মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ দিতে জাল করা হয়েছে শিক্ষা অধিদফতরের ডিজির প্রতিনিধি, স্কুল কমিটির সভাপতি ও সদস্যের স্বাক্ষর। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে এ উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমন অন্তত ৬৯ ভুয়া শিক্ষকের সন্ধান মিলেছে।
তবে, এ সকল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তৎকালীন জনপ্রতিনিধিদের চাপ ও প্রভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি হয়েছে।
জানা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন আহ্বানের পর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। এটিই স্বাভাবিক নিয়ম হলেও মেহেরপুরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে হয়েছে ব্যতিক্রম। জেলার গাংনী উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে অন্তত ৬৯ জন ভুয়া শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে জেটিএস মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, গাড়াবাড়িয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কে এ বি মাধ্যমিক বিদ্যালয় , এইচ এম এইচভি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, হাড়াভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এম জি জি এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সাহেবনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এনপি মাধ্যমিক বিদ্যালয় , বি বি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাজীপুর মাথাভাঙা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় , করমদি কল্যাণপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, এমবিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় মানিকদিয়া, এইচ বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাড়াভাঙ্গা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
তাদের অনেকের বেতন চালু হলেও যশোর শিক্ষা বোর্ডে সংশ্লিষ্ট শাখার অনুমতি সম্বলিত কোনো চিঠির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে মোটা অংকের অর্থ লেন দেনেরও অভিযোগ উঠেছে।
জেটিএস মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলালুজ্জামান হেলু বলেন, আমি বিএনপি করার কারণে বিগত সরকারের সময় ঠিকমত স্কুলেই আসতে পারিনি। আমার অজান্তেই অনেক কিছু হয়ে গেছে।
২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাক ডেটেড চার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। এই চারজনের সার্টিফিকেট যাচাই করে দেখা যায়, তাদের কাগজপত্র জাল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা স্কুল পর্যন্ত আসে; তাদের ভয়ে সবকিছু ছেড়ে দিতে হয়।
তবে এইচ এম এইচ ভি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, তৎকালীন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা যেভাবে চেয়েছেন নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সেভাবে করতে হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকরা নিয়োগের বিষয়ে সব অস্বীকার করছেন। তাদের দাবি, আমরা পরীক্ষা দিয়েছি, রেজাল্ট হয়েছে; এরপর আমরা নিয়োগপত্র পেয়েছি। তারপর যোগদান করেছি। বিষয়টা তো আদৌই সত্য না।
এ দিকে, বিষয়টি জানাজানি হলে একাধিক তদন্ত কমিটি করে মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ। তনন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশনও। এরইমধ্যে অনেক প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে।
কুষ্টিয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক বুলবুল আহম্মেদ রিয়াদ বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করবো। এরপর বিস্তারিত কাগজপত্র আমরা কমিশনে দাখিল করবো।’
একটি তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মেহেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. একেএম নজরুল কবীর বলেন, ‘বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। আমরা বিষয়টি আরও তদন্ত করছি।’
এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রাহিম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিগুলোকে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। আমরা আশা করছি, অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে এর সুরাহা করতে পারবো।’
মেহেরপুরের তিন উপজেলায় ১৭৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৫ হাজার ৫৬৯ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।