মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সরকারিভাবে তেল সংকট না থাকলেও বৈষম্যের মাধ্যমে তেল বিক্রির অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা। সিন্ডিকেট করে তেল সংকট তৈরী করছে একটি মহল।
মেহেরপুরে তেলের সংকটে শুধু মোটরসাইকেল নয়, জমি চাষের কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টরের দীর্ঘ লাইনও এখন চোখে পড়ছে পেট্রোল পাম্পগুলোতে। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় সময়মতো জমি চাষ করতে পারছেন না ট্রাক্টর মালিকরা।
এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। স্থানীয় সিন্ডিকেট আর বৈষম্যের মাধ্যমে তেল বিক্রয়ের অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। আজ শুক্রবার ভোর তিনটার সময় থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে হামলার শিকার হলেন গাংনী উপজেলার জোড়পুকুরিয়া গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন।
কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমি দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর তেল নিতে গেলে আমার সামনে চার-পাঁচজন জোরপূর্বক মেশিন কেড়ে নিয়ে ট্যাঙ্কি ভর্তি করে তেল নিয়ে যাচ্ছিল। জোরপূর্বক তেল নেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ করাই পাম্পে থাকা সিন্ডিকেটের লোকজন আমার উপর অতর্কিত হামলা করেছে। আমি বিএনপি করি, বিএনপির লোকজন আমাকে মেরেছে, আমি নেতা কর্মীদের অবগত করছি।
ট্রাক্টর চালকদের অভিযোগ, তাদের যেখানে ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ লিটার তেল। এই সীমিত তেল নিয়ে মাঠের কাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তবে জেলার উপজেলা কৃষি অফিস গুলো থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতে ডিজেল কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে ট্রাক্টরের জন্য একদিনে ৫০ লিটার, পাওয়ার টিলারের জন্য দুই দিনে ২০ লিটার এবং সেচ ইঞ্জিনের জন্য দুই দিনে ১০ লিটার তেল বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষি অফিসগুলোতে ডিজেল কার্ড সংগ্রহ করতে ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে।
পাম্পে অপেক্ষমাণ ট্রাক্টর চালকরা জানান, সকাল থেকে লাইনে থাকলেও কখন তেল মিলবে তা নিশ্চিত নয়। তেল পেলেই মাঠে নামবেন, কিন্তু বিলম্বের কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মতে, সময়মতো জমি চাষ করা না গেলে বীজ বপনে দেরি হবে এবং ফসলও নামলা হয়ে যেতে পারে।
পাম্পে তেল নিতে আসা ট্রাক্টর চালক মহিবুল বলেন, ভোর থেকেই তিনি ট্রাক্টরে তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দুপুর হয়ে গেলেও কখন তেল পাবেন, তা নিশ্চিত নন। প্রয়োজন ৭০ থেকে ৮০ লিটার হলেও দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ লিটার।
এতে জমি ঠিকমতো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, গম কাটা প্রায় শেষ, এখন পাট বোনার সময়, এজন্য জমি চাষ দেওয়া জরুরি। তাই দ্রুত ট্রাক্টরগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ট্রাক্টর চালক ও মালিক সাইদ জানান, সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র এক হাজার টাকার তেল পেয়েছেন, যা কাজে লাগার মতো নয়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কাজও বন্ধ থাকছে। তিনি বলেন, এভাবে চললে কাজ করা সম্ভব না, এবং ট্রাক্টর চালকদের জন্য সন্ধ্যার পর তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
ট্রাক্টর চালক শফি বলেন, পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পেয়ে তিনি কৃষি অফিসে ডিজেল কার্ড নিতে এসেছেন। শুনেছেন, কার্ড থাকলে একদিনে ৫০ লিটার তেল পাওয়া যাবে এবং এই কার্ডের মাধ্যমে মাঠে ট্রাক্টর রেখেই তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে কিছুটা হলেও ভোগান্তি কমবে বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে কৃষকরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। চাষি আলী আজগর বলেন, ডিজেলের অভাবে ট্রাক্টর চালকরা জমি চাষ করতে পারছেন না। গম কাটা শেষ হওয়ায় এখন পাট ও আউশ ধানের আবাদ শুরু করার সময়। তিনি বলেন, এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ ব্যাপারে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়র রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে জমি চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অনুমতিক্রমে কৃষি যন্ত্রের জন্য ডিজেল কার্ড চালু করা হয়েছে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও সেচ পাম্প মালিকদের মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পাম্প মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে। এর আগে গম কাটার কম্বাইন হারভেস্টারের জন্যও একই ধরনের কার্ড চালু ছিল।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, ট্রাক্টর চালকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সব পাম্পে একসঙ্গে তেল পৌঁছায় না, তাই সকাল থেকেই তেল বিতরণ করার কথা বলা হয়েছে। তবে ট্রাক্টর চালকদের সন্ধ্যার পর তেল দেওয়ার দাবি গ্রহণ করা হয়নি, কারণ এতে আবার নতুন করে সমস্যা তৈরি হতে পারে।