
পবিত্র মাহে রমজানের শেষ মুহূর্তে এসে জমজমাট হয়ে উঠেছে মেহেরপুরের ঈদ বাজার। রমজানের শুরুর দিকে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি কম থাকলেও এখন বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানপাটে দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। দোকানের ভেতরের আনাচে-কানাচে ক্রেতাদের ভিড়। এমন অবস্থায় স্তূপ করা কাপড়ের মাঝ থেকে নিজেদের পছন্দের পোশাক বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
কিছু কিছু পোশাকের দাম রাখা হচ্ছে আকাশচুম্বি। ফলে সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। তবুও দরদাম শেষে অনেকেই পরিবারের জন্য নতুন পোশাক, স্যান্ডেল-জুতা ও নানা ধরনের জুয়েলারি কিনে বাড়ি ফিরছেন।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে গাঢ় রঙের পোশাক বেশ জনপ্রিয়। জরি, সুতা, পুঁথি, চুমকি ও কুন্দন দিয়ে নকশা করা সালোয়ার-কামিজের বিক্রিও ভালো।
বাজারে সারারা, গারারা, গ্রাউন্ড ফ্রক, কুর্তি, লেহেঙ্গা, ওয়ান পিস, টু-পিস ও থ্রি-পিসসহ নানা ধরনের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতি বছরের মতো এবারও পোশাকের দাম বেড়েছে। তবে মানের দিক দিয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন নামের পোশাক ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫/৬ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার শুধু নাম পরিবর্তন করে সেগুলোই আরও বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা।
মুজিবনগর থেকে বাজার করতে আসা আব্দুর সাত্তার বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও আমি মেহেরপুরেই বাজার করতে এসেছি। আমাদের বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করতে পেরে ভালো লাগছে। ঈদের জন্য পরিবারের সব কেনাকাটা শেষ করেছি।”
মেহেরপুর সদর উপজেলার বুড়িপোতা গ্রামের পল্লী চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম বলেন, “পরিবার নিয়ে বাজারে এসেছি। কিন্তু পোশাকের দাম অনেক বেশি। দুইটার জায়গায় একটা কিনতে হচ্ছে। কারও জন্য কিনতে পারছি, আবার কারও জন্য পারছি না। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে কষ্ট হচ্ছে।”
শহরের কালাচাঁদপুর এলাকার অটোচালক কিতাব আলী বলেন, “বাজারে পছন্দসই অনেক পোশাক রয়েছে। তবে ডিজাইনের কারণে দাম অনেক বেশি। বড়দের জন্য দেশি পোশাক কিনব, আর সন্তানদের জন্য তাদের পছন্দমতো পোশাক কিনতেই হবে।”
মুজিবনগর উপজেলার তারানগর গ্রামের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী লাভলি ইয়াসমিন বলেন, “এখন শুধু পোশাক নয়, তার সঙ্গে মিলিয়ে স্যান্ডেল, জুতা, জুয়েলারি ও কসমেটিকও কিনতে হচ্ছে। বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি, তাই দরদাম করে কিনতে হচ্ছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করলে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হতো না।”
ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান উপলক্ষে বেচাকেনা ভালো হলেও আরও বাড়ার আশা করছেন তারা। তবে দিনের বেলায় ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও ইফতারের পর থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় অনেকেই গ্রাম থেকে রাতে শহরে বাজার করতে আসছেন না।
স্মার্ট ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী আরাফাত রহমান বলেন, “এ বছর বেচাকেনা খুবই ভালো। তবে দিনের তুলনায় রাতে একটু কম। রাস্তাঘাটের অবস্থার কারণে কিছুটা ভয় থাকে, কিন্তু দিনের বেলায় আল্লাহর রহমতে ব্যবসা ভালো।”
নতুন শাহ বস্ত্রালয়ের স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর সাহা দেবু বলেন, “রমজানের কারণে বিক্রি ভালো। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছি।”
শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের দোকান আগারগাঁও বস্ত্রালয়ের স্বত্বাধিকারী মোহন কুমার চৌধুরী জানান, “এবার ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বিক্রিও বেশি হচ্ছে।”
এপেক্স শোরুমের ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন ও বাটা শোরুমের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পণ্য নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়। এখানে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
পোশাক ব্যবসায়ী অমি ফ্যাশনের মালিক ছানোয়ার হোসেন বলেন, “বেশি দামে পোশাক কিনে বাজারজাত করতে হচ্ছে বলেই এবার দাম কিছুটা বেশি। তবে বাজারে পছন্দের পোশাকের কোনো অভাব নেই।”
বড়বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও জামান বস্ত্রালয়ের মালিক মনিরুজ্জামান দিপু বলেন, “এবারের রমজান ব্যবসার জন্য ভালো যাচ্ছে। মেয়েরা গরমের কারণে হালকা রঙের পোশাক বেশি কিনছে, আর শিশু-কিশোররা গাঢ় রঙের পোশাক পছন্দ করছে। তবে আগে গ্রামের মানুষ রাতেও বাজার করতে আসত, এখন রাতে গ্রাহক কমে গেছে। আইনশৃঙ্খলার কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে।”
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় জানান, “রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে নিরাপদ কেনাকাটার পরিবেশ নিশ্চিত করতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।”

