
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের অন্যতম খাত বাঁশ ও বেত শিল্প। পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং দেশীয় সংস্কৃতির ধারক এই শিল্প এখন নতুন করে সম্ভাবনার আলো দেখছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
এরই অংশ হিসেবে বিসিক জেলা কার্যালয়, কুষ্টিয়ার উদ্যোগে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি দাসপাড়া, মিরপুর উপজেলার আবুরি দাসপাড়া, মালিহাদ দাসপাড়া এবং খন্দকবাড়িয়া এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এ সময় ১০২ জন বাঁশ ও বেত পণ্য উৎপাদনকারী কুটির শিল্প উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করা হয়।
পরিদর্শনকালে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক সোহেল রানা। তিনি সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য বিসিকের সেবাসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
উপ-মহাব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, “বাঁশ ও বেত শিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অংশ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক নকশা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বিসিকের লক্ষ্য কুটির শিল্পকে বাণিজ্যিকভাবে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।”
সরেজমিনে কথা বলে জানা যায়, কুষ্টিয়ার এসব এলাকার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের তৈরি ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, কুলা, ফুলের টব, শোপিস, আসবাবপত্রসহ নানা ধরনের হস্তশিল্প স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও বিক্রি হয়। তবে আধুনিক নকশা, পর্যাপ্ত পুঁজি এবং বাজার সম্প্রসারণের অভাবে অনেক উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা বড় করতে পারছেন না।
স্থানীয় বাঁশ ও বেত শিল্পীরা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আধুনিক ডিজাইন জানা না থাকায় বাজারে নতুন ধরনের পণ্য আনতে পারছি না। বিসিক যদি মাঠ পর্যায়ে বিনা ফি-তে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক মানের শৌখিন ও ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি করতে পারব।”
তারা আরও বলেন, “শিল্প সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ বা অনুদান অত্যন্ত প্রয়োজন। পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় অনেক সময় বড় অর্ডার পেলেও কাজ করা সম্ভব হয় না। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং তরুণ প্রজন্মও এই শিল্পে আগ্রহী হবে।”
কারুযোগ এর নির্বাহী পরিচালক দেওয়ান আক্তারুজ্জামান বলেন, বাঁশ ও বেত শিল্প পরিবেশবান্ধব হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতের সম্ভাবনাও দিন দিন উজ্জ্বল হচ্ছে। ডিজাইন উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কুষ্টিয়ার বাঁশ ও বেত শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
বিসিক জেলা কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আশানুজ্জামান মুকুল বলেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প শুধু গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে না, বরং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাঁশ ও বেত শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
কুষ্টিয়ার ১০২ জন বাঁশ ও বেত শিল্প উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বৃহত্তর শিল্প উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলেও জানান তিনি।

