
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলীয়করণ, হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে মেহেরপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জেলা শাখা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জামায়াতে ইসলামী মেহেরপুর জেলা শাখার কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হুসাইন। বক্তব্যে তিনি বলেন, সম্প্রতি মেহেরপুরে ২২ জন সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মনোনীত ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বক্তব্যে মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলার ২২টি ডিলারশিপের তালিকা তুলে ধরে সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা ডিলারশিপ না পাওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি নাজমুল হক লিটনের বরাত দিয়ে বলা হয়, তাঁর ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করলেও ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে কুতুবপুরে উপজেলা বিএনপির সভাপতির ভাই ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আনোয়ারুল হক কালুর বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়, যেখানে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মনোনীত ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগেও দলীয়করণের অভিযোগ করেন জামায়াত নেতারা। তাঁদের দাবি, প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করা হলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একইভাবে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদানের তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানানো হয়।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালকে কেন্দ্র করে দালালচক্র, রোগী হয়রানি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অবৈধ অর্থ আদায় এবং চিকিৎসাসেবায় সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। বক্তব্যে বলা হয়, হাসপাতাল থেকে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর নজরদারির দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া হাসপাতালের একটি দালাল আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মেহেরপুরে মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব অপরাধের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দলীয় পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে জামায়াত নেতারা বলেন, গত ২৭ অক্টোবর মেহেরপুর শহরের বিএডিসির সামনে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারিকুল ইসলাম নামে এক পরিবহন ও সবজি লোডিং ব্যবসায়ীকে মারধর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ছাত্রদল নেতা সানি এবং সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ভাই যুবদল নেতা মিঠুনের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ করা হয়। আহত ব্যবসায়ীকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং একটি কথিত টর্চার সেলে ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি অনুষ্ঠান, উন্নয়ন কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সরকারি সেবা প্রদানে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
আগামীকাল শনিবার সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে খুলনাগামী লংমার্চের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য সমাপনী সমাবেশে মেহেরপুর জেলা থেকে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। দাবিগুলো হলো গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ।
এছাড়া সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে বৈষম্য বন্ধ, হাসপাতালের দালালচক্র ও সিন্ডিকেট নির্মূল, কিশোর গ্যাং দমন, মাদক ও অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাসহ ১১ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দীন খান ও মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হুদা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খান বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সংসদের ভেতরে আমরা বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হলেও সংসদের বাইরে আমরা জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করুক, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। তবে জনগণের অধিকারও বাস্তবায়ন করতে হবে। সার, তেল ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে নিশ্চিত করে সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করুক, এটাই আমাদের চাওয়া। তবে সরকারের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরালো ও গতিশীল হবে।
এছাড়াও এসময় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইকবাল হুসাইন, সদর উপজেলা আমির সোহেল রানা, পৌর আমির সোহেল রানা ডলার, মুজিবনগর উপজেলা আমির খান জাহান আলী, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা সভাপতি আব্দুর রউফ মুকুল, মুজিবনগর উপজেলা সেক্রেটারি মো. খাইরুল বাশারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

