
সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কথা। অথচ সেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রেই অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ।
কোথাও নিয়মবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ, কোথাও শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে অর্থ দাবি, আবার কোথাও অনুমোদিত পদে না থেকেও হিসাব শাখা পরিচালনার অভিযোগ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকল্পের জনবল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, প্রশিক্ষণের গাড়ি নিয়ে গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায় যাতায়াত, কেনাকাটায় অসংগতি, কাঁচামাল কেনার নামে অর্থ ব্যয়ের হিসাব এবং সরকারি সম্পদ বাসায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।
এসব অভিযোগ ঝিনাইদহ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১১ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘ এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণের মান, প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা ব্যয়ের হিসাব থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। কেউ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসামগ্রী পাননি, কেউ গাড়ি চালানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি, আবার কেউ নির্ধারিত ভাতা ও অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন।
নির্দেশ উপেক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ: টিটিসি প্রাঙ্গণে নিয়ম না মেনে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ নির্মাণকাজের জন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক অর্থ দাবি করা হয়েছিল। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট হেড অফিস থেকে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন, অর্থের উৎস এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কতটা মানা হয়েছে, তা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অনুমোদিত পদ নেই, তবু হিসাব শাখার দায়িত্বে হাবিবুর: প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসাব বিভাগ। অথচ অভিযোগ রয়েছে, হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হিসাব শাখার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যিনি রাজস্ব বা প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর কোনো পদে নেই বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
সরকারি কর্মী দিয়ে দোকানের কাজ, প্রশিক্ষণের গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার: টিটিসির নিরাপত্তাকর্মী জয় ও মালি আব্দুল হালিমকে তাঁদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে দোকান পরিচালনার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি বেতনভুক্ত কর্মীরা যদি ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন কে?
একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই গাড়িতে করে মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায় যাতায়াত করেন তিনি।
প্রকল্পের জনবল ও অর্থ নিয়ে প্রশ্ন: প্রকল্পের কর্মীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে সম্মানীর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অধ্যক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্পের কর্মীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।
পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন পদে তাঁর আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের দাবি, অধ্যক্ষের ভাগ্নে ফয়সাল ও খাইরুল, নিজ এলাকার আব্দুল্লাহ হক এবং তাঁর ভাইয়ের মেয়েকে হাউসকিপিংয়ে রাখা হয়েছে।
ভাউচারে কাঁচামাল কেনা, বাস্তবে কোথায় সেই মালামাল? টিটিসির কেনাকাটার হিসাব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, ভাউচারে কাঁচামাল কেনার কথা দেখিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ মালামাল প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় না। স্টোরকিপার রুহুল আমিনের বিরুদ্ধেও নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন অফিস করেন।
এ বিষয়ে রুহুল আমিন বলেন, ‘১০০% অফিস করি, এটা বলছি না। নানাবিধ সমস্যায় মাঝে মাঝে অফিসে আসতে পারি না। বাসায় ছোট বাচ্চা আছে, যশোর থেকে যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। যেদিন যেতে পারি না, সেদিন অধ্যক্ষ রুস্তম আলীকে জানিয়ে দিই। অফিসে না যাওয়ার জন্য খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা না।’
কম্পিউটার ট্রেডে দক্ষ শিক্ষক নেই, পুরোনো যন্ত্রাংশে প্রশিক্ষণ: টিটিসির প্রশিক্ষণের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অভিযোগকারীদের দাবি, কম্পিউটার ট্রেডে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষক না থাকলেও কার্যক্রম চালু রয়েছে। এমনকি রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং ট্রেডের শিক্ষক সামছুল আলম খানকে দিয়ে কম্পিউটার ট্রেডের কার্যক্রম পরিচালনা করানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর কম্পিউটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সামছুল আলম খানকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।
কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল কোর্সের শিক্ষার্থী সবুজ আলী বলেন, ‘কম্পিউটার কোর্সে ঠিকমতো শিখতে পারিনি। কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশ খুবই নিম্নমানের ছিল, যা দিয়ে সব কাজ করা যেত না। ইলেকট্রিক্যালেও একই অবস্থা। যেসব যন্ত্রাংশ অনেক আগেই ফেলে দেওয়ার কথা, সেসব দিয়েই প্রশিক্ষণ ও কাজ করানো হতো। অনেক সময় প্র্যাকটিস করার মালামাল পেতাম না। এ বিষয়ে অধ্যক্ষকে বললে তিনি বাজেট নেই বলে উড়িয়ে দিতেন।’
এদিকে এম এ বাকি নামের এক ব্যক্তির দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কাগজপত্রে তিনি ইলেকট্রনিকস ট্রেডের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে চিফ ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
এ বিষয়ে জানতে এম এ বাকিকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘একটা ট্রেনিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।’
পিডিটি কোর্সে ২০০ টাকা ফি, প্রশিক্ষণার্থীর দাবি শুধু সনদ পেয়েছেন: বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গমনেচ্ছুক কর্মীদের জন্য প্রাক্-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা পিডিটি কোর্সেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের দাবি, এ কোর্সে ২০০ টাকা ফি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
অভিযোগ অনুযায়ী, ফি থেকে ১৩০ টাকা নোটবুক, কলম, সনদপত্রসহ প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করার কথা। বাকি ৭০ টাকা প্রশিক্ষণকক্ষের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, অ্যামপ্লিফায়ার, প্রজেক্টর স্ক্রিন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো সুবিধা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহারের কথা রয়েছে। তবে প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সনদপত্র ছাড়া তাঁরা আর কিছুই পাননি।
তানজির আহমেদ নামে এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, ‘যে রুমে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়েছে, সেখানে অল্প জায়গা ছিল। ফলে অনেক প্রশিক্ষণার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আর যা যা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই পাইনি। শুধু একটা সার্টিফিকেট দিয়েছে।’
ড্রাইভিং কোর্সে গাড়ি চালানোর সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ: ড্রাইভিং কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদেরও অসন্তোষ রয়েছে। মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘প্রশিক্ষণ চলাকালে গাড়ি চালাতে চাইলে অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বিভিন্ন অজুহাত দেখাতেন। কখনো গাড়িতে তেল নেই, কখনো গাড়ি নষ্ট বলে জানানো হতো। বারবার অনুরোধ করেও তাঁরা পর্যাপ্ত সময় গাড়ি চালানোর সুযোগ পাননি।’
মেহেদী হাসানের আরও অভিযোগ, ক্লাসে উপস্থিত থাকার পরও অনেক শিক্ষার্থীকে হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে।
২০২১ সালের অর্থ ফেরত ও ভাতা নিয়েও অভিযোগ: ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের শিক্ষার্থী মো. তামিম আহমেদ অভিযোগ করেন, ‘২০২১ সালে এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত অর্থ ফেরত দেওয়া নিয়ে তাঁদের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে।’ তাঁর দাবি, ওই ব্যাচে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও কেউ টাকা ফেরত পাননি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তামিম আহমেদের ভাষ্য, ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা প্রত্যাশিত অর্থ নিয়মিত পাননি।
শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও বদলি নিয়েও অভিযোগ: প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ট্রেডের শিক্ষকরা নিয়মিত নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করেন না এবং যথাযথভাবে ক্লাস নেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া অধ্যক্ষের কথা না শুনলে বা তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের জাহিদকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে জানতে জাহিদকে ফোন করা হলে তিনি পরে ফোন করবেন বলে কল কেটে দেন।
দুদকের মামলা ও বিভাগীয় তদন্তের দাবি: অভিযোগকারীদের দাবি, অধ্যক্ষ রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে ঝিনাইদহ টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুস্তম আলী বলেন, ‘অভিযোগ থাকলেই তো সত্যি হয় না। আপনি কাল অফিসে আসেন, বিস্তারিত কথা হবে।’
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

