
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তথ্য, বিনোদন, শিক্ষা কিংবা স্থানীয় নানা ঘটনা মুহূর্তেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে।
মেহেরপুরেও গত কয়েক বছরে ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বেড়েছে।
তবে ইতিবাচক কনটেন্টের পাশাপাশি কনটেন্ট তৈরির নামে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও রুচিহীন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মিম কিংবা বিনোদনের নামে তৈরি এসব ভিডিওর অনেকগুলোতে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় ঘটনা, কথাবার্তা ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কোথাও ব্যবহার করা হচ্ছে অশালীন ভাষা ও অঙ্গভঙ্গি। আবার কোনো কোনো ভিডিওতে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত বিষয়কে হাস্যরসের উপকরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার লক্ষ্যেই এসব কনটেন্টে চমকপ্রদ ও কুরুচিপূর্ণ উপাদান যুক্ত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়ভাবে পরিচালিত বিভিন্ন মিম পেজ, ফেসবুক গ্রুপ ও কনটেন্টভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে চোখ রাখলে দেখা যায়, অল্প সময়ে বেশি দর্শক ও শেয়ার পাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। একটি ভিডিও কিছুটা জনপ্রিয় হওয়ার পর একই ধরনের আরও ভিডিও তৈরি হচ্ছে। ফলে বিনোদনের নামে তৈরি কনটেন্টের ভাষা ও উপস্থাপনায় অশালীনতার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এতে মেহেরপুরের আঞ্চলিক ভাষার মান মর্যাদাও ক্ষুন্ন হচ্ছে।
কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে ব্যক্তিগত বিষয়কে বিনোদনের উপকরণ বানানো নিয়ে। কারও কথা বলার ধরন, পোশাক, চলাফেরা, পারিবারিক বিষয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মিম ও ভিডিও। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়াই তাঁর ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
মেহেরপুরের বিভিন্ন মিম পেজের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নিয়ে মিম তৈরি করে প্রকাশের অভিযোগও উঠেছে। সাদিয়া আফরিন জ্যামি নামে এক নারী অভিযোগ করে বলেন, কিছুদিন আগে তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে ব্যক্তিগত কিছু ছবি ও ভিডিও নিয়ে ‘এক্সপোর্ট মেহেরপুর ২.০’ নামের একটি পেজে তাঁর ছবি ব্যবহার করে মিম তৈরি করে প্রকাশ করা হয়। এতে তাঁর মানহানি হয়েছে দাবি করে তিনি সাইবার সাপোর্ট সেন্টার, ডিবি, ডিএমপি, ঢাকায় ওই ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানান।
এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়ও প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে একজন ব্যক্তি সামাজিকভাবে বিব্রত হতে পারেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ছবি বা ভিডিও নিয়ে তৈরি কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
অনেক ভিডিওতে স্থানীয় মানুষের কথাবার্তা বা কোনো ঘটনাকে এমনভাবে সম্পাদনা করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মূল ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কোনো বক্তব্যের একটি অংশ কেটে নিয়ে তার সঙ্গে অন্য শব্দ বা দৃশ্য যুক্ত করে তৈরি করা হচ্ছে নতুন ভিডিও। আবার কোথাও অভিনয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে কথিত মজার দৃশ্য।
এসব ভিডিওর সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য সবসময় স্পষ্ট থাকে না। ফলে দর্শকদের একটি অংশ এগুলোকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করার আশঙ্কাও থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও কত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটি অনেকাংশেই নির্ভর করে দর্শকের আগ্রহের ওপর। আর এই আগ্রহ তৈরি করতে গিয়ে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা স্বাভাবিক বিনোদনের পরিবর্তে চমক, বিতর্ক ও অশালীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মেহেরপুরের স্থানীয় ঘটনা, বাজার, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি ভিডিও খুব দ্রুত বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কনটেন্টের মধ্যে অনেকেই জেলার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপন তুলে ধরছেন। তবে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতা সোহাগ মিয়া বলেন, “বর্তমানে মেহেরপুরে অনেকে কনটেন্ট তৈরি করছেন। আমি চাই, তারা সবাই সুন্দর ও শালীনভাবে এই জেলাকে মানুষের সামনে তুলে ধরুক। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি থেকে নিজেদের বিরত রেখে নিজেদের একটি পরিচয় তৈরি করুন।”
কনটেন্ট ক্রিয়েটর এমপি রকি বলেন, “কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে আমরা মানুষের কাছে কিছু বার্তা তুলে ধরি। এই বার্তাটা অবশ্যই শালীন হতে হবে। আমরা যদি আমাদের ভিডিওতে খারাপ কিছু তুলে ধরি, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভিউ হলেই কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়া যায় না। যেকোনো ভিডিওতেই ভিউ হতে পারে, কিন্তু সেটা সমাজের জন্য এবং নিজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। যারা নেতিবাচক কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাদের কাছে আমার অনুরোধ এমন ভিডিও বানান, যাতে সমাজের মানুষ কিছু শিখতে ও জানতে পারে।”
ট্রাভেল কনটেন্ট নির্মাতা রাগীব শাহরিয়ার বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় বেশি চোখে পড়ছে মেহেরপুর থেকে অনেক বেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৈরি হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ শুধু মেহেরপুরকেন্দ্রিক ভিডিও করেন। তাঁরা মেহেরপুরের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাপন মানুষের মাঝে তুলে ধরেন। তবে এর মধ্যে একটি পক্ষ রয়েছে, যারা মেহেরপুরের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিকৃত করে পুরো বাংলাদেশে প্রচার করছেন। আমাদের মনে রাখা উচিত, সামান্য কিছু ভিউয়ের জন্য যদি আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষাকে বিকৃত করি, তাহলে এর খারাপ প্রভাব দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকবে।”
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে কনটেন্ট তৈরির পদ্ধতিও বদলেছে। মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনার পাশাপাশি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে বাস্তবে ঘটেনি এমন দৃশ্যও বাস্তবের মতো উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।
এ ধরনের প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার যেমন রয়েছে, তেমনি অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া পরিবর্তন করে অশালীনভাবে উপস্থাপন করা হলে তা সামাজিকভাবে ক্ষতিকর হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য হয়রানির কারণ হতে পারে।
মেহেরপুরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ। ফলে তাঁদের সামনে কী ধরনের কনটেন্ট যাচ্ছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিয়মিত অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ ভিডিও সামনে আসতে থাকলে সেটিকে স্বাভাবিক বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটায়। তাঁদের সামনে থাকা কনটেন্টের ভাষা, উপস্থাপনা ও বিষয়বস্তু সামাজিক আচরণ ও মূল্যবোধে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।
এ বিষয়ে মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া বিনোদন ও শেখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর গুরুত্ব আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।
এক্ষেত্রে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা অশ্লীল, মূল্যবোধবিরোধী এবং শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন কনটেন্ট তৈরি করছেন। এই কনটেন্ট তৈরির কারণে আমাদের নতুন প্রজন্মের যে ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার ছিল, তা হচ্ছে না। একটি কনটেন্টে শুধু ভিউ, লাইক, কমেন্টই সবকিছু নয়। আপনার ভিডিওর মাধ্যমে যাতে স্থায়ী পরিবর্তন হয় এবং মানুষ সৃষ্টিশীল কাজে উদ্বুদ্ধ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।”
ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি এবং এআই দিয়ে ছবি পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আইনগত প্রশ্নও রয়েছে।
আইনজীবী আ.ন.ম. আল মামুন-অনল বলেন, “এ কয়দিন কুরুচিপূর্ণ পোস্ট ও এআই দিয়ে তৈরি ছবি এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বা পর্নোগ্রাফি আইনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দুই থেকে সাত বছর সাজা এবং সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান আইনে আছে। তবে সাইবার সিকিউরিটিতে মামলা করতে হলে বিভাগীয় জেলায় যেতে হয়। এ কারণে অনেকেই এ ধরনের মামলা করতে চান না। থানাতেও করা যায়, কিন্তু থানা সচরাচর এ ধরনের মামলা নিতে চায় না। যার কারণে মেহেরপুরে সাইবার বুলিং বা সাইবার ক্রাইম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানরা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, তা নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অশালীন বা কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট শিশু-কিশোরদের সামনে সহজেই পৌঁছে যাওয়ায় পরিবার থেকেও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
অভিভাবক মনিরা বেগম বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানরা কী দেখছে, সেটি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বিনোদনের নামে কুরুচিপূর্ণ বা অশালীন কনটেন্ট সামনে এলে তাদের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।”
আরেক অভিভাবক রিতা খাতুন বলেন, “মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিশু-কিশোরদের জীবনের অংশ। তাই কনটেন্ট নির্মাতাদেরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হাসাহাসি বা কুরুচিপূর্ণ ভিডিও তৈরি না করে ইতিবাচক কনটেন্ট তৈরি করা উচিত।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করা বর্তমানে অনেকের জন্য সৃজনশীলতা প্রকাশ ও আয়ের মাধ্যম। মেহেরপুরের অনেক তরুণ ও তরুণী তথ্যবহুল, শিক্ষামূলক, বিনোদনমূলক ও স্থানীয় নানা বিষয় নিয়ে ভালো কনটেন্ট তৈরি করছেন। ফলে কনটেন্ট তৈরি বা মিম সংস্কৃতিকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে দর্শক টানতে গিয়ে অশ্লীলতা, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হাসাহাসি কিংবা কাউকে হেয় করার প্রবণতা কতটা গ্রহণযোগ্য। একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়া কিংবা বেশি ভিউ পাওয়া কোনো কনটেন্টের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না।

