পুনর্গঠনের দায়বদ্ধতা: ববি হাজ্জাজ, এমপি
একটি জাতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন বিজয় মোটেই বিজয়ের মতো অনুভূত হয় না। সেটি হয়ে উঠে হিসাব-নিকাশের এক তালিকা। তখন কেবল ভাঙনের শব্দ শোনা যায়।
দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, শূন্যপ্রায় রাজকোষ,—সব মিলিয়ে যেন এক সচল কিন্তু গন্তব্যহীন রাস্তা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী আছে কিন্তু শিক্ষা নেই; দপ্তরে কর্তৃত্ব আছে কিন্তু কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই। বাংলাদেশের নতুন সরকার ক্ষমতার মসনদে বসেনি, বরং এক চরম পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
আমাদের মতো যারা এক দশকেরও বেশি সময় রাজপথে আন্দোলন, সমাবেশ, যুক্তি আর প্রতিরোধের লড়াইয়ে শামিল ছিলেন, তাদের কাছে সরকার গঠন কোনো রাজ্যাভিষেক নয়। এটি ইতিহাসের এর এক কঠিন পরীক্ষা। যে ভোটের অধিকারের জন্য আমরা লড়াই করেছি এখন তার মর্যাদা রক্ষা করার সময়। যারা দীর্ঘ বিরোধিতার সময়ে জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন, এখন ক্ষমতার প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে সেই জনগণের কাছেই আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জাতির সামনে যে ইশতেহার তুলে ধরেছিলেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল প্রতিশ্রুতির কোনো লম্বা তালিকা বা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির প্রচলিত চটকদার কোনো সাহিত্য ছিল না। এর মূলে ছিল ভোটের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা, দায়বদ্ধ সরকার গঠন, সাংবিধানিক ও নির্বাচনী সংস্কার এবং এমন এক বাংলাদেশ গড়া যা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও রাজনৈতিকভাবে স্বচ্ছ। ৫১টি অগ্রাধিকার ভিত্তিক পয়েন্টের মাধ্যমে তিনি একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছেন যা জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ । এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। যে দেশে দীর্ঘদিন ধরে কাজের চেয়ে ফাঁকা বুলি বা স্লোগান বেশি ছিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল, সেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা বড়ো কথা নয়; বরং আসল চমক হলো উন্নয়নকে জনগণের অধিকার ও জবাবদিহির সাথে যুক্ত করা।
কিন্তু ইশতেহার বিমূর্তভাবে শাসন করে না। ইশতেহার শূন্যে বাস্তবায়িত হয় না; একে লড়তে হয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধ্বংসস্তূপের সাথে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন গ্যাস সংকটে স্থবির।
আইএমএফ-এর মতে, আমাদের ব্যাংকিং খাত চরম ঝুঁকিতে; রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ আর খেলাপি ঋণের বোঝা পাহাড়সম। এগুলো কেবল কাগজের সংখ্যা নয়, এগুলো একটি ভেঙ্গে পড়া রাষ্ট্রের লক্ষণ। এ হলো আমাদের উত্তরাধিকারের অর্থনৈতিক গদ্য: মন্থর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ আর প্রভাবশালীদের কবজায় থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জরাজীর্ণ শহর, ভেঙে পড়া সেবা খাত আর এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম, যাদের স্বপ্নের পরিধি কর্মসংস্থানের সুযোগের চেয়ে অনেক বড়ো।
আমরা ভাগ্যের দোহাই দিতে পারি, কিন্তু একটি উন্নয়নশীল দেশে ভাগ্য মানে হলো বিদ্যুৎ ঠিকঠাক থাকা, ঋণের সঠিক মূল্য থাকা, স্কুলে পড়াশোনা হওয়া আর ঘুষ ছাড়া দাপ্তরিক কাজ হওয়া।
ইতিহাস তার দুষ্ট হাসিতে আরও একটা বোঝা যোগ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে শিপিং ব্যাহত হওয়া এবং কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকা আমাদের জ্বালানি ও সার সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ, সারের কারখানা, শিল্পের উৎপাদন—সব জায়গায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যখন আমাদের উপকূল থেকে অনেক দূরে একটি সরু জলপথ আমাদের বাজারের মেজাজ নির্ধারণ করা শুরু করে, তখন ভূগোলই হয়ে ওঠে ভাগ্য।
আমাদের অঞ্চলটিও খুব একটা স্থিতিশীল নয়। দক্ষিণ এশিয়া এখনো কৌশলগত অবিশ্বাস আর সীমান্ত সমস্যার জালে বন্দি। এমন এক প্রতিবেশে কোনো সরকারের পক্ষে ভাববিলাস বা অহংকারের সুযোগ নেই। আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। মুখের বুলি দিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয় না। আজকের পৃথিবীতে সার্বভৌমত্ব মানে সক্ষমতা। খাদ্যে সক্ষমতা, জ্বালানিতে সক্ষমতা, শিক্ষায় সক্ষমতা, প্রশাসনে সক্ষমতা, বিশ্বাসযোগ্যতায় সক্ষমতা।
এই কঠিন সময়ে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বের এক ভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। বর্তমানের জাঁকজমকপূর্ণ রাজনীতির ভিড়ে তিনি মিতব্যয়িতা ও গাম্ভীর্যকে বেছে নিয়েছেন, যেমনটি করেছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব। ক্ষমতা তার কাছে ছিল আমানত। জবাবদিহি ছিল তার শাসনের কেন্দ্রে। আমাদের মতো একটি দরিদ্র দেশে নেতৃত্বের এই কৃচ্ছ্রসাধন কেবল লোকদেখানো নয়, এটি পুরো রাজনৈতিক শ্রেণির জন্য একটি শিক্ষা যেখানে ভোগবিলাসের রাজনীতির সমাপ্তি অনিবার্য। মন্ত্রিসভা নিয়েও আমাদের সংযত থাকা দরকার। এটি কোনো জাদুকরদের দল নয়, আবার অযোগ্যদের সমাবেশও নয়। এখানে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের কণ্ঠস্বরও যুক্ত হয়েছে। একটি পুনরুদ্ধার হতে থাকা গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভাকে চাকচিক্যময় হওয়ার প্রয়োজন নেই; একে হতে হবে দক্ষ, সংহত এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো বিনয়ী।
আমার নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই শিক্ষাকে। রাজনীতি যদি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা হয়, তাহলে তার কোনো নৈতিক মূল্য নেই। রাজনীতির মূল্য তখনই, যখন তা মানুষের জীবনের সম্ভাবনা বদলায়। শিশুর ভবিষ্যৎ বদলায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যা একজন শিক্ষার্থীকে বুঝতে, লিখতে এবং যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে শেখাবে। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি যদি মজবুত না হয়, তবে উচ্চশিক্ষা কেবল হতাশারই জন্ম দেবে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ছিল ৭৪ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে তা ছিল ৭৭.৯ শতাংশ। আমাদের সাক্ষরতার হার কাগজে-কলমে বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু কেবল নাম দস্তখত করতে পারা বা ফরম পূরণ করতে পারার নাম শিক্ষা নয়। আমাদের লক্ষ্য তাই শুধু সাক্ষরতার সংখ্যা বাড়ানো না। আমাদের লক্ষ্য প্রকৃত সাক্ষরতা, যা শিশুকে মাধ্যমিক স্তরে সফল করবে, কারিগরি শিক্ষাকে শক্ত করবে এবং উচ্চশিক্ষাকে অর্থবহ করবে।
সামনের কাজ তাই বিশাল। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হবে, কিন্তু মানুষের উপর নিষ্ঠুর বোঝা চাপিয়ে নয়। রাষ্ট্রকে সংস্কার করতে হবে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা তৈরি করে নয়। দৃঢ় হাতে শাসন করতে হবে, কিন্তু গণতন্ত্রের দাবি জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। ইশতেহারের চেতনা ধরে রাখতে হবে কিন্তু নামমাত্র স্লোগানে গা ভাসানো যাবে না।
তবু আশার জায়গা আছে। সে আশা মিছিলের ঢাকঢোলের আশা না। সে আশা পতাকা ওড়ানোর আবেগের আশা না। সে আশা আরও গভীর। রাজপথের লড়াই থেকে উঠে আসা একটি সরকারকে এটা প্রমাণ করতে হবে তাদের এতদিনের লড়াই আর ত্যাগ কেবল স্লোগান বা নাটক ছিল না, ছিল একটি মানবিক ও জবাবদিহিমূলক দেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা।
এখন তাই কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি। নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত প্রজাতন্ত্রের কাছে আজ উল্লাস অর্থহীন। এই প্রজাতন্ত্র চায় সংযম। চায় সততা। চায় দায়িত্বশীলতা এবং সবচেয়ে বেশি চায় কাজ।