বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূণ্যভূমি মুজিবনগর—এই নাম উচ্চারণ করলেই ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই ইতিহাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বল্লভপুরের সন্তান তাজউদ্দিন খান। দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু এবার মানুষ ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি প্রত্যাশার পরিবর্তন, আস্থার পরিবর্তন, আর এক অর্থে ক্ষোভেরও প্রকাশ।
‘তাজউদ্দিন’—নামের অর্থ ধর্মের মুকুট, আদর্শের শিরোমণি। নামের এই প্রতীকী ব্যঞ্জনা এখন এক কঠিন পরীক্ষার সামনে। কারণ মেহেরপুরের মানুষ বহুবার ইশতেহার শুনেছে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দেখেছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ফল ততটা পায়নি। তাই নতুন এই অধ্যায় শুরু হয়েছে এক নীরব প্রশ্ন নিয়ে—এবার কি সত্যিই বদল আসবে?
মেহেরপুর কৃষিনির্ভর জেলা। এ অঞ্চলের মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, আম—ফসলের বৈচিত্র্যে ভরপুর এই জনপদ। অথচ কৃষক আজও ন্যায্যমূল্য, সার-বীজের সহজ প্রাপ্তি এবং সেচের নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকে। নির্বাচনের আগে ঘোষণা ছিল—এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না; কৃষক দলীয় পরিচয়ে নয়, চাষের ভিত্তিতে সুবিধা পাবে। এই অঙ্গীকার যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা হবে মেহেরপুরের অর্থনীতির ভিত শক্ত করার প্রথম ধাপ। কৃষিকে ঘিরে যদি গড়ে ওঠে সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও সহজ বাজারব্যবস্থা, তবে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে।
কিন্তু কৃষির পাশাপাশি আরেকটি অন্ধকার ছায়া আজ গ্রাস করছে জনপদকে—মাদক ও অনলাইন জুয়া। কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, কত তরুণ হারিয়েছে স্বপ্নের দিশা। মাদকমুক্ত ও জুয়ামুক্ত মেহেরপুর গড়ার প্রতিশ্রুতি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে নয়, সামাজিক জাগরণেও বাস্তবায়িত হতে পারে। প্রয়োজন কঠোরতা ও সহমর্মিতার সমন্বয়।
শিক্ষার উন্নয়ন নিয়েও উচ্চারণ করা হয়েছে আশাবাদী শব্দ। পাঠনির্ভর শিল্পায়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা—এসব যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তরুণ প্রজন্মের হাতে কর্মসংস্থানের আলো জ্বলবে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যদি যুক্ত হয় জ্ঞাননির্ভর উদ্যোগ, তবে মেহেরপুর হতে পারে এক সম্ভাবনার মডেল জেলা।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। গ্রামীণ সড়ক, বাজার অবকাঠামো ও সংরক্ষণাগার উন্নত না হলে কৃষকের ঘাম সঠিক মূল্য পাবে না। উন্নয়ন মানে কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব পরিবর্তন।
মুজিবনগরের মাটি ইতিহাসের সাক্ষী। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তাই সাধারণ কোনো রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়—এ এক নৈতিক অঙ্গীকার। নতুন এমপি হিসেবে তাজউদ্দিন খানের সামনে সুযোগ আছে প্রমাণ করার, পরিবর্তন কেবল স্লোগান নয়; এটি কর্মের ধারাবাহিকতা।
অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি তিনি দলীয় সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে কৃষক, শিক্ষার্থী, যুবক ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে এই বিজয় অর্থবহ হবে। অন্যথায় ইতিহাসের পূণ্যভূমিও নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির।
মানুষ ভোট দিয়েছে আশা নিয়ে। এখন সময় সেই আশাকে বাস্তবের মাটিতে বপন করার।