২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকালে দূর্বৃত্তদের হামলায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের সকল ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়। ঘটনার দেড় বছর অতিবাহিত হলেও ভাস্কর্যগুলো প্রতিস্থাপনে জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটি চাহিদা পাঠালেও এখনও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এ ঘটনার পর থেকে মুজিবনগরে পর্যটকরা এসে হতাশায় ভুগছেন।
ভাস্কর্যগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস তুলে ধরতো পর্যটকদের কাছে। ভাস্কর্যগুলো ভাংচুর হয়েছে শুনে রক্তক্ষরণ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের। তাঁরা এ দূর্বত্তায়ানের বিচার দাবি করেছেন। তবে এ ঘটনায় কোন মামলা হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট বিকাল থেকে রাত প্রায় ১০ টা পর্যন্ত দূর্বৃত্তরা দফায় দফায় এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।
ওই সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পর থেকে প্রায় দুই শতাধিক র্দর্বৃত্ত রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে ফেলে। একই সময়ে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে ‘১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে। আরও একটি দল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্থনের ভাস্কর্যগুলোতে আঘাত করে। তবে সেখানে খুব বেশি ভাঙচুর করতে পারেনি তারা। পরে কমপ্লেক্সের মধ্যে দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা সংবলিত ছোট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে আশপাশে ছুড়ে ফেলে। আরও একটি দল শহীদ স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকটি ভেঙে নিয়ে যায়।
ওই সময়ে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য সুমন আহমেদ বলেছিলেন, ‘তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা প্রথমে তাদের বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তারা ভাস্কর্যগুলো ভাঙতে শুরু করে। এসময় আমাদের এক সদস্য পড়ে গিয়ে আহত হন। একদল এসে কিছূ ভাস্কর্য ভেঙে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার আর একদল এসে স্মৃতি কমপ্লেক্সের মানচিত্র ও গ্যালারির সকল ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। দূর্বৃত্তরা সীমনা রেলিং, স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক, পানির পাম্পসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করেও নিয়ে গেছে।’
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে স্থাপিত আনসার ক্যাম্পের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যখন দুর্বৃত্তরা এখানে হামলা শুরু করে, তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুঠোফোনে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। তিনি কোনো নির্দেশনা দিতে পারেননি। এ কারণে আনসার সদস্যরা নিজেদের জীবন ও অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যারাকে অবস্থান নেন।’
সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ভিতরে প্রবেশ করে মনে হলো যেন এক বিরানভূমি। দর্শনার্থীদের পদভারে মুখরিত মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সটি আজ নির্বীকার হয়ে দাড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পর্যটন মোটেল, মসজিদ ও রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বাংলো। এগুলো ভাংচুর করা হয়নি। এগুলো পেরিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সের সামনে সারি সারি ভাস্কর্য। সেখানে সব ভাস্কর্য কমবেশি ভাঙচুর করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের ভাস্কর্যটিকে আঘাত করা হয়েছে। গার্ড অব অনারের ভাস্কর্যগুলোতে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো ভেঙে পড়ে আছে। চেনার উপায় নেই সেগুলো। বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপরে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধকালীন ১১টি সেক্টরের আদলে তৈরি ছোট ভাস্কর্যগুলো একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কমপ্লেক্সের পেছনে জয় বাংলা তোরণের ‘জয় বাংলা’ লেখাটি খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তবে অক্ষত রয়েছে মসজিদ, এতিমখানা, বাংলোগুলো।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের লক্ষ্যে নিরাপদ স্থান বিবেচনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা (বর্তমান মুজিবনগরে) সমবেত হন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তার পরে ওই স্থান নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।
ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। মুজিবনগরে তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রমের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এই অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়।
পরে ১৯৮৭ সালে মুজিবনগর আম্রকাননে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিসৌধের। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তি আওয়ামী লীগ সরকার মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সটিকে আন্তর্জাতিক মানের মুক্তিযুদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে ৪০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ স্বেচ্ছাশ্রমে দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন করে আসছেন সুভাস মল্লিক। তিনি বলেন, মুজিবনগরের সৌন্দর্য সব শেষ হয়ে গেছে। আর ভালো লাগছে না। পর্যটকরা এসে আর কী দেখবেন?
মুজিবনগরে বেড়াতে যাওয়া স্কুল শিক্ষক ইয়ামিন হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ইতিহাসের উপর আঘাত করা মোটেও কাম্য নয়। ইতিহাসের টানে বারবার মুজিবনগরে আসি। কিন্তু আগের সেই মুজিবনগর আর পাই না। বর্তমান সরকারের উচিত খুব্র দ্রুত সময়ের মধ্যে ইতিহাস রক্ষার প্রয়োজনেই মুজিবগর স্মৃতি কমপ্লেক্স পুনর্গঠণ করা।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক বলেন, ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমেপ্লেক্সের একেকটি ভাস্কর্য স¦াধীনতার প্রতীক। যারা এগুলো ভেঙেছে তারা গর্হিত কাজ করেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ ঘটনার শোনার পর থেকে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি করি সুষ্ঠ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এবং ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন করার দাবিও জানান তিনি।’
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা মুজিবনগরে পরিদর্শন করে একটি চাহিদা পাঠাতে বলেছিলেন। তারপরই আমরা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন, অবকাঠামো ও ইলেকট্রিক কাজগুলো মেরামত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন প্রতি উত্তর আসেনি।’
মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, ‘জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্যের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে আমি যোগদান করার আগেই। তবে এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোন নির্দেশনা আসেনি।’
মুজিবনগর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনায় থানায় কোন মামলা হয়নি।’