
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রাম থেকে ৯৬টি মাইন উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল। এর মধ্যে ৭৯টি এন্টি পার্সোনেল মাইন ও ১৭টি এন্টি ট্যাংক মাইন রয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘটনাস্থল এসব মাইন উদ্ধার করে বেতবাড়িয়া-মধুগাড়ির মাথাভাঙা নদীর পাড়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে নিষ্ক্রিয় করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল ইউনিটের একটি দল। এসময় পুরো এলাকার বিকট শব্দে কেঁপে উঠে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল সোমবার দুপুরে সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী একটি দল বেতবাড়িয়া গ্রামে ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় তিন ঘন্টা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ করে। পরে উদ্ধার করা এসব বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করতে পার্শ্ববর্তী গ্রাম
বেতবাড়িয়া-মধুগাড়ি গ্রামে অবস্থিত মাথাভাঙা নদী পাড়ে নেওয়া হয়। পরে সেখানে সেনাবাহিনীর চৌকস দল উদ্ধার হওয়া মাইন গুলো নিষ্ক্রিয় করলে বিকট শব্দে এঅঞ্চলের এক কিলোমিটার এলাকা বিকট শব্দে কেপে উঠে। এসব তথ্য নিশ্চিত করে গাংনী থানার ওসি তদন্ত শিমুল বিশ্বাস বলেন আমাদের এই উদ্ধার অভিযান আজকের মত শেষ হয়েছে।
নদীর ওপারের তেকালা গ্রামের আরামত হোসেন জানান, মাইনগুলো যখন বিষ্ফোরণ হচ্ছিল তথন আমাদের ঘর বাড়ি কাঁপছিলো।
উল্লেখ্য -গত শনিবার বেতবাড়িয়া গ্রামের কালু মালিথার একটি পরিত্যক্ত জমিতে মাইনসদৃশ কয়েকটি বস্তু দেখতে পান স্থানীয়রা। বস্তুগুলোর কয়েকটিতে ইংরেজিতে MPI 1967 MINE A/PERS ND P2 MK2 লেখা রয়েছে। ওই দিন বস্তুগুলো কর্ডন করে পাহারা দেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব, পুলিশ ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট পাঠানোর জন্য শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। পরে যশোর সেনানিবাসে যোগাযোগ করে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট পাঠানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে রোববার সন্ধ্যায় যশোর সেনানিবাসের একটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে। সূত্রের তথ্যমতে, সেনানিবাস থেকে একজন ওয়ারেন্ট অফিসারের নেতৃত্বে একটি টিম সোমবার সকালে মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেই টিম আজকের এই অভিযান পরিচালনা করে।
মাথাভাঙা নদী পাড়ের বাসিন্দা বৃদ্ধ জুলেখা খাতুন বলেন,বাবা এটা এতো বিকট শব্দে বিষ্ফোরণ হয়েছে যে আমার মাটির ঘরের দুটি জ্বানলা খুলে পড়ে গেছে। আর ঘর বাড়ি সব কাপছিলো।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজুল হক বলেন,আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেখেছি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা এমন মাইন বিভিন্ন জাইগাই পুতে রাখতো। সেগুলো এমন ভাবে মাটির নিচে পুতে রাখা হতো সেগুলো দেখে বোঝার উপাই ছিলো না। এক একটি ছোট মাইন মানেই এক একটি প্রান। আমাদের বামন্দী এলাকার একজন এই ছোট মাইন বিষ্ফোরণে পা ছিন্ন বিছন্ন হয়ে মারা গিয়েছিলো। আর বড় আকারের মাইন গুলো যুদ্ধ ট্রাংক ধ্বংসের জন্য ব্যাবহার হতো। আজকের এই মাইন বিষ্ফোরণ আবার একাত্তরের কথা মনে করিয়ে দিলো।
বামন্দী গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন,স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মেলেটারির পেতে রাখা মিনি মাইনে আমার বাবার পা ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করে ছিলো। আমি আমার অন্য চাচাদের কাছ থেকে শুনেছি এমন মিনি মাইন অনেক পুতে রেখে ছিলো এই অঞ্চলে।
গাংনী থানার ওসি (তদন্ত) শিমুল কুমার জানান, গত ৮ আগস্ট শনিবার সকালে বেতবাড়িয়া গ্রামে মাইনসদৃশ বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে পুরো এলাকা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। পরে মাইন নিষ্ক্রিয়কারী দলকে জানানো হলে আজ যশোর থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। মাটি খুঁড়ে একে একে ১৭টি অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন ও ৭৩টি অ্যান্টি-পার্সন মাইন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মাইনগুলো গ্রামের পার্শ্ববর্তী টকটি নদীর পাড়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
জানা গেছে, বেতবাড়িয়া গ্রামের মৃত আবুল মালিথার ছেলে কাদা মালিথা নিজ জমিতে কৃষিকাজ করছিলেন। এ সময় তিনি মাটির নিচে ধাতব আকৃতির কয়েকটি বস্তু দেখতে পান। পরে আরও খোঁড়াখুঁড়ি করলে একে একে ৫টি ল্যান্ডমাইনের খালি বক্স উদ্ধার হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। পরে স্থানীয়রা গাংনী থানায় খবর দিলে পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে এলাকাটি নিরাপত্তার আওতায় নেয়।
স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করে এলাকা ঘিরে রাখে।

