ঝিনাইদহে ভ্যানের ধাক্কায় পথচারী নিহত

ঝিনাইদহে ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ধাক্কায় শমসের আলী (৭৫) নামের এক পথচারী বৃদ্ধ নিহত হয়েছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) সকালে শহরের আরাপপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শমসের আলী হরিনাকুন্ডু উপজেলার সাবেক বিন্নি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মন্ডলের ছেলে। বর্তমানে তিনি শহরতলী মুরারীদহ গ্রামে ছেলে বাড়িতে থাকতেন।

স্থানীয়রা জানায়, সকালে ছেলের বাড়ি থেকে ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুরে যায় শমসের আলী। আরাপপুর এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি কলাবোঝায় ভ্যান তাকে ধাক্কা দেয়। এতে গুরুতর আহত হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

ঝিনাইদহ আরাপপুর হাইওয়ে থানার ওসি মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, নিহতের লাশ সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা আছে। পরিবার থেকে অভিযোগ দিলে ময়নাতদন্ত করা হবে।




ঝিনাইদহের ২৬ কিলোমিটার সড়কে বৃক্ষরোপন কর্মসূচীর উদ্বোধন

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গিকার বাস্তবায়নে ঝিনাইদহে ২৬ কিলোমিটার সড়কে বৃক্ষরোপন কর্মসূচীর উদ্বোধন করা হয়েছে।

বুধবার সকালে শৈলকুপা উপজেলার বসন্তপুর এলাকায় এ কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ। সেসময় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকরা জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সড়কপথকে সবুজে ঘেরা রাখতে ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। শেখপাড়া-লাঙ্গলবাধ সড়কের ২৬কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২ হাজার ৫০০চারা রোপন করা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, জেলার প্রতিটি সড়কে পর্যায়ক্রমে সৌন্দর্যবর্ধক ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ঝিনাইদহ জেলাকে একটি নান্দনিক ও পর্যটন সম্ভাবনাময় জেলায় রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় সড়ক ও জনপদ বিভাগকে স্বাগত জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এখন থেকে তারা যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করবে, সেখানে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা।




কুষ্টিয়ায় সাব-কন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তি বিষয়ক অবহিতকরণ সভা

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে সাব-কন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তি বিষয়ক এক অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার সকালে কুষ্টিয়ার বিসিক জেলা কার্যালয়ের আয়োজনে কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী সাব-কন্ট্রাক্টিং সংক্রান্ত বিধিমালা অন্তর্ভুক্তি এবং ওয়ার্ক অর্ডার সার্ভিস (ওএসএস)-এর মাধ্যমে সাব-কন্ট্রাক্টিং তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়।

সভায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উপ মহাব্যবস্থাপক আশানুজ্জামান মুকুল বলেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সরকার নতুন বিধিমালা চালু করেছে। এর ফলে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি সরকারি চাহিদা পূরণের সুযোগ পাবে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী এখন থেকে ৫৯টি সরকারি দপ্তরে প্লাস্টিক, সিরামিক ও ধাতব পণ্য সরবরাহ করা যাবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ক্ষুদ্র শিল্প খাত আরও শক্তিশালী হবে। উদ্যোক্তাদের এখনই প্রস্তুত হয়ে এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

এতে কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি কাজী রফিকুর রহমান, নাসিব কুষ্টিয়ার প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইউনুস খান, সাধারণ সম্পাদক এসএম নুরুন্নবীসহ এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিসিক কুষ্টিয়ার উপ ব্যবস্থাপক সোহেল রানা, বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা সোহাগ আহমেদ, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাপলা সুলতানা উপস্থিত ছিলেন।




কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলছাত্রের মৃত্যু

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিদ্যুৎষ্পৃষ্ট হয়ে আজমল হোসেন (১৩) নামেষষ্ঠ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আজমল হোসেন দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের ফারাকপুর গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের ছেলে এবং সে তারাগুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল।

নিহত স্কুলছাত্রের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার বিকেলের দিকে নিজ বাড়ির গোসলখানায় গোসল করার জন্য বৈদ্যুতিক মোটরের সুইচ দিতে গিয়ে সে বিদ্যুৎষ্পৃষ্ট হয়। এসময় পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তার মৃত্যু হয়।

এবিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা এক স্কুলছাত্র চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎষ্পৃষ্ট হয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা তিনি শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ অবহিত করেননি। বিষয়টি জানানো হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।




মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন

মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন। মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন। মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন। মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন।

Oplus_153223168

Oplus_153223168

Oplus_153223168

মেহেরপুর প্রতিদিনের ৯ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দিনব্যাপী বণার্ঢ্য আয়োজন।




মেহেরপুর প্রতিদিন: ঐতিহ্যের ধারায় সাহসী অগ্রযাত্রা

মেহেরপুরের মাটি, ইতিহাস ও মানুষের কথা তুলে ধরার এক অনন্য প্রয়াস হিসেবে দৈনিক মেহেরপুর প্রতিদিন আজ ৯ম বছরে পদার্পণ করেছে—এ এক গৌরবের মুহূর্ত, শুধু একটি পত্রিকার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য।

একটি অবহেলিত ও সম্ভাবনাময় জনপদ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা নিঃসন্দেহে সাহস, শ্রম ও দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রকাশক এম.এ.এস ইমন, সম্পাদক ইয়াদুল মোমিন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাহবুব চান্দুসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরলস প্রচেষ্টায় এই পত্রিকাটি আজ মেহেরপুরের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মেহেরপুরে সংবাদপত্রের ইতিহাস একদিনে গড়ে ওঠেনি। ‘সাধক’, ‘পল্লী শ্রী’, ‘সীমান্ত’, ‘প্রবাহ’ থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক ও অনিয়মিত নানা প্রকাশনা এই অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার ভিত তৈরি করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় দৈনিক মেহেরপুর প্রতিদিন আজ একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি শুধু সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ ও মানুষের গল্প তুলে ধরে এক প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, যেখানে অনেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি উদ্যোগ নেননি, সেখানে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে এম.এ.এস ইমন সাহস করে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং তা সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

পত্রিকাটির বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, উপস্থাপনার সৌন্দর্য, সাহিত্য ধারা এবং বস্তুনিষ্ঠতা পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। ‘মুক্তকথা’ অনুষ্ঠানের মতো উদ্যোগও স্থানীয় পর্যায়ে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রকাশক ইমন, সম্পাদক ইয়াদুল ও ব‍্যাবস্থাপনা সম্পাদক চান্দুর সাহসী পথচলা মেহেরপুরের সংবাদপত্রের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আমি তাদেরকে অভিনন্দন জানাই।দোয়া রইল তাদের জন্য।এগিয়ে যাও মেহেরপুরবাসীকে সাথে নিয়ে। আমরা তোমাদের সাথে আছি।

একথা সত্য যে, মেহেরপুরের মতো ছোট ও কৃষিনির্ভর এলাকায় একটি দৈনিক পত্রিকা টিকিয়ে রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু প্রতিকূলতা জয় করেই মেহেরপুর প্রতিদিন এগিয়ে চলেছে—এটাই এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

এই শুভক্ষণে প্রত্যাশা—পত্রিকাটি আরও সমৃদ্ধ হোক, আরও নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ হোক, মানুষের কথা বলুক, সত্যের পক্ষে থাকুক।
পরিশেষে বলা যায়,এগিয়ে যাক দৈনিক মেহেরপুর প্রতিদিন,এগিয়ে যাক মেহেরপুরের গণমাধ্যম, এগিয়ে যাক এই অঞ্চলের মানুষ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনা।

 

মুহাম্মদ রবীউল আলম: লেখক-সাংবাদিক।ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী




নবম বর্ষে মেহেরপুর প্রতিদিন

২৬ মার্চ নবম বর্ষে পদার্পণে জেলার একমাত্র আয়না ও  মুখপত্র ‘‘মেহেরপুর প্রতিদিন’’ পত্রিকার পরিবারকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজ থেকে নয় বছর আগে মেহেরপুর প্রতিদিন নামক কাগজটি জন্ম নিয়ে অনেক চড়ায় ঊৎরায় ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আট বছর সফল ভাবে পার করেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের ঐতিহাসিক পটভূমিতে  সবচেয়ে ছোট্ট জেলা মেহেরপুর হলেও  ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি দখল করে আছে। শত  বছরের প্রতীক্ষার স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম জনযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের তীর্থ স্থান, প্রথম রাজধানী, প্রথম সরকার গঠন, শপথ গ্রহণ এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিচালিত হয় এই মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। নানা কারণেই আমাদের ছোট্ট জেলাটি সারা দেশে এক ঈর্ষণীয় স্থান দখল করে আছে। কিন্তু একটি কাগজের অভাবে আমরা জানাতে পারতাম না আমাদের অর্জনের কথাগুলো। মেহেরপুর প্রতিদিনের জন্মের পর আমরা সেই অভাব কিছুটা হলেও মিটাতে পেরেছি।

মেহেরপুরের উর্বর মাটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, এটি প্রতিরোধের, প্রতিবাদের এবং সত্যের প্রতিক। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছে সাহসী কন্ঠ সাহসী কলম যোদ্ধা আর সেই কন্ঠের আধুনিক রূপ একটি দৈনিক পত্রিকা ‘‘মেহেরপুর প্রতিদিন’’ । এর নবম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের উৎসব নয়, এটি সত্য প্রকাশের উন্নয়নের দিক নির্দেশনামূলক এক নিরন্তর যাত্রার মাইলফলক। প্রতিদিনই ইতিহাসের দালিলিক প্রমাণ পত্র হয়ে থাকছে। ‘‘মেহেরপুর প্রতিদিন’’ গত নয় বছরে প্রমাণ করেছে একটি স্থানীয় পত্রিকা একটি জেলার জন্য কতটা প্রয়োজন এবং কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সকালে মেহেরপুরের মানুষ প্রিয় কাগজ মেহেরপুর প্রতিদিনে চোখ বুলিয়ে যে যার কাজে যায়।

সীমিত সামর্থ, সীমিত সম্পদ অন্যদিকে সীমাহীন চ্যালেঞ্জ তবুও তারা থেমে যায়নি। কারণ তাদের কাছে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয় এটি একটি পবিত্র আমানত পবিত্র দায়িত্ব, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রতিশ্রুতি। বাহ্যিক দৃষ্টিতে কলমের মূল্য পাঁচ টাকা হলেও দায়িত্বের চেয়ারে এর মূল্য অসীম। শহীদের রক্তের চেয়ে কলমের কালি দামি মেহেরপুর প্রতিদিন তা ভুলে যায়নি। সুন্দর জাতি রাষ্ট্র পৃথিবীর জন্য যেসব গণমাধ্যম কলম যোদ্ধা শব্দ যোদ্ধা সাংবাদিক সব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে অবদান রেখেছেন এবং রেখে চলেছেন জীবনদান করেছেন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, পরিবার পরিজন ও সম্পদ হারিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞতা জানাই। বহু প্রাচীন সভ্যতা একটি অংশ জ্ঞানচর্চা। এই জ্ঞানচর্চা কালের বিবর্তণে বহুরূপে প্রচারিত এবং প্রকাশিত মানবিক সেবার সবচেয়ে জনপ্রিয় আস্থার মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যম। সেখানেও যুক্ত হয়েছে মেহেরপুর প্রতিদিন। মেহেরপুর প্রতিদিন কতৃপক্ষ কোনদিন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনা।

যুগে যুগে একটি সুন্দর পৃথিবী স্বাভাবিকভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করা সহজ হলেও সত্যিকারের সমাজ পরিবর্তন, দেশ ও জাতি গঠনের এবং মানবিক বিশ্বের জন্য সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রকৃত সাংবাদিক হওয়া অনেক কঠিন দায়িত্বের এবং চ্যালেঞ্জের। সাংবাদিকতার পূর্ব শর্ত একজন সাংবাদিককে অধ্যাবসায়ী, সময়ের মূল শিক্ষানুরাগী, সাহসী, প্রতিবাদী, সৎ, বিনয়ী, ধৈর্যশীল, শৃঙ্খলা, গভীর মানবতা প্রেমী, ত্যাগী বিশ্বাসী সর্বপরি অনেক জ্ঞান সম্পন্ন হতে হয়। তাঁকে বুঝতে হবে তার পবিত্র কলমের মর্যাদা ও সম্মান। জনকল্যাণই হবে মুখ্য বিষয়। এখানে বীরোচিত সম্মান আছে কিন্তু অঢেল অর্থ সম্পদ নেই। জেনে শুনে বুঝে এই পেশায় আসা উচিত।

সবার জন্য গণমাধ্যম এবং রাজনীতি নয় কিন্তু আমাদের দেশে পুরোটাই উল্টো! আমরা এখনও ব্যক্তি দল সংগঠন প্রতিষ্ঠান এবং সরকার কেন্দ্রিক সমালোচনা করতে শুনতে স্বাগত এবং দুঃখিত বলতে খুব একটা অভ্যস্ত নয়। দায়িত্বের চেয়ার গুলো বৃদ্ধি পেলেও দায়িত্ব বোধ সেভাবে বাড়ছে না। বেড়েছে আইন, কমেনি অপরাধ। মহান রাজনীতি আজ মাঠে নেই, পকেটে যার ফলে সুনীতির জন্য হাজার কোটি টাকার কার্য্যক্রম চললেও আজো দুর্নীতিকে রুখে দিতে পারেনি। রাষ্ট্রের মহাজন জনগণ এখন পরাধীন, চাকরের ভূমিকায় পবিত্র কলম, পবিত্র শপথ ।  পবিত্র পোশাক, পবিত্র চেয়ার কেন আজ শ্রদ্ধাহীন, অবিশ্বাস এবং বিতর্কিত? নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলে জেনে শুনে অপরাধ মেনে নিচ্ছি এবং দূর্নীতিকে উৎসাহিত করছি। সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রের সফলতা বিফলতার চিত্র তুলে ধরার।  আর সে দায়িত্ব কিছুটা হলেও স্থানীয়ভাবে তুলে ধরছে আমাদের প্রিয় দৈনিক মেহেরপুর প্রতিদিন কাগজটি।

‘‘মেহেরপুর প্রতিদিন’’ এর নবম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গিকার হোক *কলম বিক্রি হবে না *সত্য চাপা পড়বে না *অন্যায়ের সাথে আপোষ হবে না *ক্ষমতার সামনে মাথা নত করা যাবে না *জনতার মুখপাত্র হিসেবে আপোষহীন পথ চলা। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কর্ম চিরস্থায়ী এবং ইতিহাসে দালিলিক প্রমাণপত্র হয়ে থাকবে আমাদের প্রিয় মেহেরপুর প্রতিদিন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।

২৬ মাচর্ মেহেরপুর প্রতিদিনের প্রতিষ্ঠার দিনে প্রত্যাশা করি তার আদর্শকে লালন করে  বেঁচে থাকবে যুগযুগ সত্য ন্যায়ের প্রতীক হয়ে।




একটি পত্রিকা, একটি প্রভাতের প্রতিশ্রুতি

নবাবী আমলের শেষ সূর্যোদয় হয়েছিল পলাশীর আম্রকাননে— সেটি ছিল এক যুগের অবসানের প্রতীক। সেই সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতার একটি অধ্যায় চিরতরে নিভে যায়। কিন্তু ইতিহাস কখনো শূন্যতায় থেমে থাকে না। সময়ের স্রোত নতুন প্রভাতের জন্ম দেয়।

বহু বছর পর, সেই বাংলার বুকেই আবার সূর্য ওঠে— এবার স্বাধীনতার, আত্মমর্যাদার, জাতিসত্তার সূর্য। সেই সূর্যোদয়ের পুণ্যভূমি মুজিবনগর। মুজিবনগরের আম্রকানন— একটি নাম, একটি স্থান, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি জাতির পুনর্জন্মের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল, দগ্ধ-রক্তাক্ত এক সময়ের মধ্যে এখানেই শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। সেই শপথ ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; ছিল প্রতিজ্ঞা, ছিল সংগ্রামের অঙ্গীকার, ছিল স্বাধীনতার অগ্নিশপথ। যুদ্ধক্ষেত্রে তখন গর্জে উঠছে বন্দুক, চারদিকে অনিশ্চয়তা, তবুও সেই সরকার নেতৃত্ব দিয়েছিল নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধকে— একটি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিল বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে।

মেহেরপুর জেলা— নিরীহ, কৃষিনির্ভর, শান্ত এক জনপদ। এই মাটিতে ধানের শিষ দোলে, কৃষকের ঘামে সিঞ্চিত হয় জীবনের চক্র। কিন্তু এই সরলতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে গভীর ইতিহাস, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের কাহিনি। এখানকার মানুষ যেমন জমিতে ফসল ফলায়, তেমনি সময়ের প্রয়োজন হলে ইতিহাসও রচনা করে। আর সেই ইতিহাসকে ধরে রাখার, লালন করার এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম— সংবাদপত্র। মেহেরপুর জেলায় সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল “পরিচয়” দিয়ে। নামের মধ্যেই ছিল এক ধরনের আত্মপরিচয়ের সন্ধান। সেই পত্রিকা ছিল সময়ের দর্পণ, সমাজের ভাষ্যকার। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের কথা বলার প্রয়োজন কখনো বদলায়নি। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘আমাদের সূর্যোদয়’ এবং ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’ এই দুই পত্রিকা জেলার মানুষের কথা বলার দায়িত্ব বহন করছে। এর মধ্যে মেহেরপুর প্রতিদিন একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। ২৬ মার্চ পত্রিকাটি আট বছরপূর্তী। ২৭ মার্চ নয় বছরে পদার্পণ করেছে।

আট বছর— সময়ের হিসাবে হয়তো দীর্ঘ নয়, কিন্তু একটি জেলা-ভিত্তিক পত্রিকার জন্য এটি এক বিশাল অর্জন। কারণ একটি পত্রিকা টিকিয়ে রাখা মানে শুধু ছাপাখানার কালি আর কাগজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক সংগ্রাম, পেশাগত চ্যালেঞ্জ, সামাজিক চাপ এবং অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিকূলতাও। একটি পত্রিকা যখন পথচলা শুরু করে, তখন তার সামনে থাকে হাজারো অনিশ্চয়তা। পাঠক পাবে কি না, বিজ্ঞাপন আসবে কি না, সত্য প্রকাশের সাহস ধরে রাখা যাবে কি না— এসব প্রশ্ন প্রতিনিয়ত তাড়া করে। সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মেহেরপুর প্রতিদিন ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। এটি শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়, বরং একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করা, সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরা— এসব দায়িত্ব কোনো অংশে কম নয়। বরং অনেক সময় এই দায়িত্বই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথেই সাহসিকতার সঙ্গে হেঁটেছে মেহেরপুর প্রতিদিন। জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অবহেলিত মানুষের কষ্ট, স্থানীয় প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা কিংবা সামাজিক অসঙ্গতি— সবকিছুই তারা তুলে ধরেছে নির্ভীকভাবে। ফলে পত্রিকাটি দ্রুতই হয়ে উঠেছে গণমানুষের মুখপত্র।

একটি পত্রিকার প্রকৃত শক্তি তার পাঠকের মধ্যে। যখন পাঠক বিশ্বাস করে— এই পত্রিকা তার কথা বলবে, তার সমস্যাকে গুরুত্ব দেবে, তখনই সেই পত্রিকা সত্যিকারের শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মেহেরপুর প্রতিদিন সেই বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে। একটি ছোট্ট গ্রামের কোনো কৃষকের সমস্যা, কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, কোনো নারীর সংগ্রাম— সবকিছুই এই পত্রিকার পাতায় জায়গা পেয়েছে। এটি কেবল সংবাদ পরিবেশন করে না; এটি মানুষের গল্প বলে। কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, কখনো আশার আলো জ্বালায়। কোনো একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে যখন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, কোনো সমস্যার সমাধান হয়— তখনই একটি পত্রিকার সার্থকতা পূর্ণতা পায়।

তবে এই পথ সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অনলাইন মিডিয়ার প্রতিযোগিতা— সবকিছু মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়েছে। বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের জগতে টিকে থাকা মানেই প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা। সেই চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করেছে মেহেরপুর প্রতিদিন। ডিজিটাল যুগে যখন তথ্যের বন্যা, তখন সত্য যাচাই করে নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ভুয়া খবরের ভিড়ে সত্যকে আলাদা করে তুলে ধরা— এটি এক ধরনের নৈতিক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে এই পত্রিকাটি। মেহেরপুরের মানুষ যেমন পরিশ্রমী, তেমনি তাদের মনও উদার। তারা ভালোবাসে নিজের মাটি, নিজের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একটি পত্রিকা যখন তাদের পাশে দাঁড়ায়, তখন সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান থাকে না— এটি হয়ে ওঠে পরিবারের অংশ।

আজ যখন মেহেরপুর প্রতিদিন নবম বছরে পদার্পণ করছে, তখন এটি কেবল একটি বার্ষিকী নয়; এটি একটি যাত্রার মাইলফলক। এই নয় বছর পত্রিকাটিকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে হয়, কীভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়, কীভাবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—— পলাশীর আম্রকাননে একটি সূর্য অস্ত গিয়েছিল, আর মুজিবনগরের আম্রকাননে আরেকটি সূর্য উদিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও প্রতিদিন সূর্য ওঠে— সংবাদপত্রের পাতায়, মানুষের কণ্ঠে, সত্যের আলোয়। মেহেরপুর প্রতিদিন সেই আলোরই একটি অংশ। এটি প্রতিদিন নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা নিয়ে আসে— সত্যের, সাহসের, ন্যায়বিচারের। আট বছর পার করে এটি প্রমাণ করেছে— ইচ্ছা থাকলে, সাহস থাকলে, দায়বদ্ধতা থাকলে একটি ছোট্ট শহরের পত্রিকাও বড় হয়ে উঠতে পারে মানুষের হৃদয়ে। আগামী দিনের পথ আরও দীর্ঘ, আরও চ্যালেঞ্জিং।

কিন্তু ইতিহাস বলে— যে মাটিতে একবার সূর্য ওঠে, সেই মাটিতে অন্ধকার চিরস্থায়ী হয় না। মেহেরপুরের মাটিও তেমনই। এখানকার প্রতিটি ভোর নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে। আর সেই সম্ভাবনার সঙ্গী হয়ে, মানুষের পাশে থেকে, সত্যের পথে অটল থেকে— মেহেরপুর প্রতিদিন এগিয়ে যাবে আরও অনেক দূর। কারণ, এটি শুধু একটি পত্রিকা নয়— এটি একটি প্রতিশ্রুতি, একটি বিশ্বাস, একটি চলমান সূর্যোদয়।




ভাঙাগড়ার রাজনীতি

যেকোনো ভাঙন পরবর্তী সময়ে নতুন এক প্রতিবেশের রূপকল্প জেগে ওঠে। কখনো কখনো বৃত্তচ্যুতির আনন্দ উল্লসিত করে মনকে। কিন্তু সব ভেঙে ফেললেই কি আরাধ্য পৃথিবীর জন্ম হয়?

কি ভাঙবো কতটা ভাঙবো কেন ভাঙবো তার পরিমিতিবোধ বা প্রশ্নও কি জরুরী নয়? ” সবকিছু ভেঙে পড়ে” উপন্যাসে হুমায়ুন আজাদ আমাদের এক মর্মন্তুদ পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যেখানে তুলে আনা হয়েছে নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার কাতরতা,; সামাজিক অপরাপর সম্পর্ক ভেঙে পড়ার করুন দৃশ্যপট। বর্তমানে আমরা আজাদের উপন্যাসের মতই এক অসহায় পৃথিবীর বাসিন্দা। যেখানে নিয়তির মতো সবকিছু ভেঙে পড়ছে। সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে, অনাস্থার দোলাচালে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে, সহাবস্থানের রাজনৈতিক ব্যপ্তি ভেঙে পড়ছে, মানুষের গর্ব দীপ্ত অর্জিত মিনারগুলো ভেঙে পড়ছে, আমাদের আদর্শিক অর্জিতের ৭১ ও ৭১ পরবর্তী সময়শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।ভাঙাটাই কি সৃষ্টি ? ভাঙ্গন পরবর্তী কি কোনো সৃষ্টি হচ্ছে বা হয়েছে?

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেঙে পড়ল স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ত্রাসন। চেতনার ভিত্তির উপর দাঁড় করানো ক্ষমতা ভেঙে পড়ল। ঐতিহাসিক ৩২, স্বোপার্জিত স্মৃতির মিনার, কবর, বাউলের আখড়া বাড়ি ভেঙে পড়ল, চেতনার তীব্র বধের ফলায় ভেঙে ফেলা হলো আরেক চেতনা। এখানে টিকে থাকার বিকল্প হিসেবে আদিম উপায় গুলোকে ব্যবহার করা হলো ইচ্ছে মতো। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর মোটাদাগে শুরু হলো চেতনা বনাম চেতনার লড়াই। ব্যক্তি ব্যর্থতার দায় চেপে গেল ৫২ ৬৬ ৬২ ৬৯ ৭১ এর কাঁধে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হলো ইতিহাসের শরীর। এখন নতুন ইতিহাসের অভূতপূর্ব জন্মভার বইছে বাংলাদেশ। যেখানে লেখা হতে চলেছে দায়মুক্তির এক নতুন ইতিহাস। কিসের দায়মুক্তি? এই দেশ নাকি ভুল ইতিহাসের লজ্জার ফসল। তাই ইতিহাস মেরামতের কাজ চলছে।

মানুষকে মিথ্যা ইতিহাসের বাতাবরণ থেকে মুক্তি দিতে এখানে ইতিহাসের স্কুল চালু হয়েছে। চেনা ৭১ কে নতুনভাবে চেনানো হচ্ছে। একাত্তরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ; শহীদের প্রকৃত সংখ্যা বিতর্ক তুলে ; স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কের কবিয়াল লড়াই শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ভেঙে দেয়ার কাজ চলছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থাপত্যের মূর্ত প্রতীক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স। ৫ই আগস্ট এর হাতুড়ি গুড়িয়ে দিয়েছে তার তিন শতাধিক ভাস্কর্য। শাহজাদপুরে রবি ঠাকুরের কাছারিবাড়ীর স্মৃতিচিহ্ন, ছায়ানোটির সংগ্রহশালা। কি দোষ সেগুলোর? দোষ একটাই নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে অন্তরায় এগুলো। তাই ভাঙো এবং ভেঙে ফেলো। তোমরাই তো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সভ্যতার অনিবার্য অংশ। উপহার হিসেবে তোমার মাথায় দেওয়া হবে দায়মুক্তির মুকুট ।

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স এর ভাস্কর্য গুলো অনল বর্ষী ইতিহাসের স্মারক। মহান মুক্তিযুদ্ধকে একচিলতে মানচিত্রে তুলে আনার নিপুণ শিল্পকর্ম। এখন এমন এক বিপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। যেখানে কোন শক্ত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে কোন আইনি প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়নি। দেশজুড়ে এই ভাঙনদূর্বৃত্তির মূলে রয়েছে ইতিহাসকে মুছে ফেলার সুক্ষ নকশা।

কিন্তু ভাঙলেই কি মোছা যায়৷ ইতিহাসের মজ্জাগত ক্রমধারা। যা ধাবিত হয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ইতিহাস নদীর মতোই ধাবমান। শত বাধা পেরিয়ে আপন পথ সে ঠিকই খুঁজে নেয়। সন্দেহ নেই এখন ভাঙাটাই সৃষ্টি। কিন্তু তার আগে গড়ে তোলার জন্য চাই উপযুক্ত উপকরণ। তবেই গড়ে উঠবে আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবী। দেয়াল তুললেই কেবল ঘর নয় সৃষ্টি হতে পারে আয়নাঘরও।




সাংবাদিকতার দায়: পক্ষ, বিপক্ষ, নিরপেক্ষ

সাংবাদিকতাও কি একটি পেশা?

পেটের দায়ে তো মানুষ কত কিছুই করে, প্রচলিত পেশার মধ্যে কুলিয়ে উঠতে না পেরে কেউ কেউ নতুন নতুন পেশার উৎসমুখ নিজে থেকেই খুলে নেন, নতুন খাতে পেশাগত দক্ষাতা রচনা করেন, নতুন পেশাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হন এবং বহু গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও প্রচেষ্টায় ওই পেশার কাঠমোগত রূপরেখা দাঁড় করিয়ে নেন। ওই পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারটাও জরুরি হয়ে ওঠে। গোড়াতে ধর্মপ্রচারের কাজটি অবৈতনিক স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ তথা ‘ ব্রত’ বলে গণ্য হলেও দিনে দিনে তারও পেশাগত আদল দাঁড়িয়ে গেছে। মসজিদের ইমাম কিংবা মুয়াজ্জিনের জন্যেও বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করে তবেই নিয়োগ দেয়া হয়।

বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্যে বড় বড় আলেম মওলানা স্বনির্ধারিত ফি কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে তারপর মঞ্চে ওঠেন। ওখন অর্থের চোরাগলিতে নিভৃতে মুখ লুকায় ধর্মপ্রচারের মহান ব্রত। আল্টিমেটলি ব্যাপারটা পেশা হিসেবেই দাঁড়িয়ে যায়। আর মসজিদ-মাদ্রাসা-ধর্মসভার জন্যে চাঁদা আদায়কারীর মাথায় টপি, মুখে দাড়ি এবং ধর্মের বুলি থাকলেও এখান থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন ভোগ করাকেই তিনি জীবিকা নির্বাহের উপায় বা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটু চেপে ধরলেই তাঁরা সরল সত্যটুকু সহজেই কবুল করেন— তাঁদেরও ঘরসংসার আছে, পেটের দায় আছে। তা বটে। প্রাণী মাত্রেরই পেট আছে। পেটের চিন্তা আছে। নির্দিষ্ট পেশা থাকাটাও খুবই সঙ্গত ও প্রত্যাশিত। নানাভাবে ঘাটাঘাটি করতে করতে মানুষ একটা পেশাতে থিতু হয়ে দাঁড়াতে চায়। তাই বলে কি সাংবাদিকতাকেও পেশা বলতে হবে?

তা যদি বলতে হয় তাহলে এই পেশটির রূপরেখা, যোগ্যতা- ব্যর্থতা, বেতন ও সুযোগ সুবিধার সব দিক খোলাসা এবং স্বচ্ছ হওয়াও জরুরি। স্বাধীন সাংবাদিকতার নামে সাংবাদিকের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন কাম্য নয়, এ পেশায় যুক্ত সবার জন্য অনুসরণীয় ও পালনীয় নীতিমালার বাস্তবায়নে গড়িমসিও তেমনই কাম্য নয়। ওয়েজ বোর্ডের নীতিমালার কথা শোনা যায় বটে, তা কত দূর পর্যন্ত কার্যকর আছে, সেটা দেখভালের আদৌ কোনো কর্তৃপক্ষ আছে?

সাংবাদিকদের নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলা হয়। আদর্শের কথা শোনানো হয়। পেশা নয়, সাংবাদিকতাকে পবিত্র ব্রত বলে মহান করেও তোলা হয়। কিন্তু সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকেরা ঘরের খেয়ে আর কত বনের মোষ তাড়াবে, সে কথা স্পষ্ট করে কেউ বলে না। কথায় কথায় তাদের বিপথগামিতার কথাও কেউ কেউ বলেন। তারা কি ভেবে দেখেছেন- রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনাই কি তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে না? হলুদ সাংবাদিকতার কথাও ওঠে কখনো কখনো। কথিত এই হলুদ সাংবাদিকতা অবশ্যই নিন্দনীয়, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি-কেন এ পথে গেল একজন সাংবাদিক? অস্বচ্ছ রাজনীতির ঘোলাজলে পা ডুবিয়ে যারা কালো টাকার পাহাড় গড়েন এবং সেই কালো টাকা সাদা করার ফন্দি থেকে গড়ে তোলেন মিডিয়া হাউজ, তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় ও মদদে হলুদ সাংবাদিকতা প্রশ্রয় পায়; কই তাদের বেলায় তো এ সমাজ কোনো প্রশ্ন তোলে না। বরং চোখ বন্ধ রেখে প্রকারান্তরে তাদেরই সমর্থন জানায়। আর যত দোষ হয় সাংবাদিকের।

প্রশ্ন ওঠে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ভালো ঘটনা যেমন ঘটে, মন্দ ঘটনাও অনেক ঘটে চলেছে। একই ঘটনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে এক রকম পরিবেশন ঘটে, নেতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে হয় অন্যরকম। সুসংবাদ বা ভালো ঘটনা যতটা নিউজ ভ্যালু পায়, মন্দঘটনা বা দুঃসংবাদ তার চেয়ে বেশি কাভারেজ পায় সাংবাদিকতায়। এ সব ক্ষেত্রে এই যে অদৃশ্য পোষকতা তা-ই অনেক সময় সাংবাদিককে অনিরপেক্ষতার দিকে ঠেলে দেয়। গণবিচ্ছিন্ন অশুভ রাজনীতি আছে সব নষ্টের মূলে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান-সমূহকে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকতে দেয় না শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সরকারি অফিস-আদালত পর্যন্ত অনিরপেক্ষ করে তোলে যাঁরা, তারা তো সাংবাদিককেও যে-কোনো মূল্যে পেতে চায় তাদের পক্ষেই। বক্তৃতায় নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার বুলি আওড়ালেও বিবদমান তালগাছটি তারা পেতে চায় নিজেদের ভাগে এবং সাংবাদিকদেরও রাখতে চায় নিজেদের পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় এই অপশক্তির অক্টোপাসের মুখে দাঁড়িয়ে। বিশেষত মফস্বল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মেরুদন্ড শক্ত করে নিরপেক্ষ অবস্থানে দৃঢ় থাকা সত্যিই কঠিন।

তবে এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে অনেকেই পথ ভুলে চলে এসেছেন সাংবাদিকতার পবিত্র আঙিনায়। সাংবাদিক হয়ে ওঠার পূর্ব প্রস্তুতি যেমন নেই তাদের বুকের ভেতরে বড় কোনো অঙ্গীকারও নেই। ফলে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই আঙিনার পবিত্রতা নষ্ট করে চলেছে, নিজেদেরও নামিয়ে আনছে অসম্মানের শেষ স্তরে। আড়ালে আবডালে নয়, সাংবাদিক দেখে কেউ কেউ প্রকাশ্যেও ‘সাংঘাতিক’ বলে

পরিহাস করে এবং কী আশ্চর্য ঘটনা — এমন আপত্তিকর মন্তব্য বেশ হজমও করে মুখ বুজে। এদের দিকে আঙুল তুলে গোটা সাংবাদিক সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করার এই অশুভ প্রক্রিয়া রুখতে হলে অপ-সাংবাদিকদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে হবে শুভবোধসম্পন্ন দায়িত্বশীল সাংবাদিকদেরই। অপ্রিয় এই ক্ষেত্রেও দায় নিতে সাংবাদিকদের।

দীর্ঘকালের অপশাসন এ দেশের সাধারণ মানুষের মনে যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে তা খুবই ভয়াবহ। মানুষ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে নির্বাচনে মেতে ওঠে, তারপর অচিরেই টের পায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার কথা বলে না, তার ন্যায্য দাবির সঙ্গে সংহতি জানায় না।

সরকারি অফিস-আদালতের সব দুয়ারেও তার সমান অধিকার নেই। তাহলে সে দাঁড়াবে কোথায়, কোন ভরসায়? আশাহত এই সব মানুষের প্রাণের স্পন্দন তথা জীবনের ভাষা বুঝতে হবে সাংবাদিকদের। দাঁড়াতে হবে এই সব মানুষের পাশে। তাদের বুকে জাগাতে হবে ভরসা। ঋষিসুলভ উদাসীনতা বা তথাকথিত নিরপেক্ষতার মুখোশে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা নয়, এ দেশেরই সন্তান হিসেবে এক-পা এগিয়ে এসে গণমানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির কথা সর্বসমক্ষে প্রকাশের দায় কাঁধে নিতে হবে সাংবাদিকদের। এই পক্ষপাতিত্বের মধ্যেই নিহিত আছে পবিত্রতম নিরপেক্ষতা। চারণ সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ, জলধর সেন, একালের সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন, প্রবীর সাহা আমাদের সেই পথেরই সন্ধান দিয়েছেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক।