করে না, তার নিজস্ব গতিতেই প্রকাশ করে এটাই তার স্বকীয়তা। মেহেরপুর প্রতিদিন অষ্টম বর্ষ শেষে নবম বর্ষে পদার্পণ করল, আমি তার উত্তোরত্তোর সাফল্য কামনা করি।

মেহেরপুর জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও যুগান্তর প্রতিনিধি তোজাম্মেল আযম বলেন, সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে যে চরিত্র হওয়া উচিত সেই চরিত্র বাংলাদেশের কোন মিডিয়াতে নাই। আদর্শ সংবাদপত্র কেমন হওয়া উচিত? আদর্শ সংবাদপত্র সত্য ও সুন্দর কথা বলবে, গণমানুষের কথা বলবে, নির্যাতিত মানুষের কথা বলবে, নির্যাতিত মানুষের কন্ঠস্বর হবে। মেহেরপুর প্রতিদিন মানুষের বিবেক হয়ে উঠুক সেই প্রত্যাশায়।

মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, দৈনিক পত্রিকা হিসেবে চুয়াডাঙ্গা ঝিনাইদহ কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা মেহেরপুর প্রতিদিন।

আমি পত্রিকার কাছে একটা বিষয়ে অনুরোধ রাখবো আপনারা সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১ দফা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড তুলে ধরবেন। বিগত সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিষয়ে নিউজ করবেন।

মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া মাদক এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জনগণের মাঝে সংবাদ তুলে ধরবেন। আমি মেহেরপুর প্রতিদিনের উত্তরোত্তর সাফল্য ও মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করুক সেই প্রত্যাশা করি।

২য় পর্বের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন, বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশিদ।

মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, শুধু নেতিবাচক খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের কাজ। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলানো দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের। মেহেরপুর প্রতিদিন তাদের দায়িত্বশীল যায়গা থেকে সমাজ উন্নয়নে ভুমিকা রাখবে এ প্রত্যাশা করি।

কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশিদ বলেন, মেহেরপুরে ৫০টি নেই এর সংখ্যা থাকলে বিপরীত দিকে কয়েকশত আছে বিষয়গুলো রয়েছে। একটি সংবাদ মাধ্যম সেই নেই এর পিছনে না দৌড়িয়ে যেগুলো আছে সেগুলো নিয়ে যদি কাজ করে এলাকার কৃষ্টি কালচার উন্নতি, সমাজের উন্নয়ন হয়, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ সেগুলো জানতে পারে। আমি মেহেরপুর প্রতিদিনের কাছে আশা করি নেগেটিভ সংবাদ যেমন পত্রিকায় স্থান পাবে পাশাপাশি ভালো সংবাদগুলোও পত্রিকায় বিশেষভাবে স্থান দেওয়ার।

জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন বলেন, মেহেরপুর প্রতিদিন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মেহেরপুরের জনগণের কাছে স্থান করে নিয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি তাদের সেই বস্তুনিষ্ঠতা ধরে রেখে মেহেরপুর উন্নয়ন ও দুনীতি নির্মুলে অগ্রণী ভুমিকা রাখবে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মারুফ আহমেদ বিজন বলেন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪ এর জুলাইয়ের চেতনাকে সামনে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মেহেরপুর প্রতিদিন সে প্রত্যয় ও বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। আমরা পত্রিকার উত্তোরত্তর সাফল্য কামনা করি।

দিনব্যাপী ৯টি পর্বে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পৃথকভাবে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন, মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধাক্ষ প্রফেসর আবদুল্লাহ আল আমিন, মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, মেহেরপুর পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস, মুজিবনগর সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষক মুরাদ হোসেন, মেহেরপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ আরিফুল ইসলাম, অরণি থিয়েটারের সভাপতি নিশান সাবের, সাংবাদিক দিলরুবা খাতুন, শিক্ষক ও সাংবাদিক রফিকুল আলম বকুল, শিক্ষক ও উপস্থাপক ইয়ামিন হাসান, গাংনী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক, মেহেরপুর পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানা ডলার, শিক্ষাবিদ আল আমিন ইসলাম বকুল, জামায়াত নেতা নুর রহমান, মঞ্জুরুল হক টুটুল, আমজাদ হোসেন, মেহেরপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল এনাম বকুল, সদস্য আনোয়ারুল হক কালু, আবু হানিফ, তহবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক কর্মী শামিম জাহাঙ্গীর সেন্টু, অনিক হাসান।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মেহেরপুর প্রতিদিনের সাংবাদিক ও স্টাফদের নিয়ে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন স্টাফ রিপোর্টার শহিদুল ইসলাম, সদর উপজেলা প্রতিনিধি এস আই বাবু, ডেস্ক ইনচার্জ (নিউজ) সাকিব হাসান রুদ্র, ডেস্কু ইনচার্জ (মাল্টিমিডিয়া) রাফি হাসান, ডেস্ক ইনচার্জ ইয়াসির ইউসুফ ইমন, কাথুলী প্রতিনিধি ফিরোজ হাসান পলাশ।




মেহেরপুরের বারাদীতে এসএস বিদ্যা নিকেতনে অভিভাবক সমাবেশ ও নবীন বরণ

মেহেরপুরের বারাদীতে এসএস বিদ্যা নিকেতনে অভিভাবক সমাবেশ ও নবীন বরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় বিদ্যাপীঠের আম্রকাননে সুধীজন, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে আনন্দঘন পরিবেশে এ সমাবেশ ও নবীন বরণ অনুষ্ঠিত হয়।

এসএস বিদ্যা নিকেতনের পরিচালক সেলিম হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা ও বারাদী ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক রকিবুল হাসান। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়।
অতিথিদের বক্তব্য শেষে নবীনদের বরণ, শিশুদের নৃত্য পরিবেশন এবং ২৬ মার্চের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন মোমিনপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেদী রেজা, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন মেহেরপুর জেলা সভাপতি সিরাজুল ইসলাম, বারাদী পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই মনিরুজ্জামান, ওদুদ শাহ ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল জিন্নাত আলী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট রফিক উল আলম, জেলা তাঁতী দলের সভাপতি আরজুল্লাহ রহমান বাবলু মাস্টার, সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক লিয়াকত আলী মেম্বার, ইউপি সদস্য কামরুজ্জামান মুকুল এবং বারাদী পুলিশ ক্যাম্পের টু আইসি এএসআই আরুজ আলী।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন এসএস বিদ্যা নিকেতনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সিরাজুস সালেকীন।




ঝিনাইদহে স্কুলছাত্রীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের অভিযোগ

ঝিনাইদহের মহেশপুরে এক স্কুলছাত্রীকে বাড়ি ফেরার পথে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে এবং তা প্রদর্শন করে অভিযুক্তরা এলাকায় ‘উল্লাস’ করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার মহেশপুর থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেছে।

এজাহার ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যায় ওই স্কুলছাত্রী পাশের বাড়ি থেকে নিজের বাসায় ফিরছিল। পথিমধ্যে সামন্তা বাগদিরাইট গ্রামের রাস্তার ওপর থেকে শাওন ও হযরত আলী তার মুখ চেপে ধরে পাশের একটি ঘাসক্ষেতে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেখানে আরও দুজন যোগ দেয়।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, একই গ্রামের হাফেজুল ইসলামের ছেলে হযরত আলী, তরিকুল ইসলামের ছেলে শাওন এবং দিনুর ছেলে নয়ন পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় ফরিদ হোসেনের ছেলে আমিন ওই ছাত্রীর মুখ চেপে ধরে রাখে যাতে সে চিৎকার করতে না পারে।
এ ঘটনায় শাওন ও আমিন মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে। ধর্ষণের পর তারা ভিকটিমকে হত্যার হুমকি দেয় এবং ঘটনাটি জানাজানি হলে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়।

ভুক্তভোগী ওই স্কুলছাত্রী অশ্রুশিক্ত কণ্ঠে বলে, “ওরা আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে সর্বনাশ করেছে। আমার পরিবারকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছিল, তাই ভয়ে কিছু বলিনি। কিন্তু ওরা নিজেরা সেই ভিডিও মানুষকে দেখিয়ে আনন্দ করছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”
মামলার বাদী ফাতেমা খাতুন বলেন, সামাজিক মর্যাদা ও জীবনের ভয়ে আমরা প্রথমে চুপ থাকলেও অভিযুক্তরা ভিডিওটি লোকজনকে দেখায়। তখন বিষয়টি আমাদের নজরে আসে।

এ বিষয়ে মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, “এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে আমরা অভিযান চালাচ্ছি।”




মেহেরপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

মেহেরপুরে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রবৃষ্টিতে গম, ভুট্টাসহ উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও সময়মতো পাকা গম কেটে ঘরে তুলতে না পারায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। পেকে যাওয়া গমের জমিতে পানি জমে থাকায় ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন চাষিরা।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে গমের ফলন ভালো হলেও জ্বালানি তেলের সংকট ও হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ার কারণে সময়মতো গম কাটতে পারেননি তারা। এর মধ্যেই গতকাল (৩০ মার্চ) রাত ৯টার দিকে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে মাঠের অধিকাংশ পাকা গম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এতে গম ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য মতে, গত বছর বিঘাপ্রতি গম কাটতে যেখানে খরচ হতো ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, সেখানে চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। তবুও পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো গম কাটতে পারেননি। ফলে ঝড়-বৃষ্টির আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় মাঠে লুটিয়ে পড়া গম দ্রুত সংগ্রহ করতে না পারলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত অপরিপক্ব ও দেরিতে বপনকৃত গমে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৩ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। ফলন ভালো হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে না পারার কারণে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে কালবৈশাখী ঝড়ে গমের পাশাপাশি ভুট্টা ও কলা চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড় ও বৃষ্টির কারণে কিছু চাষির কলাগাছ নুয়ে পড়েছে। এছাড়া অপরিপক্ব ভুট্টা ক্ষেতের বেশিরভাগ গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, যা ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে কৃষকদের মাঝে।

জেলার ঢেপা-পাঙ্গাসী পাড়া গ্রামের গম চাষী শাহাদত হোসেন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করছেন, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েননি। তার গম বেশ কিছুদিন আগেই কাটার উপযোগী হয়েছিল। তবে হারভেস্টার মেশিন না পাওয়ায় সময়মতো গম কাটতে পারেননি। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষকই শ্রম ও সময় বাঁচাতে মেশিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে গত রাতের ঝড়ে তার পাকা গম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এখন সেই পড়া গম কাটতে অতিরিক্ত খরচ হবে। দ্রুত গম কাটতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সাহারবাটী গ্রামের গম চাষী জহিরুল ইসলাম জানান, তার এবার এক বিঘা জমিতে গম রয়েছে। কিন্তু গম কাটার মেশিনের অভাবে এখনো তা কাটতে পারেননি। গত রাতের ঝড় ও বৃষ্টিতে ক্ষেতের সব গম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।

ভাটপাড়া গ্রামের ভুট্টা চাষী আব্দুল আলীম জানান, তার ও তার ভাইয়ের পাশাপাশি জমিতে দুই বিঘা করে ভুট্টা চাষ করা হয়েছিল। কিন্তু গত রাতের ঝড়ে তাদের জমির প্রায় অর্ধেক ভুট্টা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অনেক খরচ ও পরিচর্যার পর মোচা আসার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। ফলে লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ মাটিতে পড়ে যাওয়া গাছের অপরিপক্ব ভুট্টা থেকে আর কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না।

জুগিন্দা গ্রামের ভুট্টা চাষী হৃদয় ইসলাম জানান, তাদের এক বিঘা জমিতে ভুট্টা রয়েছে, যেখানে গাছে কেবল মোচা আসা শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় গত রাতের ঝড়ে অধিকাংশ জমির ভুট্টা গাছ নুয়ে পড়েছে। এতে করে নুয়ে পড়া গাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে তাদের ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফলন না পেলে সেই খরচও উঠে আসবে না।

কলা চাষী রাজিব জানান, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও অধিকাংশ কলাগাছ বাঁকা হয়ে গেছে। গত রাতের ঝড়ে তার ৫-৬টি গাছ ভেঙেও পড়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু আবার যদি ঝড়-বৃষ্টি হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে গেলে গমের বড় ধরনের ক্ষতি নাও হতে পারে। বিষয়টি অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অনুকূল আবহাওয়া ফিরে এলে ফসলের পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকে।