আলমডাঙ্গায় অবৈধ ডিজেল মজুদ, জেল-জরিমানা

আলমডাঙ্গার আসাননগর গ্রামে অবৈধভাবে ডিজেল মজুদ রাখার অভিযোগে শরিফুল ইসলাম (৫২) নামে এক ব্যক্তিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত এক অভিযানে এ দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুল্লাহ আল শামীম।

জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আলমডাঙ্গা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুজ্জামান শাহিন প্রথমে অনুসন্ধান চালান। পরে শরিফুল ইসলামের বাড়িতে ৩ ব্যারেল ডিজেল মজুদের তথ্য নিশ্চিত হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে আসাননগর গ্রামের আব্দুল জলিল শেখের ছেলে শরিফুল ইসলামের বাড়ি থেকে প্রায় ৬৪৫ লিটার, অর্থাৎ ৩ ব্যারেল ডিজেল জব্দ করা হয়। এ সময় জব্দকৃত তেলের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তেলের মূল্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন, ২০১৬-এর ১৬(৪) ধারা অনুযায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদের প্রমাণ পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তাকে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুল্লাহ আল শামীম বলেন, “গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে অবৈধভাবে ডিজেল মজুদের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে ভবিষ্যতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে।”




কোটচাঁদপুরে ট্র্যাক্টরের ধাক্কায় সাইকেল আরোহীর মৃত্যু

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে মাটি বোঝাই ট্র্যাক্টরের ধাক্কায় শাজাহান শেখ (৫৫) নামে এক সাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে কোটচাঁদপুর আমবাজার মোড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী চায়ের দোকানদার রাজিব হোসেন জানান, আমবাজার মোড়ে তার দোকানে বসে ছিলেন তিনি। রাত ৮টার দিকে হঠাৎ ট্র্যাক্টরের শব্দের সঙ্গে একটি জোরালো বিকট শব্দ শুনতে পান। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, সড়কের ওপর এক সাইকেল আরোহী পড়ে আছেন এবং ট্র্যাক্টরটি দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত ব্যক্তিকে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃতের ভাই মাহবুবুর রহমান জানান, দুই দিন আগে তার মেয়ের অপারেশন হয়েছিল কোটচাঁদপুরের একটি ক্লিনিকে। শুক্রবার রাতে তিনি মেয়ের জন্য ভাত নিয়ে ক্লিনিকে যাচ্ছিলেন। পথে আমবাজার মোড়ে পৌঁছালে একটি ট্র্যাক্টর তাকে ধাক্কা দেয়। শাজাহান শেখ একজন প্রবাসী ছিলেন এবং তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক।

ঘটনার পর ট্র্যাক্টর ও এর চালক পালিয়ে যায়।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদউজ্জামান জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।




কুষ্টিয়ায় দু’পক্ষের সংঘর্ষ: জামায়াত নেতাসহ ২১ জন আটক

কুষ্টিয়ার মিরপুরে শিশুদের খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে এক অভিভাবক গুরুতর আহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২১ জনকে আটক করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার আমলা ইউনিয়নের বুরাপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটককৃতরা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক বলে জানা গেছে।

এদিকে আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজন অভিযোগ করেন, নামাজের সময় তাদেরকে আটক করা হয়েছে এবং তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বুরাপাড়া গ্রামে দুই শিশুর মধ্যে খেলাধুলা নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে এক শিশুর অভিভাবক অপর পক্ষের কাছে জানতে চাইলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষরা ওই অভিভাবকের ওপর হামলা চালায়। এতে আক্তার হোসেন নামের একজন গুরুতর আহত হন। তার মাথার হাড় ভেঙে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

মিরপুর উপজেলা জামায়াতের আমির খন্দকার রেজাউল করিম বলেন, দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ এক পক্ষের মামলার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই গণহারে লোকজনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে একজন রোকন সদস্য রয়েছেন, বাকিরা কর্মী-সমর্থক।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে দুই শিশুর মারামারি থেকে ঘটনাটি বড় আকার ধারণ করে এবং গ্রামে দুই পক্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় একজন গুরুতর আহত হন। এক পক্ষ মামলা দায়ের করেছে, অপর পক্ষ এখনও মামলা দেয়নি।

যে পক্ষ মামলা দিয়েছে, সেই মামলায় ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




ঝিনাইদহে গ্রাম আদালত বিষয়ক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা জোরদারের লক্ষ্যে ঝিনাইদহে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়) প্রকল্পের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ রায়’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুবীর কুমার দাশ, স্থানীয় সরকারের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম, জেলা তথ্য অফিসার আব্দুর রউফ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুন্সী ফিরোজা সুলতানা, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিলকিস আফরোজসহ অন্যান্যরা।

এ সময় প্রকল্পের জেলা ম্যানেজার রহিদুল ইসলাম, উপজেলা সমš^য়কারী এবং প্রোগ্রাম ও ফিন্যান্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ঝিনাইদহ জেলার ৬৭টি ইউনিয়নে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত গ্রাম আদালতে মামলা গ্রহণ ও নিষ্পত্তির অগ্রগতি তুলে ধরা হয় এবং তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের আউটরিচ কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রাম আদালত বিষয়ক প্রচার-প্রচারণা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ লক্ষ্যে একটি সসমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন।




‘শৈলকুপায় বাকিতে চা’ না দেওয়ার দ্বন্দ্বে দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত

ঝিনাইদহের ‘শৈলকুপায় বাকিতে চা’ না দেওয়াকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন।  আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার পৌরসভার খালধারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানায়, ওই গ্রামের রিপন হোসেন সকালে গ্রামের শাহজাহানের দোকানে চা পান করতে যায়। পুর্বের বাকি থাকা টাকা না দেওয়ায় নতুন করে বাকিতে চা দিতে অস্বীকার করে দোকানী শাহজাহান। এ নিয়ে রিপন ও শাহজাহানের মধ্যে তর্ক-বির্তক ও হাতাহাতি হয়। এরই জের ধরে দুই পক্ষের লোকজন

দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। এতে আহত হয় অন্তত ১০ জন। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে ‘শলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক মাহবুব আলম পারভেজ বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় আহত রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

‘শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা বলেন, বাকি চা বিক্রি না করা নিয়ে একটি সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছে| এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।




মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা নিবেদন

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা। শুক্রবার সকাল ৯টায় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তারা।

এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক, মুক্তিযোদ্ধা হাজী আহসান আলী খান, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের মুজিবনগর উপজেলা সভাপতি মোখলেছুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলামসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক বলেন, ‘১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস কোনো রাজনৈতিক দিবস নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যে সরকারই আসুক না কেন, দিনটিকে সরকারিভাবে পালন করা উচিত। দিনটি উপলক্ষে সরকার কোনো কর্মসূচি রাখেনি। আমরা ব্যথিত হয়েছি।’

এ ছাড়া বিকেল ৩টায় ঢাকার নাগরিক সমাজ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকাননে শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। তার পর থেকেই দিনটি মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।তবে এ বছর সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।




ভৈরব তীরের বিস্মৃত শৌর্য ও আধুনিকতার জনপদ মেহেরপুর

“খনা-মিহিরের জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে মুজিবনগরের প্রথম সূর্যোদয়—ভৈরব তীরের এক অবিনশ্বর জনপদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সংগ্রামী ইতিহাসের প্রামাণ্য ইশতেহার।”

১. জনপদের প্রাচীনত্ব: ভৈরব ও মাথাভাঙ্গার আদি সাক্ষ্য

মেহেরপুর নামটির পেছনে যেমন সাধক মেহের আলী শাহর স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তেমনি এই জনপদকে ঘিরে আছে ভৈরব ও মাথাভাঙ্গা নদীর হাজার বছরের ইতিহাস। এক সময় এই নদীগুলোই ছিল বাংলার বাণিজ্যের ধমনী। আমরা কি জানি, আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে মেহেরপুর ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র? বিশেষ করে নীল চাষের আগে এখানে দেশি তাঁতশিল্প এবং কৃষিপণ্যের যে প্রাচুর্য ছিল, তা পুরো মহকুমার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত।

২. আমঝুপির নীলকুঠি: শোষণের বিরুদ্ধে নীরব দ্রোহ

মেহেরপুরের ইতিহাসে নীলকুঠি এক বেদনার নাম। আমঝুপির নীলকুঠি কেবল সাহেবদের বিলাসের আস্তানা ছিল না, এটি ছিল মেহেরপুরের কৃষকদের ওপর ব্রিটিশ শোষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হলো—এই মেহেরপুরের মাটি থেকেই নীল চাষের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল। এখানকার কৃষকরা কেবল লাঙল ধরতে জানত না, তারা অধিকার আদায়ের জন্য ব্রিটিশ বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেও জানত। মেহেরপুরের নীল বিদ্রোহের সেই ঝোড়ো হাওয়া পরবর্তীতে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

৩. খনা ও মিহিরের বসতভিটা: জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূতিকাগার

মেহেরপুরের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গাটি আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। লোকঐতিহ্য ও ইতিহাসবিদদের মতে, কিংবদন্তি জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির এবং তার পুত্রবধূ খনার বসতি ছিল মেহেরপুরের ভৈরব তীরের ‘চন্দ্রভাগ’ গ্রামে। খনার বচন আজও আমাদের কৃষি সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। একটি জনপদ কতটা মেধাবী হলে সেখানে শত শত বছর আগে নক্ষত্রের গতিবিধি আর আবহাওয়ার নিখুঁত হিসাব কষা হতো, তা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। মেহেরপুর কেবল রাজনীতির নয়, এটি ছিল এই উপমহাদেশের আদি বিজ্ঞানচর্চার এক নীরব সাক্ষী।

৪. মেহেরপুরের আধ্যাত্মিক সুবাস: পীর ও বাউলের মিলনস্থল

আধ্যাত্মিকতায় মেহেরপুর সবসময়ই উদার। সাধক মেহের আলী শাহর নামানুসারে এই শহরের নামকরণ যেমন এর সুফিবাদী ঐতিহ্যকে জানান দেয়, তেমনি মেহেরপুরের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে আছে নাম না জানা অসংখ্য বাউল ও ফকিরদের গান। এখানকার মানুষের রক্তে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িকতার বীজ। মেহেরপুরের সেই বাউল গানগুলো কেবল সুর নয়, ছিল জীবনের গভীর দর্শন।

মেহেরপুরের দ্রোহ ও জাগরণের ইতিকথা

৫. ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন: মেহেরপুরের তপ্ত রাজপথ

মেহেরপুর কেবল শান্ত সুফিবাদী জনপদ ছিল না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক আগ্নেয়গিরি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মেহেরপুরের সন্তানদের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকা উচিত। বিশেষ করে স্বদেশী আন্দোলনের সময় মেহেরপুরের যুবকরা যেভাবে বিলিতি পণ্য বর্জন করেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। আমরা কি জানি, বিপ্লবি বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের এক গোপন আস্তানা ছিল মেহেরপুরের এই নিভৃত পল্লীগুলোতে? মেহেরপুরের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছিল। এই মাটির মানুষের ধমনিতে বইছে সেই দ্রোহের রক্ত, যা কোনোদিন মাথা নত করতে শেখেনি।

৬. শিক্ষা বিস্তারের কারিগর: মেহেরপুর হাই স্কুলের ঐতিহ্য

একটি জাতির মেরুদণ্ড যে শিক্ষা, তা মেহেরপুরের মানুষ বুঝেছিল অনেক আগে। ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মেহেরপুর মডেল হাই স্কুল (বর্তমানে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল এই অঞ্চলের আধুনিকতার প্রবেশদ্বার। যখন সারা বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার বিরুদ্ধে গোঁড়ামি ছিল, তখন মেহেরপুরের বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে এই স্কুলটি দাঁড় করিয়েছিলেন। এই স্কুলের বারান্দা দিয়ে হেঁটে গেছেন এমন অনেক কৃতি সন্তান, যারা পরবর্তীতে সারা ভারতে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। মেহেরপুর কেবল কৃষির ওপর নির্ভর করেনি, তারা কলমকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছিল।

৭. নীল বিদ্রোহের বীরগাঁথা: আমঝুপির রক্তরাঙা ইতিহাস

আমরা নীলকুঠির সাহেবদের অত্যাচারের কথা শুনি, কিন্তু মেহেরপুরের সেই বীর চাষিদের নাম জানি না যারা নীল চাষ করতে অস্বীকার করে কারাবরণ করেছিলেন। আমঝুপির নীলকুঠি ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের দুর্গ। কিন্তু মেহেরপুরের সাহসী কৃষকরা যখন জোটবদ্ধ হয়ে নীল বুনা বন্ধ করে দিল, তখন লন্ডনের পার্লামেন্ট পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। সেই বিদ্রোহের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী জমিদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ যেভাবে একতাবদ্ধ হয়েছিল, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক বড় শিক্ষা। মেহেরপুর শিখিয়েছে—একতাই হলো শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

৮. ভাষা আন্দোলন ও মেহেরপুরের চেতনা

১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনেও মেহেরপুর পিছিয়ে ছিল না। ঢাকার রাজপথে যখন সালাম-বরকতরা রক্ত দিচ্ছিলেন, মেহেরপুরের ছাত্রসমাজ তখন ভৈরব তীরের রাজপথে মিছিল বের করেছিল। পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মেহেরপুরের অলিগলিতে তখন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল—’রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মেহেরপুরের মানুষের মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছিল, যা ১৯৭১ সালে মুজিবনগরের আম্রকাননে এসে পূর্ণতা পায়।

মেহেরপুর—স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সূর্যালোক

৯. মুজিবনগর: আম্রকাননের সেই অবিনশ্বর শপথ

মেহেরপুরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুকুট হলো মুজিবনগর। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল বিশ্বমানচিত্রে একটি নতুন জাতিসত্তার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ। মেহেরপুরের সেই ধূলিকণা ধন্য হয়েছিল জাতীয় চার নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পদভারে। মেহেরপুরের সাধারণ মানুষ সেদিন যে আতিথেয়তা এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেহেরপুর কেবল একটি জেলা নয়, এটি হলো বাঙালির সার্বভৌমত্বের প্রথম ঠিকানা।

১০. ভৈরব তীরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

মেহেরপুরের মাটি কেবল ফসল ফলায় না, এটি ফলায় কবিতা, গান আর সংস্কৃতি। মেহেরপুর পাবলিক লাইব্রেরি থেকে শুরু করে টাউন হলের সেই পুরনো আড্ডাগুলো সাক্ষী দিচ্ছে যে, এখানকার মানুষ কতটা জ্ঞানপিপাসু। স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে মেহেরপুরের শান্ত নিসর্গ আর মানুষের সহজ-সরল জীবনবোধ। মেহেরপুরের বাউল মেলা আর লোকজ উৎসবগুলো আজও প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের এই মাটির সহজাত বৈশিষ্ট্য।

১১. আগামীর মেহেরপুর: ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিকতা

আজকের মেহেরপুর উন্নয়নের মহাসড়কে পা রেখেছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে কেবল বহুতল ভবন বা প্রশস্ত রাস্তা নয়; উন্নয়ন মানে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে লালন করা। আমঝুপির নীলকুঠি থেকে মুজিবনগরের স্মৃতিসৌধ—সবই আমাদের প্রেরণার উৎস। মেহেরপুর প্রতিদিন-এর এই বিশেষ সংখ্যায় আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, আমরা আমাদের উত্তরসূরিদের কাছে এই বীরত্বগাঁথা পৌঁছে দেব। আমরা যেন ভুলে না যাই, আমরা খনা-মিহিরের উত্তরসূরি, আমরা নীল বিদ্রোহের উত্তরসূরি, আর আমরাই হলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সূর্যোদয়ের সাক্ষী।

উপসংহার: শেকড়ের টানে মেহেরপুর

মেহেরপুর একটি অনুভূতির নাম। ভৈরব নদীর শান্ত স্রোত যেমন তার দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী, তেমনি এখানকার মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি তার আগামীর দিশারি। ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’ তার লেখনীর মাধ্যমে এই জনপদের সুখ-দুঃখ আর ইতিহাসের মশাল জ্বালিয়ে রাখুক—প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই আমার প্রত্যাশা। মেহেরপুরের প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বীরত্ব ও মেধার গল্প; সেই গল্পগুলো যেন কোনোদিন ধুলোয় হারিয়ে না যায়।




মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের শ্রদ্ধা নিবেদন

আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকাননে শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম  সরকার। তারপর থেকেই দিনটি মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

তবে এ বছর সরকারীভাবে কোন কর্মসূচী নেওয়া হয়নি। তবে, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

আজ শুক্রবার সকাল ৯ টার সময় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে জাতীর শ্রেষ্ট সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক, মুক্তিযোদ্ধা হাজী আহসান আলী খাঁন, মুক্তিযোদ্দা সন্তান সংসদ কমান্ডের মুজিবনগর উপজেলো সভাপতি মোখলেছুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম সহ অন্যান্য সদস্যরাউপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা (অব.) ক্যাপ্টেন আব্দুল মালেক বলেন, ‘১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস কোন রাজনৈতিক দিবস নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যে সরকারই আসুক না কেন এদিনটি সরকারি ভাবে পালন করা উচিৎ। যদিও আজ দিনটি সরকারি পালন হচ্ছে না। আমরা ব্যথিত হয়েছি।’
 এদিকে, বিকাল ৩ টার দিকে ঢাকা থেকে আগত নাগরিক সমাজ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা রয়েছে।



বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষি ওরা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ খ্রিস্টান পল্লী মেহেরপুরের মুজিবনগর।  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর-এর আম্রকাননে শুধু একটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়নি; সেখানে ইতিহাস গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত, নিঃশব্দ শ্রম আর সাধারণ মানুষের অসাধারণ অংশগ্রহণে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ একটি দিন, একটি দৃশ্য, একটি নিঃশব্দ প্রত্যয়ের নাম। মুজিবনগর-এর সেই বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন আজও যেন বাতাসে বহন করে সেই গোপন প্রস্তুতির গন্ধ, গ্রামবাসীর নিঃশব্দ সাহসের প্রতিধ্বনি। সকালের রোদ তখন নরম। আমগাছের ছায়া মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। ১৩ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকানন-এ দাঁড়িয়ে মনে হলো এই নীরবতা কখনোই নিছক নীরব ছিল না। ১৯৭১-এর সেই দিনটিতে, এই মাটিই ছিল উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্র। 

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পপথ গ্রহণ করেন। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিলুপ্তি হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (বর্তমানে মুজিবনগর) গ্রামের সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশ না নিলেও, তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সরকার গঠন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হতে পারতো না। তাদের ভূমিকা ছিল সমর্থন, সহানুভূতি, নিরাপত্তা, এবং সরবরাহ সংক্রান্ত সহায়তায়।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য যেকোনো ধরনের প্রস্তুতির জন্য গ্রামবাসীরা সহায়তা করেছিলেন। যেমন- মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের জন্য স্থান তৈরি, খাবার এবং পানীয় সরবরাহ, অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। তারা এই কাজগুলো নিজেরাই করেছিলেন।

সূর্য সেদিন ছিল নির্মম। বৈশাখের খরতাপ যেন মাটিকেও দগ্ধ করছিল। সূর্যও যেখানে মুজিবনগর আম্রকাননকে কুর্ণিশ করে। সেই মুজিবনগর আম্রকানন-এর গাছের ছায়াও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই তাপদাহ উপেক্ষা করেই ইতিহাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। সেদিন মেহেরপুরের ১২ জন আনসার সদস্য। সাধারণ পোশাকে, কিন্তু চোখে কঠোর দৃঢ়তা। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার-কে।

দেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেনÑ আমাদের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বড় ভূমিকা ছিল। ১৬ এপ্রিল জাতীয় নেতারাসহ ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন    মুজিবনগরে এসে স্থান নির্ধারণ করে যান। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সফল করার দায়িত্ব ছিল বিএসএফের। ১৭ এপ্রিল কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের একত্রিত করে বিশাল গাড়ী বহর নিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সবাই মুজিবনগরে হাজির হয়েছিল। সেদিন মুজিবনগরের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতনা।

সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দোয়াজ আলী বয়সের ভারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। স্মৃতি হাতড়ে জানান- সেদিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার, নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মূখার্জি এবং বিএসএফের ৭৬ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে: কর্ণেল চক্রবর্তী দুজনে সাদা পোশাক পরে আসেন। আমি সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জেনে মুজিবনগর আমবাগানের একটি স্থানকে চিহ্নিত করে একটি তোরণসহ মঞ্চের চর্তুরদিক বাঁশ দিয়ে ঘেরার নির্দেশ দিয়ে ফিরে গেলেন। তখনও জানিনা তারা এখানে কিসের অনুষ্ঠান করবে। নির্দেশমত এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে চৌকি, কাপড়, দড়ি, ঝাঁড় থেকে বাঁশ এবং দেবদারুর পাতা এনে স্থানীয়দের সহায়তায় তৈরী করা হয় তোরণ ও বড় মঞ্চ। সারারাত ধরে এই কাজ করা হয়। খুব সকালে তারা এখানে আসলে দেখেন ভারতীয় হেলিকপ্টার আকাশে মহড়া দিচ্ছে। এরপরপরই মুজিবনগর সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে অসংখ্য জীপ ও ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। এই সমস্ত গাড়ি করে জাতীয় নেতারাসহ বিদেশী সাংবাদিক ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা আসেন। বিএসএফ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অনুষ্ঠানের জন্য চেয়ার, মাইক, টেবিল সবই আসে ভারত থেকে। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাধারণ জনতাকে যে মিষ্টি ও পাউরুটি দেয়া হয়েছিল সেটাও এসেছিল ভারত থেকে।  

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় খ্রিস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পাঠ করা হয় ধর্মগ্রন্থ। ইতিহাসের সূত্রে জানা যায়, এক হিন্দু ভদ্রলোক গীতা পাঠ করেন- যা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের এক প্রতীকী ঘোষণা। এরপর বাজে জাতীয় সঙ্গীত- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। কণ্ঠে হয়তো ছিল কম্পন, কিন্তু সেই সুরে ছিল স্বাধীনতার দৃঢ় অঙ্গীকার। সেদিন গানটা ছিল বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা।

মুজিবনগরের দারিয়াপুর ডিগ্রী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত  সহকারী অধ্যাপক বাকের আলী সেই শপথ অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলোয়াত করেছিলেন। তিনি জানান, সেদিন খুব সকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে উপস্থিত হন। তিনি তাদের চিনতেন না। স্থানীয় নেতাদের সাথে তিনি জাতীয় নেতাদের সন্মুখে গেলে অনুষ্টানে তাকে কোরআন তেলোয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ তার নাম লিখে নিলেন এবং রিহার্সালের সময় তেলোয়াত শুনলেন। মাত্র ৩০ মিনিট অনুষ্ঠানটির স্থায়ীত্ব থাকলেও উপস্থিত সকলের মধ্যে ছিল স্বাধীনতার উম্মাদনা ও জীবনবাজির শপথ। 

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সামরিক কায়দায় সালাম দিয়েছিলেন মেহেরপুরের ১২জন আনসার সদস্য। ইতোমধ্যে ১০ জন মারা গেছে। বেঁচে আছেন দুইজন। এদেরই একজন বয়োবৃদ্ধ মো. সিরাজ উদ্দীন। প্রতিদিন তিনি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে আসেন। তিনি বলেন- সেদিন আমাদের ডাক পড়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে রাস্ট্রিয় মর্যাদায় সালাম জানানোর। আমরা গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম ১২ জন আনসার। ওইদিনই  ট্রেনিং দিয়েছিলেন তৎকালীন ঝিনাইদহের সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা গার্ড অব অনার দিই সরকারকে। আর এক আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন বলেন- তখন আনন্দ ভয় উত্তেজনা কাজ করছিলো। দেশি বিদেশী সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষের সামনে প্রথম সারকারকে সালাম জানানোর সময় মনে যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম তা বলে বোঝানো যাবেনা। পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। 

প্রত্যক্ষদর্শীর সুভাষ মল্লিকের ভাষায়- ওদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না, কিন্তু যে ভঙ্গিতে সালাম দিল- মনে হচ্ছিল এটাই স্বাধীন দেশের প্রথম সেনাবাহিনী। সেই অভিবাদন ছিল প্রতীকী, কিন্তু তা-ই হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সূচনালগ্নের প্রতিচ্ছবি।

মুজিবনগর স্মৃতিপ্রকল্প এলাকায় দেখা মেলে প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী  আহম্মদ খাঁ (৭১) রিক্সা ভ্যানে করে শষা ফেরি করছেন। তিনি বলেন- সে বছরই আমার বিয়ে হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানের দিন হঠাৎ করেই হাজার মানুষ জড়ো হলো মুজিবনগরের এই আমবাগানে। তখন বাগানটি ভাগাড় হিসেবে গ্রামের মানুষ ব্যবহার করতো। সেদিন আমিসহ একদল যুবক বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুড়ি সংগ্রহ করে মানুষকে খেতে দিই। আশপাশের বাড়ি থেকে বউ ঝিরা পানি এনে মানুষের পিপাসা মিটায়। সেদিন সেই সরকারের পরিচালনায় দেশ স্বাধীন হয়। এখন আমি গর্বভরে বলি আমিও স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সাক্ষি।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণা রোকসানা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেনÑ তখন আমি গৃহবধু এই বাড়ির। বৈশাখের দাবদাহে সবচেয়ে বড় দরকার  ছিল পানি। চারপাশে তখন নিরাপত্তার ঝুঁকি, খোলা চলাফেরা কঠিন। গ্রামের কিশোর কিশোরিরা কলস কাঁখে নিয়ে কূপ থেকে পানি এনে দিচ্ছিল। আমরা আগে নিজেরা খাইনি, আগে তাদের পানি দিয়েছি। তখন মনে হচ্ছিলÑ ওরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। ওরা যখন আমাদের দেয়া মুড়ি, রুটি আর পানি খাচ্ছিল,  দেখে মনে হচ্ছিল, নিজের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি।

সেদিন চারপাশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামের তরুণরা। কেউ গাছে উঠে, কেউ দূরের পথের দিকে তাকিয়েÑ যদি পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়। একটি সংকেত ঠিক করা ছিলÑ কিছু হলে দ্রুত খবর পৌঁছে যাবে। আমরা ছিলাম চোখ, যাতে অনুষ্ঠানটা চোখের আড়ালেই থেকে যায় শত্রুর। বললেন স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম।  সব কিছু শেষ হওয়ার পরও কোনো উল্লাস ছিল না। ছিল নিঃশব্দ স্বস্তি।

কারণ সবাই জানত- এটা শেষ নয়, শুরু।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুল হক মন্টু বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে ভাষ্কর্যের মাধ্যমে। ৫ আগস্ট পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি পক্ষ সেসব ভাষ্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছে। সেগুলি শুধু পাথর বা কংক্রিটের ছিল না। সেখানে ছিল আমাদের ইতিহাস, আমাদের পরিচয়। ওগুলো ছিল আমার বাবার মতো হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের দৃশ্যমান সাক্ষী। প্রতিমাসের একটি শুক্রবার আমি আমার সন্তানকে নিয়ে মুজিবনগর আসি। ছেলেকে দেখিয়ে বলতাম- দেখ- তোমার দাদুদের গল্প এখানে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমি তাকে কী দেখাবো?

ভবেরপাড়া গ্রামের প্রবীণ  সুভাষ মল্লিক, বয়স এখন আশির কোঠায়। ৭১-এ ভবেরপাড়া মিশনের ফাদার ছিলেন।  তিনি বলেনÑ আমরা তখন বুঝিনি এত বড় কিছু হতে যাচ্ছে। শুধু জানতাম, কিছু বড় মানুষ আসবে, দেশ বাঁচানোর কথা বলবে। ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল আশা। শপথগ্রহণের পর শুধু অনুষ্ঠান শেষ হয়নিÑ শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। গ্রামের অনেকেই সরাসরি যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধে। কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ খাবার, কেউ তথ্য। আমরা বন্দুক ধরিনি সবাই, কিন্তু যারা ধরেছে, তাদের পেছনে আমরা ছিলাম।

মুজিবনগর সরকার-এর শপথ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের সংগঠিত রূপ, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। একটি গ্রামের অমরত্ব

আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু সেই ১২ আনসারের সালাম, গীতা পাঠের মৃদু উচ্চারণ, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক কলস পানি- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। এই ইতিহাস শুধু বড় নেতাদের নয়- এটি সেই নামহীন মানুষের, যারা নিজেদের আড়ালেই রেখে একটি দেশকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল। 

আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু এই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিস্ফোরণ স্বপ্নের, সাহসের, আত্মত্যাগের। এই গ্রামবাসীরা ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়াননি, কিন্তু ইতিহাসকে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের নাম হয়তো বইয়ে নেই, কিন্তু তাদের অবদান ছাড়া ১৭ এপ্রিলের সেই শপথ শুধুই একটি অসম্পূর্ণ আয়োজন হয়ে থাকত। মুজিবনগরের বাতাস আজও যেন বলেÑ আমরা ছিলাম, আছি, থাকবÑ বাংলার স্বাধীনতার নীরব প্রহরী হয়ে। আর

মুজিবনগরের মাটি বলে- স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, অসংখ্য ছোট ছোট ত্যাগের সমষ্টি।




মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে তিন শতাধিক ভাস্কর্যে ক্ষত

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণের স্থান মেহেরপুরের মুজিবনগরে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স’ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন এই কমপ্লেক্সের তিন শতাধিক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দফায় দফায় ভাঙচুর চলে। এরপর প্রায় ২০ মাস ভাঙচুর অবস্থায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ত্রিমাত্রিক শিল্পরূপগুলো।

এগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।দুই যুগেরও আগে ৭২ একর জমি অধিগ্রহণ করে ১১টি মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণের কাজ। এই প্রকল্পের মধ্যে ছিল পর্যটক মোটেল, শপিং মল, শিশুপরিবার, ডাকঘর, হেলিপ্যাড, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ছয় দফাভিত্তিক মনোরম গোলাপবাগান, অত্যাধুনিক মসজিদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র ও জাদুঘর।
এখন পর্যন্ত এসব কোনো স্থাপনাই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। প্রকল্পের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ধাপের কাজ শেষ হয় অন্তত ১০ বছর আগে। সর্বশেষ সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে বড় মিলনায়তন নির্মাণের কাজ শেষ হয়।

তবে এখনো প্রশাসনিক প্লাজা, অ্যাপ্রোচ রোড, জেনারেটর ক্রয় (১০০-কেভিএ), মানচিত্রের স্টেজে কাঠের কাজ, সিঁড়িতে এসএস রেলিং, জলছাদ, র‌্যাম্প ও এসপিএমসিবি পাওয়ার সকেট, আন্ডারগ্রাউন্ড সার্ভিস লাইনের কাজ শেষ হয়নি।

নির্মিত বেশ কিছু স্থাপনায় ইতিহাস বিকৃত করারও অভিযোগ ওঠে। ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধে সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশ মানচিত্র নির্মাণকাজ শেষ হয়ে ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। মানচিত্রে মুজিবনগরের শপথ নেওয়ার কোনো চিত্র স্থান পায়নি। গার্ড অব অনারের ভাস্কর্যে ১২ জন আনসার সদস্যের বিপরীতে দেখানো হয় আটজনকে। সেক্টরভিত্তিক কমান্ডারদের ভাস্কর্যও রাখা হয়নি।
প্রথম দিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ভাস্কর্য স্থান পেলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পর সেই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়, যা নিয়ে বিএনপি সে সময় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।

মানচিত্রের বাইরে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ভাস্কর্যসহ অন্যান্য ভাস্কর্যগুলো এতটাই নিম্নমানের ছিল, যা মাঝেমধ্যেই ভেঙে পড়ত। অনেকটির ভেতরে রডের বদলে চিকন তার ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে শিলাবৃষ্টি বা ঝড় হলে সেগুলো প্রায়ই ভেঙে যেত। কয়েক দফা সেগুলো ফের মেরামতও করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণের স্থান, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাসমৃদ্ধ তথ্য ও নিদর্শন দেশবাসী ও তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং বিদেশিদের কাছে মূর্ত করে তুলতে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে এই স্মৃতিকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে কাজ শুরু করে মাঝে প্রকল্পটি কাটাছেঁড়া করা হয়। বেশির ভাগ কাজ শেষ হয় ২০১১ সালে। প্রকল্পের কিছু কাজ অসমাপ্ত থাকা অবস্থাতেই ভাস্কর্যগুলো স্বাধীনতাবিরোধী দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলে।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শিল্পী রানী রায় বলেন, মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য প্রতিস্থাপনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, তার কোনো প্রতিউত্তর এখনো আসেনি।

নতুন আরো একটি প্রকল্প :

২০২১ সালের ২০মে নতুন করে ৪০৯ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন সরকার। যে প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্কাল্পচার গার্ডেন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার মেমোরিয়াল মুর‌্যাল, তিনতলা বিশিষ্ট অ্যাডমিন ব্লক, দুইতলা বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ব্লক, চারতলা বিশিষ্ট ট্রেনিং সেন্টার, চারতলা বিশিষ্ট অফিসার্স ও স্টাফ কোয়ার্টার, সুইমিং পুল, ফুড জিয়স্ক ও রেস্টরুম, রেন্টাল শপ, ওয়াচ টাওয়ার, ভিভিআইপি ও ভিআইপি পার্কিং, সাধারণ পার্কিং, মাছ ধরার ডেক, রোপওয়ে, দুইতলা বিশিষ্ট বোট ক্লাব, সুপেয় পানির ডিসপেনসার, ব্যাংক প্রটেকশনসহ লেক, ব্রিজ, কনটোর্স, আইল্যান্ড, ওয়াচওয়ে, চালকদের আবাসন, শিশু পরিবার ও ডরমিটরি, দুইতলা বিশিষ্ট স্কুল, টেনিস কাম বাস্কেটবল কোর্ট, প্লেগ্রাউন্ড, লেজার শো ও ওয়াটার শিল্ডসহ আরো কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন ৫৬.০৫ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রটির আয়তন ১২৭ একরে রূপ নেওয়ার কথা। জমি অধিগ্রহণসহ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ ধরা হয় প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। প্রয়োজনে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধিরও কথা ছিল।

আমবাগান পরিচর্যার জন্য অপেক্ষা :

মুজিবনগরের ঐতিহাসিক আম্রকাননে বর্তমানে এক হাজার ১০০টি গাছ বেঁচে রয়েছে। পরিচর্যার অভাবে এরই মধ্যে শতাধিক গাছ মারা যাওয়ায় বাগানটি ক্রমেই শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। জীবিত গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য মেহেরপুর হর্টিকালচার সেন্টার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। দ্রুত গাছ বাঁচানোর প্রকল্পের বরাদ্দ ছাড় হলে কাজ শুরু করা হবে বলে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে।

স্বাধীনতা সড়ক :

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের কলকাতা থেকে যে মেঠোপথ ধরে জাতীয় চার নেতাসহ দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা এসেছিলেন সেই পথটিকে স্বাধীনতার অর্ধশত বছর উদযাপন উপলক্ষে ‘স্বাধীনতা সড়ক’ নাম দেওয়া হয়। মেঠোপথটির বাংলাদেশের অংশ ৫০০ মিটার সড়ক এক কোটি চার লাখ টাকা ব্যয়ে এরই মধ্যে পাকাও করা হয়। ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে এই সড়কের উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা হয় এই সীমান্তপথে দুই দেশের মধ্যে চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি স্থলবন্দর নির্মাণ হবে। এর সরকারি গেজেটও প্রকাশ হয়। কিন্তু এই কাজের আর কোনো অগ্রগতি নেই।