
একদা হযরত আলী (রা:) জুমআর খুৎবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় খারিজি দলের কয়েকজন দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করল—
“ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ”
অর্থাৎ, “বিধান একমাত্র আল্লাহর।”
উদ্দেশ্য : রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা আলীর হুকুম না মানা।
বাক্যটি ছিল আল-কুরআনের আয়াত, অর্থাৎ কথাটি সত্য। কিন্তু সেই মুহূর্তে এর পেছনে যে উদ্দেশ্য কাজ করছিল, সেটি ছিল রাজনৈতিক বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। তারা মূলত হযরত আলী (রা.)-এর নেতৃত্ব অস্বীকার করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাচ্ছিল।
বিচক্ষণ খলিফা হযরত আলী (রা.) তখন জবাবে বলেছিলেন—
“কালিমাতু হাক্কিন উরিদা বিহাল বাতিল।”
অর্থাৎ, “কথাটি সত্য, কিন্তু এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য সাধন করা হচ্ছে।”
তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন— সত্য বাক্যও কখনো কখনো ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ধর্ম, নীতি কিংবা ন্যায়ের কথা মুখে বললেই উদ্দেশ্য পবিত্র হয়ে যায় না; সেই কথার পেছনের অভিপ্রায়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এই গ্রুপটি মূলত ছিল হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর খলিফা হওয়ার চরম বিরোধী। বিচক্ষণ খলিফা হযরত আলী রা. তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই তিনি জুম্মার খুৎবারত অবস্থাতেই তাদের জবাবে বললেন, তোমরা যা বলেছো তা আল কুরআনের আয়াত। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তোমরা আমাকে উৎখাত করে রাষ্ট্রে বিশৃংখল অবস্থা সৃষ্টি করতে চাও। তোমাদের এই অসৎ উদ্দেশ্য সফল হবে না।
“বিধান একমাত্র আল্লাহ্ তা’য়ালারই” কথাটা সত্য, তোমাদের মতলবটা খারাপ। আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর ঘর মসজিদে আল্লাহর যিকির করতে কখনো বাঁধা দিব না এবং তোমাদেরকে গনিমতের সম্পদ গ্রহণ থেকেও নিষেধ করব না। তোমরা আমাদের সাথে থাকবে এবং আমরা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব না, না তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধে উপনীত হবে।
পরবর্তীতে তিনি তাদেরকে শহর থেকে বহিস্কার করেছিলেন। এখনো পর্যন্ত এ ধরনের সব অসৎ লোকদের অপপ্রচার চলছে ইসলাম ও কুরআন- হাদীসকে ব্যবহার করেই। ধর্মের অপ-ব্যবহার এখনো অব্যাহত আছে।
সময় বদলেছে, কিন্তু সত্যকে ঢাল বা অপব্যবহারের করে স্বার্থ হাসিলের প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি। ধর্ম, নৈতিকতা কিংবা মানবতার কথা বলে অনেক সময় ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা দেখা যায়।
আমাদের সমাজেও এর নানা উদাহরণ চোখে পড়ে। কখনো ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা হয়, কখনো রাজনৈতিক প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয়কে অতিরিক্তভাবে সামনে আনা হয়, আবার কখনো ব্যবসায়িক স্বার্থে ধর্মীয় শব্দ বা প্রতীককে বিপণনের অংশ বানানো হয়।
উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা দিই।
আমাদের দেশে ভিক্ষাবৃত্তিতে ধর্মের অপব্যবহার হয়, খুলে বলি কিভাবে হয়।
আমাদের দেশে ভিক্ষুকরা দেখবেন নানানরুপে ভিক্ষা করে, ঢাকার মোড়ে মোড়ে দেখবেন ভিক্ষুক বিভিন্ন অসহায় বেশে ভিক্ষা করছে, কেউ পঙ্গুত্ব বেশে, শিশু কোলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে, সবচেয়ে বেশী ধর্মীয় বেশে। ধর্মীয় বেশে প্রথমে হয়তোবা কালেমা পড়ে বা কোরআনের কিছু আয়াত পড়ে ভিক্ষা করে। ধর্মের কিছু প্রচারণা করে শেষে হাত পাতে, যাতে মানূষের ভিতর ভয় বা সিম্প্যাথি আদায় করে স্বার্থ হাসিল করা যায়। তারা ভিক্ষার আগে যা বলে সঠিক বলে কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্ম প্রচার নয়, ভিক্ষা পাওয়ার জন্য তারা এইভাবে ধর্মের নাম নিয়ে ভিক্ষা করে।
এখানে মূল প্রশ্ন ধর্ম নয়; প্রশ্ন হচ্ছে উদ্দেশ্য। কেউ যদি আন্তরিক বিশ্বাস থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করেন, সেটি অবশ্যই সম্মানের বিষয়। কিন্তু যখন ধর্ম বা নৈতিকতার ভাষা কেবল মানুষের আবেগ প্রভাবিত করার উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে— এটি কি সত্যিকার আদর্শ, নাকি কৌশল?
রাজনীতিতেও আমরা প্রায়ই দেখি, নির্বাচনের সময় অনেক নেতা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ টুপি পরেন, কেউ ধর্মীয় বক্তব্য বেশি দেন, কেউ নিজেকে অতিরিক্ত ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকেও হতে পারে, আবার জনসমর্থন অর্জনের কৌশলও হতে পারে। পার্থক্যটা নির্ভর করে কাজ ও চরিত্রের ধারাবাহিকতার ওপর।
ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। কোনো পণ্যের সঙ্গে “হালাল”, “বিশুদ্ধ”, “ধর্মসম্মত” ইত্যাদি শব্দ যুক্ত করা যদি সত্যিকার মান ও নীতির প্রতিফলন হয়, তবে সেটি ইতিবাচক। কিন্তু যদি শুধু বাজার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়, তবে সেখানে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ব্যবসায়ও ধর্মের ব্যবহার হয় সিম্প্যাথি নেয়ার জন্য। যেখানে যে ধর্ম অনুসারী সংখ্যা গুরু সেখানে সেই ধর্মকে পুজিকে ব্যবহার করার টেন্ডেনসি থাকে। সাবানটা যখন বাজার পাচ্ছিলো না, যুক্ত হলো ১০০% হালাল। আর ব্যবসায় ঠেকায় কে? এখানে মতলব কি ব্যবসা নাকি উদ্দেশ্য ধর্ম ঠিক রাখা। উদ্দেশ্য যদি সঠিক থাকে, তাহলে ঠিক আছে আর যদি মতলব থাকে ব্যবসা, প্রশ্ন তখনই উঠে।
এমনকি তথাকথিত অনেক সমাজসেবক বা বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা মুখে খুব বড় বড় দেশপ্রেমের কথা বলেন, জনসেবার বুলি আওড়ান। কিন্তু দিনশেষে তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে নিজের ক্যারিয়ার গড়া, ক্ষমতা পাওয়া বা জনপ্রতিনিধি হওয়া। তাদের কাছে দেশপ্রেমের মূল্যবোধ শুধুই নিজের স্বার্থের সিঁড়ি।
সত্যকে ভালোবাসা যেমন ঈমানের দাবি, তেমনি সত্যের নামে অসৎ উদ্দেশ্য আড়াল করাও বড় বিপদ। তাই শুধু কথার সৌন্দর্য নয়, কথার পেছনের নিয়ত, চরিত্র ও কর্ম— সবকিছুর বিচার করাই প্রজ্ঞার পরিচয়। হযরত আলী (রা.)-এর শিক্ষা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— “কথা সত্য হতে পারে, কিন্তু মতলব খারাপও হতে পারে।”
লেখক: বিএসএস ( সম্মান)
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

