গাংনীতে গম ক্ষেতে আগুন, ২৫ লাখ টাকার গম ভস্মীভূত

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হাড়িয়াদহ মাঠে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০০ বিঘা জমির গম পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। এতে কৃষকদের অন্তত ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, গম কাটার পর খড় পরিষ্কার করতে কৃষকরা আগুন দিয়ে থাকেন। হাড়িয়াদহ গ্রামের কৃষক ওসমান আলী তার জমির খড় পোড়াতে আগুন দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসের বেগ বেশি থাকায় মুহূর্তেই আগুন পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা আগুনে পুড়ে যায়।

স্থানীয় কৃষকরা প্রথমে নিজেরাই আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে পুরো খেতের গম পুড়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ এলাকার চাষিরা।

গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে একজন কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।




১২ কেজি এলপিজির দাম বেড়ে ১৭২৮ টাকা

ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ১২ কেজিতে এক লাফে বাড়ল ৩৮৭ টাকা। চলতি এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন দাম ঘোষণা করে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত।

এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।




ইবি শিক্ষক সাদিয়ার খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সড়ক অবরোধ

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কুষ্টিয়ায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকাল ১০টায় শহরের মজমপুর গেট এলাকায় নিহতের স্বজনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করেন।

শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচি চলাকালে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

ঘণ্টাব্যাপী অবরোধ শেষে বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি শেষ করেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন নিহতের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান ও তার বড় মেয়ে তাইবা। তারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।

গত ৪ মার্চ বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে খুন হন শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনা। সে সময় ওই কক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী ফজলুর রহমানকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আসমা সাদিয়া রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুর রহমান বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে রয়েছেন। তবে মামলার অন্য তিন আসামি সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান এবং সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছেন নিহতের সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।

এদিকে বিক্ষোভের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকে যাত্রীবাহী বাস, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোগান্তিতে পড়া যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষক রুনা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলছেন, ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন থাকলেও সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

পরবর্তীতে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের ফটকে অবস্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করেন।




সারা দেশে রাত ৮টার মধ্যে দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত

দেশের সব দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি এ তথ্য জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থায় দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রচেষ্টায় সরকারকে সহযোগিতা করতে এই বিশেষ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির যৌথ সভায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারকে সহযোগিতার লক্ষ্যে ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব দোকান, বাণিজ্য বিতান এবং শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে হোটেল, ফার্মেসি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সেবার দোকান, কাঁচাবাজার এর আওতাবহির্ভূত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।




নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে শিল্পী রানী রায় মেহেরপুরে পৌঁছেছেন

মেহেরপুরের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে শিল্পী রানী রায় মেহেরপুরে পৌঁছেছেন। বুধবার বিকেলে তিনি মেহেরপুর সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছান।

এ সময় সার্কিট হাউসে পৌঁছালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তরিকুল ইসলাম ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁকে বরণ করেন।

উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম শাকাপি ইবনে সাজ্জাদ, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমানসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ




আলমডাঙ্গায় মাদকের ছোবলে যুবসমাজ ক্ষতবিক্ষত

আলমডাঙ্গা উপজেলার স্থানীয় যুবসমাজ আজ এক নীরব বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত। আমাদেরই চেনা-জানা তরুণ প্রজন্মের প্রাণবন্ত, সুঠামদেহী, স্বপ্নবাজ যুবকদের অনেককেই আজ দেখা যাচ্ছে নেশার করাল গ্রাসে শীর্ণ, ক্লান্ত এবং দিশেহারা অবস্থায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই দৃশ্যমান পরিবর্তন শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য এক গভীর অশনিসংকেত।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ এলাকা যা হওয়া উচিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল কেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য এক প্রকার অভয়ারণ্যে। দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকার দুই সময়েই এখানে সন্দেহজনক আনাগোনা চোখে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র অত্যন্ত কৌশলে এই এলাকায় মাদক সরবরাহ ও সেবনের পরিবেশ তৈরি করছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ, যারা অজ্ঞতা, কৌতূহল বা হতাশা থেকে জড়িয়ে পড়ছে এই ভয়াল ফাঁদে। পরিবারগুলো হারাচ্ছে তাদের সম্ভাবনাময় সন্তানদের, আর সমাজ হারাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজার, রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, পশুহাট এলাকা এবং বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সন্ধ্যার পর থেকেই মাদকসেবীদের প্রকাশ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই ইয়াবা সেবন ও বেচাকেনা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অতীতে আলমডাঙ্গায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে এবং অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না এই মাদক বাণিজ্য।

যতদূর জানা গেছে, উপজেলায় একজন দক্ষ, চৌকস ও মানবিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু মাদকের এই বিস্তার রোধে তাঁর সমন্বিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে।

এক্ষেত্রে করণীয় হিসেবে কিছু পদক্ষেপ জরুরি। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা নিশ্চিতকরণ, মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যুবকদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প কার্যক্রম (খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা) বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে আলমডাঙ্গাবাসী আশা করে সময়োপযোগী, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে খুব শিগগিরই এই মাদকের অন্ধকার ছায়া দূর হবে।

কারণ, একটি সুস্থ প্রজন্মই পারে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।




কুষ্টিয়ায় অবৈধভাবে তেল মজুদ, ব্যবসায়ীকে জরিমানা

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বিআইডিসি বাজারে অবৈধভাবে তেল মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে উজ্জ্বল শেখ নামের এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

জানা যায়, সাম্প্রতিক তেল সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন।

অভিযানে ‘উজ্জ্বল স্টোর’ নামের দোকান থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও উজ্জ্বল শেখ দীর্ঘদিন ধরে খোলা বাজারে পেট্রোল ও ডিজেল মজুত করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে আসছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক ক্রেতার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ৩ হাজার ২০০ লিটার পেট্রোল বিক্রি করেছেন, যা তার অবৈধ বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত ইয়াসমিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দোকানটিতে অভিযান চালান। এ সময় অবৈধভাবে তেল মজুতের প্রমাণ পাওয়ায় উজ্জ্বল শেখকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তিনি আরও জানান, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এদিকে সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন।




কালীগঞ্জে ট্রাক্টরের চাপায় প্রাণ গেল এক শিশুর

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ট্রাক্টরের চাপায় মোস্তাফিজুর রহমান (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার মধুপুর গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মোস্তাফিজুর রহমান মধুপুর গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে। সে স্থানীয় মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণির ছাত্র।

স্থানীয়রা জানায়, স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে দুই ভাই বাইসাইকেলে পারশ্রীরামপুর মাঠের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে কালুখালী মাঠের গভীর নলকূপের কাছে সড়কে উল্টো দিক থেকে আসা একটি মাটি বোঝাই ট্রাক্টর দ্রুত গতিতে আসতে দেখে তারা দাঁড়িয়ে পড়ে।

এ সময় পেছনে বসা মোস্তাফিজুর ট্রাক্টরের ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে যায়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় শিশু মোস্তাফিজুর। এ সময় ট্রাক্টর চালককে আটক করে স্থানীয়রা।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কালীগঞ্জ থানার ওসি জেল্লাল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে ট্রাক্টর চালককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।




‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শতবর্ষে বাঙালি মুসলমান

ধর্ম-আলোচনায় কিংবা এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তারপরও অনেকে মনে করেন, ধর্ম ও যুক্তি পরস্পরবিরোধী। মনে করা হয়, একই সঙ্গে ধর্ম ও যুক্তিবাদের চর্চা সম্ভব নয়। আসলে এমন ধারণা সঠিক নয়, বরং অসম্পূর্ণ ও অযৌক্তিক। যারা ধর্ম মানেন, পালন করেন তারা যে সবাই যুক্তিবিধর্ম-আলোচনায় কিংবা এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তারপরও অনেকে মনে করেন, ধর্ম ও যুক্তি পরস্পরবিরোধী।রোধী, এমন নয়। ধার্মিক ও ধর্মবেত্তা তফসিরকারকদের মধ্যে অনেকেই যুক্তির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন অকপটে।

বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আমরা বেশ কয়েকজন যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তার বাঙালি মুসলমান তরুণের সাক্ষাত পাই যাদের অন্তর্লোক ধর্ম-আধ্যাত্মিকতা ও যুক্তিবাদের আলোয় উদ্ভাসিত ছিল। ১৯২৬ সালে ঢাকায় ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন নামে যে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয়, তার প্রবক্তা, কর্মী, সংগঠকরা অধিকাংশই ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ অথবা ধর্মজিজ্ঞাসু। এদের মুখপত্র ‘শিখা’র মর্ম শ্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আবুল হুসেন, অধ্যাপক কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদির, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির প্রমুখ ছিলেন ধর্মবোধসম্পন্ন যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ। এঁদের উদ্যোগ ও নেতৃত্বেই এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যাকে অন্নদাশঙ্কর রায় ‘দ্বিতীয় রেনেসাঁ’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ আন্দোলনের সংগঠকরা যুক্তি ও ধর্মের সমন্বয়ে একটি যুক্তিনির্ভর জীবনাদর্শ গড়তে যে ত্যাগ স্বীকার করেন তা বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল। এঁদের প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯ জানুয়ারি, ১৯২৬) বাঙালি মুসলমান তরুণদের চিত্তে ও চেতনায় বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। সাহিত্য-সমাজ চেয়েছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের চিন্তার পরিধিকে বিস্তৃত করতে। অন্ধ সংস্কার, শাস্ত্রাচার, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি থেকে মুসলমান সমাজকে মুক্ত করতে।

কাজী নজরুল ইসলামও এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করেছিলেন। এক পর্যায়ে আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ও শিখা’র সম্পাদক আবুল হুসেন ও তাঁর সহযাত্রীদের ওপর নেমে আসে মুসলিম রক্ষণশীলতার খড়গ। তাঁদের ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়। আবুল হুসেনের ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধটি ‘শান্তি’ (আশ্বিন ১৩৩৬) পত্রিকায় প্রকাশের পর তর্ক-বিতর্কের ঝড় ওঠে। আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে। ‘আবুল হুসেন তখন ঢাকা জজ-কোর্টের উকিল।—- ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর রবিবার “আহসান-মঞ্জিলে আঞ্জুমান অফিসে এক বিশেষ সভার অধিবেশন হয়; সভায়” আবুল হুসেন হুমকীর মুখে এই বলে ‘ক্ষমাপাত্র’ লিখে দেন: “এই প্রবন্ধের ভাষা দ্বারা মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের মনে যে বিশেষ আঘাত দিয়াছি, সেজন্য আমি অপরাধী।’ (আবুল হুসেনের রচনাবলী, আবদুল কাদির সম্পাদিত, ঢাকা, অক্টোবর ১৯৬৮; পৃ. ‘ভূমিকা’-১৫।) মুসলিম সাহিত্য সমাজের দুই প্রাণপুরুষ আবুল হুসেন ও কাজী আব্দুল ওদুদ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র কাজ বন্ধ রেখে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হন। থিতু হন কলকাতায়। পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগের অভাবে ‘শিখা’র দ্যুতি ক্রমশ ফিকে হতে থাকে।

শিখাগোষ্ঠীর সংগঠক-চিন্তক-লেখকরা কেউ নাস্তিক বা ধর্মবিরোধী ছিলেন না। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যিকারের জীবনাদর্শের আলোকে এঁরা নিজেদের তৈরি করতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি রামমোহন, ডিরোজিও, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, তুরস্কের কামাল আতার্তুক, পারস্যের শেখ সাদি, ফরাসি লেখক-দার্শনিক রোম্যা রোঁলাও তাদের চিন্তাবিশ্বকে আলোড়িত করেছে। সাহিত্যিক ডা. লুৎফর রহমানের সাহিত্যিক চিন্তাধারাও শিখাগোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করেছে। ডা. লুৎফরের সাহিত্যচর্চার মূল উদ্দেশ্য ছিল মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষের অন্তর্নিহিত মহৎ সত্তার বিকাশের মাধ্যমে একটি উন্নতর ও মহত্তর সমাজ বিনির্মাণের। আমাদের সমাজে যখন ধর্ম নিয়ে প্রবল তর্ক-বিতর্ক চলছে, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদের রেখাটা স্পষ্টতর হয়ে উঠছে, তখনও তিনি উদার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের মর্মদর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করতেন, ‘জ্ঞানের দ্বারা মনকে চাষ না করতে পারলে ধর্ম পালন হয় না।’ (রায়হান। লুৎফর রহমান রচনাবলী, পৃ: ১৮২।) তিনি আরও বলেছেন, ‘জীবনকে নির্মল, সত্যময়, সুন্দর, ঈশ্বরের যোগ্য, প্রেমময়, নিষ্পাপ, নির্দোষ করে তোলাই সমগ্র ‘মানবজাতির একমাত্র ধর্ম।..এই সাধারণ ধর্মের নাম আমি ইসলাম দিতে চাই। ইসলাম অর্থ শান্তি, মহাশান্তি।’

শিখাগোষ্ঠীর লেখক ও সংগঠকরা ছিলেন বিশ শতকের তৃতীয় দশকের সবচেয়ে প্রাগ্রসর চিন্তার ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষ। অথচ আমরা আজও তাঁদের চিনতে পারিনি। যুক্তিবাদের আলো দিয়ে তারা ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। শিখাগোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ আবুল হুসেন ‘ইসলামের দাবী’ নামক এক প্রবন্ধে নিঃশঙ্কচিত্তে বলেছিলেন, ‘হজরত মোহাম্মদের নামের পূজা ও তাঁর মাহাত্ম্যের অন্ধ মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমাদের জ্ঞানের রাজপথে এসে সাধনা রত হতে হবে, এবং সমাজ জীবনে ‘তাখাল্লাকু বি-আখাবিল্লাহ’ (হজরতের বাণী) সার্থক ও সফল করে তুলতে হবে।’ কাজী আবদুল ওদুদ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘আল্লার গুণাবলীতে বিভূষিত হও, আল্লার গুণাবলীতে বিভূষিত হওয়ার অর্থ অনন্ত সদগুণে ভূষিত হওয়া, কাজেই মানুষের উন্নতির অন্ত নেই-।’

এ থেকে বোঝা যায়, মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তক-লেখকগণ মহানবি ও ইসলাম ধর্মকে অন্তর দিয়ে মেনেছেন, অন্ধভাবে নয়। ইসলামকে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন স্বচ্ছ ও মুক্তবুদ্ধির আলো দিয়ে, গোঁড়ামি দিয়ে নয়। পারস্যের শেখ সাদি ছিলেন শিখা গোষ্ঠীর লেখকগণের প্রিয় কবি। শেখ সাদির কবিতা কাজী আব্দুল ওদুদকে অনুপ্রাণিত করেছে। মহানবির প্রশস্তিসূচক শেখ সাদির পঙক্তিমালা তিনি বারবার পাঠ করতেন:
‘বালাগাল উলা বে কামালিহি।/ কাশাফাদদুজা বে জামালিহি।’ অর্থাৎ উৎকর্ষে তিনি মহৎ ও মহীয়ান। তাঁর সৌন্দর্যে সব অন্ধকার দূর হয়েছে। মুসলমান সমাজকে কুসংস্কারের অন্ধগলি থেকে জ্ঞানের রাজপথে নিয়ে আসার জন্যই শিখা গোষ্ঠীর সকল সাধনা ও কর্মপ্রয়াস পরিচালিত হয়েছে। বাঙালি মুসলমান সমাজের উন্নয়নে অনেকেই ব্যক্তি পর্যায়ে কাজ করেছেন। কিন্তু শিখাগোষ্ঠীর তরুণদের তৎপরতার মধ্যে ছিল সামষ্টিক চেতনা। সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে কেবল স্ব সমাজ ও স্বধর্মের ঋণ শোধ নয়, ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে যে-ভ্রান্ত ধারণা চালু রয়েছে সেসব ধারণার রাহুগ্রাস থেকেও বাঙালি মুসলমানকে তাঁরা মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। বরং জ্ঞানের আলো জ্বালাতে গিয়ে নিজেরাই পুড়ে মরেছেন।

তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম, মুক্তবুদ্ধির ধর্ম। এ ধর্মে কোনো অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, সংকীর্ণতা ও যুক্তিহীনতা থাকতে পারে না। আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন মহানবি (সা.)-কে পথ-প্রদর্শক, মনুষ্যত্বের আধার, ‘একজন উঁচুদরের যুগ প্রবর্তক মহাপুরুষ’, দিব্যকান্তি সুদর্শন পুরুষ হিসেবে মান্য করেছেন। কিন্তু ইসলামের নামে আচারসর্বস্বতা ও আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি নিয়ে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেননি। আবুল ফজল আরবি ভাষায় খোতবা পাঠের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আরবে আরবিতে খোতবা পড়া হয়। সেই ধুয়া ধরিয়া আমরাও চলিয়াছি তাহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া। মনে করি, সুন্নত পালন করিতেছি। আর ভুলিয়া যাই আরবি আরবদের মাতৃভাষা, আরবি তাহারা বুঝে, আমরা তাহা বুঝি না অথচ পুণ্যলাভের দুরাশায় বুঝিবার ভান করিয়া হাহুতাশ করিয়া বুক ভাসাই।’ (তরুণ আন্দোলনের গতি, শিখা, তৃতীয় বর্ষ, ১৯২৯। পৃ:১৩৭)

সাধারণ মানুষ যাতে কোরআন ভালভাবে বুঝতে পারে, সেজন্য কাজী আবদুল ওদুদ পবিত্র কোরআন বাংলায় অনুবাদ করেন। অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি স্বকীয়তার পরিচয় দেন। ধর্মচর্চাকে তিনি ‘আদর্শের বা শ্রেষ্ঠ চিন্তার আনুগত্য’ বলে মনে করেছেন। তারপরও সারাজীবন আবেগের চেয়ে যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম’ গ্রন্থে ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন: ‘একালের ধর্ম বলতে জ্ঞান ও মনুষ্যত্ব সাধনাই মুখ্যভাবে বুঝতে হবে—ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের দিক তার তুলনায় গৌণ,—জীবনে কোনটি মুখ্য, কোনটি গৌণ এই বিচার আমাদের মধ্যে যেন কখনো শিথিল না হয়, বিশেষ করে একালের জটিল জীবনায়োজনের দিনে।’ (হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম, কলিকাতা, ১৩৭৩। পৃ: ৩০৫) অন্যদিকে, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, মোতাহার হোসেন চৌধুরী প্রমুখ ধর্মকে যুগের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

তাঁরা মনে করতেন, বাঙালি মুসলমান বহুকাল থেকেই যুগধর্ম উপেক্ষা করে সৃষ্টিশীলতার পথ থেকে দূরে সরে গেছে। মুসলমান সমাজের ধর্ম সম্পর্কিত উপলব্ধি মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে ভীষণভাবে হতাশ করেছে। তাঁর মনে হয়েছে, এ সমাজ ধর্মকে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই এরা সৎ, সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দময় জীবনযাপন করতে পারছে না। আচারিক ধর্মের ডোবাতে হাবুডুবু খাচ্ছে বলে আমাদের সমাজ ক্রমশ ধর্মান্ধ হয়ে উঠছে। প্রজ্ঞার অভাবে গভীর ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষও তৈরি হচ্ছে না। অথচ প্রকৃত ধর্মবোধ ছাড়া ধর্মের মর্মমূলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছেন:

‘.. শাস্ত্র পঠনের আবশ্যকতা তার থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করবার জন্যই, তাকে হুবহু নকল করবার জন্য নয়। .. শাস্ত্রকে উপেক্ষা করতে বলছিনে, মানুষকে শাস্ত্রের কাজে না লাগিয়ে, শাস্ত্রকে মানুষের কাজে লাগানোর কথা বলছি। অন্তরের অন্তস্তল হতে উৎসারিত প্রেম আর সমস্ত বিশ্ব-ব্যাপী অখণ্ড অদ্বৈতের অনুভূতিই ধর্ম।’

পশ্চাৎপদ ও দুর্দশাগ্রস্ত মুসলমান সমাজকে এগিয়ে নিতেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র অভ্যুদয়। সেই সঙ্গে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শুভ সূচনা। এ আন্দোলনের লেখক-সংগঠকরা ধর্ম ও যুক্তিকে পাশাপাশি রেখে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কালের বৈরী প্রতিক্রিয়া পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেছে। যে-স্বপ্ন নিয়ে তাদের যাত্রা, তা মাঝ পথেই বাধার সম্মুখীন হয়। ফলে তাদের কোনো স্বপ্নই পূরণ হয়নি।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, গত শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্তও বাঙালি মুসলমান-সমাজ শিখাগোষ্ঠীর মুক্ত, স্বচ্ছ, প্রাগ্রসর চিন্তা ধারণ করার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও পরিপক্বতা প্রয়োজন, সেটা তাদের মধ্যে ছিল না। কিন্তু শিখাগোষ্ঠীর লেখকরা ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ইসলাম ধর্মের একটি যুক্তিসিদ্ধ ও শাশ্বত রূপ সাধারণের মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ধর্ম ও যুক্তিকে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে ধর্মযুদ্ধ করতে চাননি। আধুনিক বাঙালি মুসলমানকেও ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব না বাধিয়ে, বরং উভয়ের মধ্যে সার্থক সংলাপের আয়োজন করেই অগ্রসর হতে হবে। পশ্চিমাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলেও যুক্তির ছায়ার নিচে আশ্রয় নিতে হবে। হিংসায়-উন্মত্ত, দ্বন্দ্ব মুখর পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সমঝোতা ও যুক্তিসিদ্ধ আলাপ-আলোচনার আবশ্যকতা অস্বীকার করা যায় না।

লেখক ও প্রবান্ধিক। উপাধ্যক্ষ, মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, মেহেরপুর।




পারিবারিক শিক্ষা বনাম রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়: একটি বৌদ্ধিক বিপ্লবের ইশতেহার

সূচনার প্রেক্ষাপট: মহীরুহ বনাম শেকড়ের রসায়ন

একটি রাষ্ট্র যদি একটি বিশাল মহীরুহ হয়, তবে পরিবার হলো তার প্রাণদায়ী শেকড়। আমরা যখন একটি গাছের ডালপালা শুকিয়ে যেতে দেখি বা ফলকে বিষাক্ত হতে দেখি, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি ওপরের নয়, বরং মাটির গভীরে শেকড়ে পচন ধরেছে। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা রাষ্ট্রীয় যে অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন কিংবা দুর্নীতির মহোৎসব দেখছি, তা আকাশ থেকে পড়া কোনো পঙ্গপাল নয়; বরং এটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষার চরম সংকটের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক একেকটি পরিবারের প্রতিনিধি। যখন পরিবার তার নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাঠ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভে ধস নামা অনিবার্য।

অন্দরমহলের দায়বদ্ধতা: নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা

মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, একটি শিশুর চরিত্রের ৭০ শতাংশ গঠিত হয় তার জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে—যা সে পরিবার থেকে শেখে। অথচ আধুনিক অন্দরমহলগুলো আজ নৈতিকতার চেয়ে বস্তুগত অর্জনে বেশি মনোযোগী। একটি রাষ্ট্র যখন নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রের পরিবারগুলো ভেতর থেকে ক্ষয়ে গেছে। আমরা যখন বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ফাঁসি চাই, তখন আমরা ভুলে যাই যে সেই চোরটি একদিন কোনো না কোনো ঘরে বড় হয়েছে। যে মা-বাবা সন্তানকে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শেখান, তারাই পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্বৈরাচার তৈরি করছেন। রাষ্ট্রকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করাতে হলে প্রতিটি ঘরকে হতে হবে এক একটি ‘নীতিবিদ্যার ল্যাবরেটরি’।

চুরির হাতেখড়ি: পেন্সিল থেকে মেগা প্রজেক্ট

দুর্নীতির শেকড় কিন্তু সচিবালয়ে নয়, বরং শুরু হয় ডাইনিং টেবিল থেকে। শৈশবে যখন একটি শিশু অন্য সহপাঠীর পেন্সিল বা টিফিন বক্স চুরি করে বাড়ি ফেরে এবং মা-বাবা তাকে শাসন না করে ‘বুদ্ধিমান’ বা ‘চালাক’ বলে প্রশ্রয় দেন, ঠিক ওখান থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠনের প্রথম পাঠ। যে হাত শৈশবে অন্যের হকে ভাগ বসাতে আনন্দ পায়, সেই হাতই বড় হয়ে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের বাজেট গিলে ফেলে। এই চারিত্রিক স্খলনের দায় রাষ্ট্রের চেয়ে পরিবারেরই বেশি। কারণ, পরিবার যদি শৈশবেই ‘সততার আভিজাত্য’ শেখাত, তবে রাষ্ট্রীয় আমলা বা রাজনীতিবিদরা লোভের কাছে মাথা নত করতেন না।

মেকি জিপিএ-৫ বনাম মানবিক বিবেক: সাফল্যের এক ভ্রান্ত ধারণা

আধুনিক পরিবারগুলো আজ একেকটি ‘রেজাল্ট উৎপাদনকারী’ কারখানায় রূপান্তরিত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের সন্তানদের আমরা একটিই মন্ত্র জপ করি—’তোমাকে জিপিএ-৫ পেতে হবে’। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে আমরা সন্তানদের বই মুখস্থ করাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের শেখাচ্ছি না কীভাবে অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হতে হয় বা একটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। যখন এই ‘যেকোনো উপায়ে সফল হওয়ার’ ভয়ঙ্কর নেশা নিয়ে একজন শিক্ষার্থী বড় হয় এবং রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বসে, তখন তার কাছে বিবেক বা নীতিবোধ এক কাল্পনিক কৌতুক মাত্র। বর্তমান রাষ্ট্রীয় অরাজকতা আসলে আমাদের এই স্বার্থপর ও প্রতিযোগিতামূলক পারিবারিক শিক্ষারই চূড়ান্ত বিষফল। যে শিক্ষা কেবল ব্যক্তি-স্বার্থ শেখায়, তা কোনোদিন দেশপ্রেমিক নাগরিক উপহার দিতে পারে না।

ডিজিটাল ভ্রূণহত্যা ও অভিভাবকত্বের দায়

আমাদের রাষ্ট্রীয় অবক্ষয় আজ আর শুধু রাজপথ বা সংসদে সীমাবদ্ধ নেই; তা ঢুকে পড়েছে অন্দরমহলের শোবার ঘরেও। আমরা আধুনিকতার নামে শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছি, কিন্তু তারা সেখানে কী দেখছে বা কী শিখছে—তা নিয়ে আমরা উদাসীন। যখন মা-বাবা শিশুর পাশে শুয়ে স্ক্রিনে আদিম উল্লাসে মত্ত হন, তখন সেই নিষ্পাপ চোখগুলো অজান্তেই অন্ধকারের ভাষা চিনে নেয়। একেই আমি বলছি ‘ডিজিটাল ভ্রূণহত্যা’—যেখানে শিশুর নৈতিক সম্ভাবনাগুলো বিকাশের আগেই মেরে ফেলা হচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রকে গালি দিই, কিন্তু ঘরের কোণে বিষাক্ত ডিজিটাল ডিভাইসে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ যে আমরা নিজ হাতে জবাই করছি—সেই নগ্ন সত্যটা স্বীকার করার সাহস আমাদের নেই। যে তরুণ সমাজ আজ ডিজিটাল উন্মাদনায় পথহারা, তাদের এই পথভ্রষ্ট হওয়ার পেছনে পরিবারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উদাসীনতাই দায়ী।

সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব: অনলাইন আশীর্বাদ বনাম অভিশাপ

অনলাইন বা ইন্টারনেট আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্ঞানভাণ্ডার হলেও আমাদের সমাজে এর ব্যবহার হচ্ছে ভিন্নভাবে। টিকটক বা রিলসের নামে যে কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি আর সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লড়াই চলছে, তা এই প্রজন্মের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। পরিবার যখন তার সন্তানদের এই সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করতে পারে না, তখন সেই সমাজজুড়ে এক ধরণের ‘মানসিক পঙ্গুত্ব’ তৈরি হয়। ডাইনিং টেবিলে বসে মা-বাবা যখন অন্যের গিবত গান এবং পরমত সহিষ্ণুতাকে দুর্বলতা মনে করেন, তখন সেই পরিবার থেকে সহনশীল নাগরিক আসার কোনো সুযোগ থাকে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের চরিত্র হনন করার যে পৈশাচিক আনন্দ আজ তরুণদের মাঝে দেখা যায়, তা আসলে তাদের পারিবারিক শিক্ষারই এক ধরণের নেতিবাচক প্রতিফলন।

রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়: যেখানে নিয়মই অনিয়ম

রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারহীনতা এবং দুর্নীতির যে জয়জয়কার আমরা চারপাশে দেখি, তা একদিনে তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রীয় এই অবক্ষয় আসলে লক্ষ লক্ষ পরিবারের ব্যর্থতার এক সামষ্টিক ও বীভৎস রূপ। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি কলকব্জা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সেই চালকদের পারিবারিক বুনন ছিল নড়বড়ে। যখন একজন অভিভাবক তার সন্তানকে শেখান ‘যেকোনো উপায়ে জয়ী হওয়াই বীরত্ব’, তখন সেই সন্তান বড় হয়ে রাষ্ট্রকে লুটপাট করতে দ্বিধা করে না। আদর্শিক নেতৃত্ব আকাশ থেকে পড়ে না; তা তৈরি হয় প্রতিটি ঘরের পড়ার টেবিলে এবং মা-বাবার জীবনাচরণে। পরিবার যখন তার সন্তানদের দেশপ্রেমের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদ বেশি শেখায়, তখন রাষ্ট্র তার নৈতিক অভিভাবকত্ব হারায়।

বৌদ্ধিক বিপ্লব: সংস্কারের শুরু হোক ঘর থেকে

আমরা প্রায়ই রাজপথে বিপ্লবের কথা বলি, রাষ্ট্র সংস্কারের স্লোগান দিই; কিন্তু আসল বিপ্লবটা হতে হবে আমাদের মনস্তত্ত্বে। এই বৌদ্ধিক বিপ্লবের প্রথম ধাপ হতে হবে প্রতিটি পরিবারের অভ্যন্তরে। রাষ্ট্রীয় সংস্কার কোনো ওপরতলার প্রশাসনিক হুকুম বা আইনি কাঠামো দিয়ে স্থায়ীভাবে সম্ভব নয়, যতক্ষণ না নাগরিকের চারিত্রিক ভিত্তি মজবুত হয়। নৈতিকতা, সত্যবাদিতা এবং পরমতসহিষ্ণুতার যে শিক্ষা আমাদের পরিবারগুলো থেকে হারিয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধার করাই হোক এবারের সংগ্রাম। রাষ্ট্রকে দোষারোপ করার আগে আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং দেখতে হবে আমরা প্রতিটি ঘর থেকে সমাজকে কেমন মানুষ উপহার দিচ্ছি।

উপসংহার: আগামীর দায়বদ্ধতা ও প্রতিরোধের দুর্গ

পারিবারিক শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া অন্যটি অচল। আমরা যদি আগামীর সুন্দর একটি বাংলাদেশ বা একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই, তবে পরিবারকে তার আদি পরিচয়ে ফিরে যেতে হবে—অর্থাৎ একটি ‘নৈতিক পাঠশালা’ হিসেবে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের এই করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পরিবারকেই হতে হবে নৈতিক প্রতিরোধের প্রথম দুর্গ। মনে রাখতে হবে, সমাজ বা রাষ্ট্র পরিবর্তনের চাবিকাঠি কোনো নেতার হাতে নয়, বরং প্রতিটি সচেতন মা-বাবার হাতে। ঘরের দেয়ালগুলো যদি সততার পাঠ দিতে শুরু করে, তবে রাষ্ট্রের রাজপথগুলো এমনিতেই কলঙ্কমুক্ত হবে।