ভাষা আন্দোলনর সময় প্রায় অখ্যাতই ছিল ভারত সীমান্তঘেঁষা প্রান্তিক মহকুমা শহর মেহেরপুর। যার পরিচিতি ঘন আমবাগান আর পলাশীর ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু ইতিহাসের সেই নীরব জনপদ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৫ মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জেগে উঠেছিল দৃঢ় প্রতিবাদে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই, পুলিশি জুলুম চলবে না স্লোগানে মুখর হয়েছিল পথঘাট।
ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মেহেরপুরে হরতাল পালিত হয়। “উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা” ঘোষণার বিরুদ্ধে মেহেরপুর হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা ধর্মঘট ও বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শহরজুড়ে ছাত্রমিছিল বের হয়। রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হলেও চেতনায় পিছিয়ে ছিল না এই শহর।
১৯৫১ সালের এপ্রিল মাসে আন্দোলন আবারও বেগবান হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও হতাহতের খবর পৌঁছালে মেহেরপুরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। মুন্সী সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে আওলাদ হোসেন, কাওসার আলী, ইসমাইল হোসেনসহ শিক্ষার্থীরা পোস্টারিং ও পিকেটিংয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণকালে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেও তা ছত্রভঙ্গ করতে পারেনি। কালাচাঁদ হলের সামনে আবুল কালামের সভাপতিত্বে সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বক্তারা সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। ঢাকার ডাকে সাড়া দিয়ে প্রান্তিক মেহেরপুরে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ পদচারণায় একুশের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
ভাষার দাবি তখনও পূরণ হয়নি। ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবসের প্রভাত ফেরি পালন করতে গিয়ে প্রশাসনের কঠোর দমননীতির মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। শুক্লা গাঙ্গুলির নেতৃত্বে রিপন গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা ওই প্রভাত ফেরিতে যোগ দেন, শিক্ষকদের বাধা উপেক্ষা করে। প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মেহেরপুর সরকারি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মুন্সি সাখাওয়াৎ হোসেন, নজীর হোসেন বিশ্বাস এবং তাঁর সহযাত্রী কদম রসুল, সামসুল আলা, আবুল কাসেম, ইসমাইল হোসেন প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। পরে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তদবিরে তাদের ছাড়িয়ে আনা ছাড়াও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। আজ ওই সাতজনের কেউই জীবিত নেই।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিলে অংশ নেওয়া গোলাম কাউসার চানার পুত্র জি এফ মামুন লাকি জানান, এতদিন ভাষাসংগ্রামীদের মূল্যায়ন বলতে একুশে ফেব্রুয়ারি এলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া দিয়ে সংবর্ধনাই ছিল একমাত্র স্বীকৃতি। ২০২৪ সালের পর সেই আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনাও বন্ধ হয়ে গেছে।
মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব চান্দু বলেন, এত বছরেও ভাষাসংগ্রামীদের রাষ্ট্রীয় তালিকা হয়নি। তাঁদের পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর নেওয়ারও কোনো উদ্যোগ নেই। এটি ইতিহাসের প্রতি অবহেলা।”
মেহেরপুরের ভাষাসংগ্রামীদের নাম আজও কোনো সরকারি পূর্ণাঙ্গ তালিকায় নেই। তাঁদের অনেকেই প্রয়াত; পরিবারগুলোও অবহেলিত। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সম্মাননা কিংবা আর্থ-সামাজিক সহায়তার বিষয়টি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন করা জাতির জন্য এটি এক বেদনাদায়ক প্রশ্ন। প্রান্তিক শহরের যাঁরা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তাঁদের নাম-পরিচয় কি ইতিহাসের প্রান্তেই পড়ে থাকবে?
মেহেরপুরের সচেতন মহল মনে করে, অবিলম্বে ভাষাসংগ্রামীদের যাচাই-বাছাই করে রাষ্ট্রীয় তালিকা প্রণয়ন, তাঁদের পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়া এবং প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে প্রান্তিক এই শহরের অবদান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে- আর ইতিহাস হয়ে উঠবে অসম্পূর্ণ।