
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স এখন নিজেই যেন ধ্বংসের স্মৃতি বহন করছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাতের আঁধারে চালানো ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলোর সংস্কার।
২০২৫ সালে পূর্ণ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে একদিকে নষ্ট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো, অন্যদিকে পর্যটক কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন কমপ্লেক্সকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়। সেদিনই পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। স্বাধীনতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত মুজিবনগর তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
এই ঐতিহাসিক স্থানকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে মুজিবনগরে গড়ে তোলা হয় স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স।
বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগে ধাপে ধাপে এর অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৯৯ সালে কমপ্লেক্সের মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রায় ৬৬ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠে বিশাল এই কমপ্লেক্স।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের চিত্র এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের নানা অধ্যায় তুলে ধরতে এখানে নির্মাণ করা হয় তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য। ফলে ধীরে ধীরে মুজিবনগর পরিণত হয় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটনকেন্দ্রে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাতেই নেমে আসে ধ্বংসযজ্ঞ। রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তদের হামলায় কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার চিত্র তুলে ধরা ভাস্কর্য।
ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা।
শুধু ভাঙচুরেই থেমে থাকেনি দুর্বৃত্তরা। কমপ্লেক্স থেকে লাইট, সিসি ক্যামেরা, ব্যাটারি, পানির পাম্পসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত এখনো স্পষ্ট। কোনো ভাস্কর্যের হাত নেই, কোনোটি হারিয়েছে পা। কোথাও মাটিতে পড়ে আছে ভাস্কর্যের মাথা, কোথাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে নাক-মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থানে আগাছা ও অপরিচ্ছন্নতার ছাপও দেখা গেছে।
দর্শনার্থীরা বলছেন, মুজিবনগর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। অথচ ধ্বংসস্তূপের বর্তমান চিত্র দেখে হতাশ তারা। দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে এর আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে মেহেরপুরের মুজিবনগর আম্রকাননে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীর প্রতীক বলেছিলেন, মুজিবনগরের ইতিহাস জাতির গর্ব, যা চিরকাল অম্লান থাকবে। ইতিহাস যাতে কোনোভাবে বিকৃত না হয়, সে জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ওই অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা আরও জানান, মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো পূর্ণ সংস্কার করা হবে।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির পরও পেরিয়ে গেছে এক বছরের বেশি সময়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভাঙচুরের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলোর দৃশ্যমান সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। তাদের প্রশ্ন, কবে সংস্কার হবে স্বাধীনতার এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর?
সংস্কার না হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে মুজিবনগরের পর্যটনেও। একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা আসতেন। বিশেষ করে ছুটির দিন ও জাতীয় দিবসগুলোতে কমপ্লেক্স এলাকায় থাকত মানুষের ব্যাপক ভিড়। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ভাঙাচোরা পরিবেশ দেখে অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পর্যটক কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কমপ্লেক্সের আশপাশের হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও বিভিন্ন ছোট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের ভিড়ে বেচাকেনা বাড়ত। এখন অনেক সময় দোকান খুলে বসে থাকলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া যায় না। এতে আয় কমে গেছে, অথচ দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য খরচ আগের মতোই রয়েছে।
এক ব্যবসায়ী বলেন, মুজিবনগর কমপ্লেক্সে পর্যটক কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব তাদের ব্যবসায় পড়েছে। দ্রুত সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশ সুন্দর করা হলে পর্যটক বাড়বে এবং স্থানীয় ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, মুজিবনগর কমপ্লেক্সকে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলো সংস্কারের পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক তথ্যকেন্দ্র, উন্নত আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে কমপ্লেক্সটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আবারও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে মুজিবনগর। এতে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে মুজিবনগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে।
সংস্কারের অগ্রগতি জানতে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে সংস্কারকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা কিংবা এ বিষয়ে সরকারি পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যে মুজিবনগরের আম্রকাননে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল, যে স্থান স্বাধীনতার ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সাক্ষী, সেই মুজিবনগর আজ নিজেই বহন করছে ধ্বংসের ক্ষত। কয়েক দশকের নির্মাণ ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স এখন সংস্কারের অপেক্ষায়।
প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু বাস্তবায়নের অপেক্ষা শেষ হয়নি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আর অবহেলা নয়, দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হবে মুজিবনগরের হারানো সৌন্দর্য। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন যেন ধ্বংসস্তূপ হয়ে না থাকে, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে ওঠে স্বাধীনতার গৌরবময় ইতিহাস জানার জীবন্ত পাঠশালা।
তবে সংস্কার নিয়ে আশার কথা জানিয়েছেন মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়। তিনি বলেন, ‘মুজিবনগর কমপ্লেক্সের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদাও পাঠানো হয়েছে। নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

