
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাকি আর মাত্র এক মাস। নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী, ভোটার সকলেই অপেক্ষা করছে একটি উৎসবের।
পুরুষ ভোটারদেরও পাশাপাশি নারী ভোটাররাও মুখিয়ে আছেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।
কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জহুরা তাজউদ্দিন নামের এক নারী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ভোট করেছিলেন।
কিন্তু তিনি মেহেরপুরের স্থানীয় ছিলেন না। তিনি ছিলেন জাতীয় নেতা সৈয়দ তাজ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী। এছাড়া ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেলিনা আক্তার বাণুকে মেহেরপুর এলাকার সংরক্ষিন নারী সদস্য করা হয়। এর আগে বা পরে আর কোন নারী প্রার্থী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করেননি।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থ্যান সৃষ্টি হয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সবক্ষেত্রে বৈষম্যহীন দেশ গড়ার অঙ্গিকার নিয়ে। অথচ দেশের সবচেয়ে বড় একটি নির্বাচনে মেহেরপুরের দুটি আসন থেকে নেই কোনো নারী প্রার্থী। নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার মত কোন নেত্রী কি রাজনৈতিক দলগুলো তৈরি করতে পারেনি, না কি নারীদের পিছনে রেখে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যে কারণ তার এখনো অজানা নারীদের কাছে।
মেহেরপুরের রাজনীতিতে বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াত এ দুটি দল মূল লড়াইয়ে মাঠে রয়েছে। দুটি দলেরই নারী সংগঠণ রয়েছে। যারা দলের জন্য তৃণমূল নারীদের কাছে, ভোটরদের কাছে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক লড়াইয়ে সবক্ষেত্রে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে কিন্তু প্রার্থীতার ক্ষেত্রে বৈষম্য রাখা হয়েছে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, জেলার তিন উপজেলায় দুটি সংসদ আসন। সদর ও মুজিবনগর মিলে মেহেরপুর—১ এবং গাংনী উপজেলা নিয়ে মেহেরপুর—২ গঠিত। মেহেরপুর —১ আসনে পুরুষ ভোটার ১৫৭৮৯০ , নারী ভোটার ১৫৯০৮২ । মেহেরপুর—২ আসনে পুরুষ ভোটার ১৩৫০৮৭, নারী ভোটার ১৩৫৬১৫ । দুটি আসনেই নারী ভোটার বেশি। নারী ভোটারদের ভোটেই নির্ধারিত হবে প্রার্থীদের ভাগ্য। অথচ নারী ভোটার বেশি হলেও নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা হয়নি এ জেলায়।
এ বিষয়ে কথা হয় নারী উদ্যোক্তা ও সাহিত্যিক সুখী ইসলামের সাথে, তিনি বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় অনেকেই মনে করেন রাজনীতি নারীদের জায়গা নয়। একজন নারী রাজনীতিতে এলে তার যোগ্যতার চেয়ে তার ব্যক্তিজীবন, চলাফেরা ও চারিত্রিক বিষয় বেশি আলোচনায় আসে। রাজনীতি মানেই সময়, ঝুঁকি ও সংঘাত। এই বাস্তবতায় অনেকের পরিবার নারীদের রাজনীতিতে আসতে নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও নিরাপত্তাহীনতাও রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয় বহন করা এবং সহিংস পরিবেশ মোকাবিলা করা অনেক নারীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যেও রয়েছে দলীয় মনোনয়নে বৈষম্য।’
সুখী ইসলাম আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত যাকে ‘জেতার সম্ভাবনাময়’ মনে করে, তাকেই প্রার্থী দেয়। নারী প্রার্থী কম মানে নারীরা অযোগ্য এমনটা কখনোই নয়। সমস্যা হলো আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, এখনো নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। যদি রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় মনোনয়নে নারীদের অগ্রাধিকার দেয় এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করে তাহলে তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।’
জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী সায়েদাতুন নেছা নয়ন বলেন, ‘রাজনীতি হচ্ছে কৌশলগত অবলম্বন ও বুদ্ধিবৃত্তির বিষয়। সে যায়গা থেকে আমরা নারীরা অনেক পিছিয়ে আছি। এর পাশাপাশি সামাজিক ও সাংসারিক পিছুটানের কারণের নারীরা রাজনীতি অংশ নিতে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছেন। তবে আমার দল এবং আমারা নেতারা আমাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। আমি আশাবাদি আগামীতে নারী সকল পযর্যায়ের নির্বাচনে সরাসরি অংশ গ্রহণ করবে।’
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রোমানা আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের প্রতি অবিচার করছে। পাঁচ শতাংশ রাজনীতির মাঠ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে পৌষ্য কোটা থেকে। শ্রম, মেধা এবং সংসারের পিছুটান ফেলে এখন অনেক নারীই রাজনীতিতে আসছেন। আমার দলই না কোনদলই নারীদের সেভাবে মূল্যায়ন করছে না। আমার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নারীদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছেন শুনেছি, আশা করি আগামীতের নারীরা নেতৃত্বে এগিয়ে আসবে।’
রোমানা আরও বলেন, ‘একজন পুরুষকে যেভাবে সামনে যায়গা করে দেওয়া হয়, নারীদের সেভাবে যায়গা করে দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে রাজনীতে নারীদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে।’
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘মহিলারা যেহেতু মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, সে হিসেবে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব গুরত্বপূর্ণ। তাদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন আছে তবে এটা বাড়ানো দরকার এবং প্রতিনিধিত্ব করাতে পারলে মহিলাদের অধিকার আদায় সহজ হবে।’
মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জাবেদ মাসুদ মিল্টন বলেন, ‘শুধু নারী নেতৃত্ব নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক কারণে অন্যান্য জেলার তুলনায় মেহেরপুর সব দিক দিয়েই পিছিয়ে আছি। আস্তে আস্তে সেগুলো আমাদের মেয়েরা কাটিয়ে উঠছে। এখন অনেকেই রাজনীতিতে এগিয়ে আসছে। আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কারের অন্যতম সংস্কার হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। আমরা সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
মেহেরপুর সরকারি কলেজের উপাধাক্ষ ও গবেষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘বৈষম্যহীন ও অন্তভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে হলে নারীদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য যায়গা করে দিতে হবে। আরপিও অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থীকে নেতৃত্ব করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এছাড়া গণতান্ত্রিক ও ভারসাম্যমূলক সমাজ গঠণ করা যাবে না।’
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুরের দুটি আসনে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দীতায় টিকে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে আপিল করে নতুন করে বৈধ হয়েছেন এনসিপি প্রার্থী ইঞ্জি. সোহেল রানা।

