
স্বাধীনতার পুণ্যভূমি মুজিবনগরের জেলা মেহেরপুর। এ জেলার ফুটবল ইতিহাসের উজ্জ্বল এক নাম মাসুদ করিম ধলস। বয়সের ভারে মাঠ থেকে দূরে সরে গেলেও ফুটবল এখনও তার ধ্যান-জ্ঞান। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই যেন নতুন করে জেগে ওঠেন তিনি। তার বিশ্বাস, একদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাও উড়বে ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে।
পঞ্চাশের দশকে মেহেরপুরে জন্ম নেওয়া ধলসের শৈশব কেটেছে ফুটবলের সঙ্গে। প্রথমে স্থানীয় টাউন ক্লাবের পক্ষে ১৯৭৪ থেকে ৭৬ পর্যন্ত খেলেছেন। পরে ৯২ পর্যন্ত খেলেছেন স্থানীয় টাউন ক্লাবের হয়ে। ধলস গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে বল ঠেকানোর মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের আনন্দ।
পরে কিংবদন্তি গোলরক্ষক শহিদুর রহমান সান্টুর কাছে গোলকিপিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন। সেই প্রশিক্ষণই তাকে নিয়ে যায় দেশের ফুটবলের বড় মঞ্চে। বয়সের ভারে মাঠ থেকে সরে এসেছেন ঢের আগেই। কিন্তু ফুটবল তাকে ছাড়েনি। টেলিভিশনের পর্দায় যখন বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আবারও জেগে ওঠেন মেহেরপুরের এক সময়ের দাপুটে গোলরক্ষক মাসুদ করিম ধলস। স্মৃতির মাঠে ফিরে যান তিনি, যেখানে এখনও ছুটে বেড়ায় তরুণ এক গোলরক্ষক, দুই হাতে বল জাপটে ধরে রক্ষা করছে নিজের দলকে।
কিংবদন্তি গোলরক্ষক শহিদুর রহমান সান্টুর কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া এই ফুটবলার আশির দশকে চলন্তিকা ক্রীড়া চক্রের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। খেলেছেন ঢাকা ফুটবল লীগ, চিটাগাং মোহামেডান, চিটাগাং মিল, কুষ্টিয়া সুগার মিলস, ঈশ্বরদী পেপার মিল ও মালিবাগ ক্রীড়া চক্রের মতো নামকরা দলে।
আশির দশকে চলন্তিকা ক্রীড়া চক্রের ট্রায়ালে সুযোগ পান ধলস। প্রথম ম্যাচেই টাইব্রেকারে দলের জয় এনে দিয়ে নজর কাড়েন। অসাধারণ গ্রিপিং, দুর্দান্ত ডাইভ এবং নিখুঁত পজিশন সেন্সের কারণে দ্রুতই দলের অপরিহার্য গোলরক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি।
স্মৃতির ঝাঁপি খুললে এখনও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বহু ঘটনা। ঢাকা লীগের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ, মোহামেডানের বিপক্ষে ড্র করা ম্যাচের উত্তেজনা, কিংবা খেলা শেষে সমর্থকদের রোষানলে পড়ে গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় ক্লাবে ফেরার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সবই যেন কালকের ঘটনা। তিনি বলেন, চলন্তিকা ক্রীড়া চক্রের হয়ে ঢাকা লীগের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ এখনও ভুলতে পারিনি।
তবে অতীতের স্মৃতির চেয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নই তাকে বেশি আলোড়িত করে। তার বিশ্বাস, একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে জায়গা করে নেবে। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলে যাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি। হামজা চৌধুরী, ফাহমিদুল ইসলাম, তারিক কাজী, ফারহান আলী ওয়াহিদ, রায়ান আলী ওয়াহিদ, জামাল ভুঁইয়া, শোমিত শোম, আনোয়ার উদ্দিন, কাভান সুলিভান, কুইন সুলিভান, রোনান সুলিভান ও কিউবা মিচেলের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার লিগ ও জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত। ধলসের মতে, তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিভাকে মূল্যায়ন করে একটি শক্তিশালী জাতীয় ফুটবল কমিটি গঠন করা উচিত।
বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের পূর্বাভাসও দিয়েছেন ধলস। তার মতে, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও স্পেন এই তিন দলের মধ্য থেকেই দুটি দল ফাইনালে উঠবে। বর্তমান ফুটবলে এদের ধারাবাহিকতা, কৌশল আর অভিজ্ঞতা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে।
বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠে জমে ওঠে আক্ষেপ। ধলস মনে করেন, জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রক্ষণভাগে। গোলরক্ষক ও ডিফেন্সের আধুনিক প্রশিক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রতি।
তিনি বলেন, নারী ফুটবল দলের সাফল্যের একটা শক্ত ভিত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে বিরোধের কারণে মাসুরা পারভিন, কৃষ্ণা রানী সরকার, সানজিদা আক্তার ও সুমাইয়া আক্তারদের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারদের মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। এর খেসারত দল তথা দেশকেই দিতে হচ্ছে। দেশের ফুটবলের স্বার্থে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।
ফুটবলের বর্তমান চিত্র তাকে ব্যথিত করে। একসময় যে মেহেরপুরের মাঠগুলো বিকেল হলেই খেলোয়াড় আর দর্শকে মুখর থাকত, এখন সেখানে অনেক সময়ই নীরবতা। ঘাস আছে, গোলপোস্ট আছে, কিন্তু নেই সেই ছুটে চলা ফুটবল।
ব্যক্তিগত জীবনেও একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে তার। আক্ষেপের সুরে বলেন, আমার পরিবারের কেউ ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়নি। আমি চেয়েছিলাম নতুন প্রজন্মের কেউ একজন অন্তত এই খেলাটাকে বুকে ধারণ করুক। সেটা আর হলো না।
তবু হতাশার ভেতরেও স্বপ্ন দেখতে ভুলে যান না ধলস। বয়স তাকে ক্লান্ত করেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে নয়। বিশ্বকাপ শুরু হলে এবারও তিনি বসবেন নিজের বাড়ির টেলিভিশনের সামনে। পাশে থাকবেন তার সমকালের ফুটবলপ্রেমী বন্ধুরা। হয়তো খেলা দেখতে দেখতে ফিরে আসবে পুরোনো দিনের গল্প, মাঠের স্মৃতি, জয়ের উল্লাস আর হারানোর বেদনা।
মেহেরপুরের নিস্তব্ধ নিজ ঘরে জ্বলে টেলিভিশনের আলো। আর সেই আলোয় এক প্রবীণ গোলরক্ষকের চোখে ভেসে উঠছে সবুজ মাঠ, সাদা বল আর এক অমলিন স্বপ্ন- বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে খেলবে। তার বিশ্বাস, স্বপ্ন দেখার মানুষ যতদিন থাকবে, বাংলাদেশের ফুটবলও ততদিন এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে।

