সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হলো এমন একটি নিরাপদ বেড়াজাল যার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন কর্মসূচি এবং আইনগত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে পরস্পর সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির একটি সুষম পরিবেশ তৈরি করে।
এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুর্যোগের ফলে মানুষের মধ্যে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা, মনুষ্যসৃষ্ট বৈষম্যগত দারিদ্র্যমোচন, বিভিন্ন আইনি সহায়তা এবং অসুস্থতা, বেকারত্ব, শিল্পদুর্ঘটনা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও এর প্রেক্ষাপট অতি পুরোনো। সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য কার্যক্রম হলেও প্রাচীনকালেও এর প্রচলন ছিল। বর্তমানের মতো এ কর্মসূচি সুসংগঠিত না হলেও দানশীলতা, মানবতাবোধ ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এরকম কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যেত। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন, ভারতে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এই কর্মসূচির একটি উদাহরণ হলো বাংলাদেশের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (NSSS)।
এর লক্ষ্য হলো, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সহায়তা প্রদান করে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা; আয়-রোজগার কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে বা জরুরি প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা প্রদান; সমাজের সকল স্তরের বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে সামগ্রিক মানব উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে সকল কর্মসূচি আছে তার মধ্যে বয়স্ক ভাতা: বয়স্ক নাগরিকদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান; বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা ভাতা: অসহায় নারী সদস্যদের আর্থিক সহায়তা; প্রতিবন্ধী ভাতা ও উপবৃত্তি: প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা; মুক্তিযোদ্ধা ভাতা: মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও আর্থিক সহায়তা প্রদান; ভিজিডি (VGD) ও ভিজিএফ (VGF): খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য।
অনুন্নত, স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই যথাযথভাবে পূরণ করতে পারে না। দুর্নীতির কারণে সম্পদ একটি বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জিভূত হয়। ফলে ধনী-গরিবের ব্যবধান দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে, গরিব ক্রমান্বয়ে গরিব হয় আর বিশেষ শ্রেণি ফুলে-ফেঁপে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হওয়ার দিকে যায়। তাছাড়া সমাজের অসহায় শ্রেণি তথা পঙ্গু, অনাথ, বৃদ্ধদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না। এই অসহায় শ্রেণির জন্যই প্রধানত রাষ্ট্র নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকারও অসহায়-পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে।
সরকারের কাবিখা, কাবিটার মত কর্মসূচিগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে অভাবী মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে কার্যকরভাবে কাজ করছে। অতীব জরুরি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাও প্রদান করছে সরকার। সরকার সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে এর পরিধি বাড়িয়ে চলেছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষাখাতে ব্যয় বাবদ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আড়াই শতাংশ ও জাতীয় বাজেটের ১৭ শতাংশ হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পেনশন ও ভর্তুকি কর্মসূচিগুলো যখন বাদ দেওয়া হয়, তখন বরাদ্দটি জিডিপির মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশ ও বাজেটের সাত শতাংশে নেমে আসে।
বর্তমানে ২৬টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪০টি কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রায় ১০ লাখ উপকারভোগী। কয়েকটি কর্মসূচিতে ভাতা বাড়ানো হয়েছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের চারটি ও খাদ্য অধিদপ্তরের একটি কর্মসূচিতে অন্তত ১০ লাখ উপকারভোগী বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সূত্রটি জানায়, গত অর্থবছরের প্রতি মাসে ৬০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পেতেন ৬০ লাখ উপকারভোগী। বর্তমান অর্থবছরের ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬১ লাখ করা হয়েছে। প্রতিমাসে জনপ্রতি ভাতার পরিমাণ করা হয়েছে ৬৫০ টাকা। এ ছাড়া বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৭ লাখ ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৯ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। মাথাপিছু ভাতার পরিমাণ ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা করা হয়েছে।
গত বাজেটে ৮৫০ টাকা করে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন ৩২ লাখ ৩৪ হাজার উপকারভোগী। নতুন বাজেটে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার করার পাশাপাশি ভাতা করা হয়েছে ৯০০ টাকা। মা ও শিশু উপকার কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৭ লাখ ৭১ হাজার করা হয়েছে । এক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণ ৮০০ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮৫০ টাকা। এছাড়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫৫ লাখ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া হিজড়া, বেদে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও চা শ্রমিকদের ভাতা ক্ষেত্রবিশেষে ১৫০ টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জীবনযাপনের ব্যয় বিবেচনা করে দরিদ্র, অসহায় জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বস্তি দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এবছর বাজেট বক্তৃতায় এ পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “নতুন বাজেটের মূল উদ্দেশ্য সমতাভিত্তিক ও কল্যাণধর্মী। সার্বিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হবে। তবে সম্পদ সীমিত হওয়ায় ভাতার পরিমাণ কতটুকু বাড়ানো যায়, সেটা বিবেচনা করা হবে।”
এছাড়াও, বেদে সন্তানদের শিক্ষা উপবৃত্তির সুবিধাভোগী বেড়েছে চলতি অর্থবছরে। গতবছর ৪ হাজার ৩৯৮ জন বেদে সন্তান শিক্ষা উপবৃত্তি পেতো। চলতি অর্থবছরে এ সুবিধা পাচ্ছে ৪ হাজার ৮৩৮ জন। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষা উপবৃত্তির সুবিধাভোগী ২৮ হাজার ৯১২ জন থেকে বাড়িয়ে ৩১ হাজার ৯০২ জন করা হয়েছে। এ ছাড়া চা শ্রমিকদের এককালীনের পরিবর্তে মাসিক ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়েছে। এতদিন চা শ্রমিকদের বছরে একবার ৬ হাজার টাকা দেওয়া হতো। চলতি অর্থবছর থেকে প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত বিশ্ব সামাজিক সুরক্ষা প্রতিবেদন ২০২৪-২৬-এ ধারণা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক নয় শতাংশ খরচ করে। এই সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গড় তিন দশমিক আট শতাংশের তুলনায় কম। প্রাক্কলন থেকে জানা যায় বার্ধক্য ভাতা (ওএএ) ও বিধবা ভাতার (ডব্লিউএ) মতো মূল কর্মসূচিগুলো থেকে মাসিক সুবিধা মাথাপিছু জাতীয় দারিদ্র্যসীমার আয়ের মাত্র ১৪ শতাংশ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা ২২ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষায় সুবিধা কম, যা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে খুব কমই সমন্বয় করা হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর প্রকৃত মূল্য ক্রমাগত কমে যায়। তবে বাজেট বরাদ্দের ভিত্তিতে ছয় বৃহত্তম প্রকল্পের মধ্যে কেবল বার্ধক্য ভাতা প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নতুন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার আলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পুনর্গঠন করাও এখন সময়ের দাবি। তা-সত্ত্বেও বলতেই হবে যে, গ্রামীণ, কৃষিনির্ভর এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ব্যাপক অভিজ্ঞতা এবং প্রশংসনীয় সাফল্য রয়েছে।
তবে, দেশ ইতোমধ্যেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের মনে রাখা দরকার, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা নীতিগুলো প্রাথমিকভাবে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর বিবেচনায় করা হয়েছে। কেননা, কৃষিতে এখনো শ্রমশক্তির বৃহত্তম অংশ নিযুক্ত রয়েছে।
তবে দেশে শিল্প ও পরিষেবা খাতগুলোও দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। এই উদীয়মান খাতের উপর নির্ভরশীল প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্যও নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডিজাইন করা জরুরি। এছাড়া জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের জন্য লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষা বিবেচনায় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকলে আয়-বৈষম্য কিছুটা হলেও লাঘব হবে। দেশ আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যপূর্ণ সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ