
শিশু জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠে বাবা ও মায়ের ভালোবাসা ও নিরাপত্তার ছায়ায়। পরিবারই শিশুর মানসিক বিকাশ, আচরণগত গঠন ও আত্মপরিচয়ের এক অমূল্য ভিত্তি।কিন্তু যখন এই পরিবারের দুই স্তম্ভ বাবা ও মা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তখন শিশুটির সেই নির্ভরতার জায়গা ভেঙে পড়ে। বিচ্ছেদ একটি শিশুর শারীরিক ক্ষতি না করলেও, তার নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের জায়গায় গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের ফলে সন্তানের মানসিক স্থিতিশীলতা ভেঙে যায়। শিশুটি হঠাৎ করেই দুটি ভালবাসার মানুষকে আলাদা অবস্থানে দেখে। অনেক সময় সে নিজেকেই দায়ী করে ফেলে এই বিচ্ছেদের জন্য। তার মনে এক ধরনের অপরাধ বোধ তৈরি হয়। যা হতাশা, দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে পরিণত হতে পারে।শিশুর সামাজিকীকরণেও এর প্রভাব পড়ে। সন্তান বাবা-মায়ের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসরণ করেই অনেক কিছু শেখে। পরিবার তার সামাজিক আচরণের প্রথম বিদ্যালয়। সেই পরিবেশ হঠাৎ ভেঙে গেলে শিশুর স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
শিশুর সামাজিক বিকাশে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ অনেক সময় সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিকতা তৈরি করে। সে হয়তো বন্ধুদের এড়িয়ে চলে, একা থাকতে চায় কিংবা মিথ্যা বলা, চুরি, মাদকাসক্তি বা খারাপ সঙ্গের প্রতি ঝুঁকে পড়তে পারে।বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী বয়সে সন্তানরা যখন নিজস্ব পরিচয় ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে থাকে, তখন বাবা-মায়ের আলাদা হয়ে যাওয়ায় জীবন নিয়ে ভয়ের সৃষ্টি করে। অনেক সময় তারা ভবিষ্যতে বিয়ে বা সংসার নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে।বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সন্তানের নৈতিক ও আত্মপরিচয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। শিশুটি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখবে, সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার বয়স, পারিপার্শ্বিকতা ও তাকে কীভাবে সমর্থন দিচ্ছে, তার ওপর। যদি বাবা-মা একে অপরকে দোষারোপ করে বা শিশুকে ব্যবহার করে, তাহলে সে একটি ভাঙা ও দ্বিধাগ্রস্ত মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়।ভেঙে যাওয়া পরিবারের শিশুদের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণ।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুসারে, ভাঙা পরিবারের শিশুদের তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতার শিকার হয়।বাংলাদেশেও এ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিবাহবিচ্ছেদ বা মা-বাবার দূরত্বের কারণে সবচেয়ে বেশি মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়ছে সেই পরিবারের শিশুরা।
সন্তানের মনোজগতের বিষয়টি খুব বেশি বিবেচনা করা হয় না।আইনি কাঠামো, ধর্মীয় নির্দেশনা আর মা–বাবার আর্থসামাজিক বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। অথচ আমাদের জানা বা বোঝা এবং অভিজ্ঞতার বাইরেও সন্তানের নিজস্ব চিন্তাচেতনা, ভালো লাগা বা না লাগার বিষয় আছে, সেটা কেউ গণ্য করে না। যে কারণে মা–বাবার বিবাহবিচ্ছেদ আর সন্তানের ‘জিম্মা ও অভিভাবকত্বের’ টানাপোড়েনের কুফল কিছুদিনের মধ্যেই পেতে শুরু করে এবং সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত নয়।এ যুদ্ধে উভয়েই বিজয়ী হতে চান, তাই সন্তানের মনোজগতের বিষয়টি কেউ খুব একটা বিবেচনা করেন না। কখনো কখনো আরও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় শিশুকে। বিচ্ছেদের পর বাবা-মা দুজনই নিজের মতো করে নতুন সংসার গড়ে তোলেন। সেখানে সন্তানের জন্য জায়গা হয় না। তখন নানা বাড়ি, দাদা বাড়ি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুসদনে ঠাঁই হয় তার। বাবা-মায়ের একজনকে হারানোর অনুভূতি, কিংবা দুজনের কাছ থেকেই দূরে থাকার বাস্তবতা শিশুর মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকে শিশুর মধ্যে তীব্র মানসিক ট্রমা তৈরি হতে পারে। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিভিন্নভাবে। অনেক সময় সে নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা বা রাগের মধ্যে ডুবে যেতে যায়। কিছু শিশু হয়তো চুপচাপ হয়ে যায়।আবার কেউ কেউ আক্রমণাত্মক আচরণ দেখাতে শুরু করে। শিশুর পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে সে হয়তো মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত থাকে যে, বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও পরীক্ষায় তার পারফরম্যান্স খারাপ হতে শুরু করে। অনেকে বিদ্যালয় জীবন থেকে ছিটকে পড়ে।এছাড়াও শিক্ষক কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শিশুর মাঝে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। সে হয়তো নিজেকে কম গুরুত্বপূর্ণ বা “ভিন্ন” ভাবতে শুরু করে অন্যদের তুলনায়। পরিবার যেখানে শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার কথা, সেখানে পরিবার ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক সময় তার আত্মপরিচয়ের ভিতকেই দুর্বল করে দেয়।
বিচ্ছেদের পূর্বে অনেক সময় বাবা-মা ঝগড়া করতে করতে সন্তানদের টেনে নিয়ে আসেন পক্ষপাতিত্ব করার জন্য। অনেক সময় ভিকটিম রোল প্লে করেন এবং সঙ্গীর সর্ম্পকে নেতিবাচক কথা সন্তানকে বলেন। এটি শিশুকে মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেয়। এখানেই কিন্তু সমস্যার শেষ নয়। এর ফলে শিশুরা শুধু তাদের নিজেদের জীবনেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ওপরেও। এটা একটা চক্রের মতো। কারণ আজকে যারা শিশু, আগামীতে তারাই কিন্তু শিশুর বাবা-মা। আমরা যদি সুখী জীবন চাই তাহলে কোনো একটা সময় এই চক্রটা ভেঙে দিতে হবে।
শিশুর সর্বোত্তম মঙ্গল কোন বাবা বা মা চান না? উভয়েই চান। কেবল উভয়ের অবস্থা ও অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে যেকোনো একজনকে তো দায়িত্ব নিতেই হবে। দু-একটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা যায় যে ,বাবা বা মা কেউ চাননি সন্তানের দায়িত্ব নিতে। সেটা ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম কখনোই উদাহরণ হতে পারে না। একসময়ের স্বামী-স্ত্রীর মান-অভিমান-জেদ-রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণার শিকার কোনো অবস্থাতেই তাদের সন্তান হতে পারে না। এটা কারও কাছেই গ্রহণীয় নয়।
বিজ্ঞ আদালত কন্যা বা পুত্রসন্তানের বয়স যা–ই হোক না কেন কতগুলো বিষয় সুবিবেচনায় নিয়ে অভিভাবকত্ব নিযুক্ত করছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাবা বা মায়ের আর্থসামাজিক অবস্থা, তাঁদের ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র-আচার-আচরণ-চাল-চলন, যা সন্তানের সার্বিক কল্যাণে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বা ফেলতে পারে। বাবা বা মায়ের সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, যোগাযোগ, বোঝাপড়ার অবস্থা অথবা সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে বাবা বা মা কতটুকু ও কীভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারছেন বা পারবেন এ সবকিছুই বিবেচ্য হচ্ছে আদালতের কাছে। নানা দিক সূক্ষ্মভাবে বিচার–বিশ্লেষণ করেই আমাদের বিচার বিভাগ সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব নির্ধারণের বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে।কিছু মামলায় মাকে ‘সোল কাস্টডি আর লিগ্যাল গার্জিয়ানশিপ’ দিচ্ছে।বাবার পক্ষ থেকে মাকে সন্তানের জিম্মা দেওয়া নিয়ে খুব বেশি আপত্তি থাকে না। কারণ, জিম্মার কাজটা কঠিন এক গুরুদায়িত্ব। যা কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়, সেটা ‘লিগ্যাল গার্জিয়ানশিপ’ বা আইনগত অভিভাবক নিযুক্তির ক্ষেত্রে।সন্তানের সার্বিক মঙ্গলার্থে মায়ের সম্পদ ও সম্পত্তিতে সন্তানের যেমন নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র অধিকার ও দাবি রয়েছে, তেমনি সন্তানকে বেড়ে উঠতে বা জীবন গঠনে বাবার সম্পদেও নিরঙ্কুশ অধিকার বিবেচ্য।
এই সমাজে ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের প্রতি মানুষের মনোভাব মোটামুটি এইরকমই। অনেকেই মনে করেন, বিচ্ছিন্ন পরিবারের বাচ্চাদের কাছ থেকে ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। অথচ এমন পরিবারের অনেক ছেলেমেয়ে প্রতিকূলতা পার হয়ে নিজ যোগ্যতায় ভালো অবস্থানে আছে।
পারিবারিক অবস্থা ভেঙে যাওয়ার আগে আমাদের কি আরেকবার ভাবার সুযোগ আছে বা আমরা কি ভাবতে পারি যে শিশুর সর্বোত্তম মঙ্গলের জন্য আমরা কি আরেকটু সহনশীল হতে পারি না? বারবার আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেরাই কি আমাদের বাচ্চাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে পারি না?সন্তানদের সুন্দর আগামীর কথা চিন্তা করে একটা সুষ্ঠু পরিবেশে সুনাগরিক ও আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তোলার প্রয়াসে বাবা-মাকে বিচ্ছেদের আগে আরেক বার ভেবে দেখা উচিত। সংসার টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক উৎসর্গবোধ জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাচ্চা না নিয়ে তাদের নিজেদের সম্পর্ক ভালো আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যদি শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ হয়েই যায়, তাহলেও দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তখন দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সন্তানকে সময় দিতে হবে, তার কথা শুনতে হবে, তাকে বোঝাতে হবে,তোমার কোনো দোষ নেই। বাবা-মা আলাদা হলেও সন্তানের প্রতি দুজনের ভালোবাসা যেন অটুট থাকে। একজনের কাছে সন্তান থাকলেও অন্যজন যেন তার জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে না যান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানকে কখনোই বাবা-মায়ের লড়াইয়ের অস্ত্র বানানো যাবে না।
আর যদি বিচ্ছেদ হয়েও যায়, সন্তানের ওপর যেন এর নেতিবাচক প্রভাব না আসে, তা নিয়ে সচেতন থাকতে হবে বাবা-মাকে। আর সন্তানদের দিতে হবে প্রচুর সময়, যেন তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকে। সামাজিক ভাবেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। বিবাহবিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে কটু কথা, বিদ্রূপ কিংবা সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতা শুধু বাবা-মাকে নয়, সন্তানকেও আঘাত করে। তাই সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সুশীল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সেমিনার, সচেতনতা মূলক কর্মসূচি ও পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে হবে বিচ্ছেদ একটি সম্পর্কের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্বের সমাপ্তি নয়।একজন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু বাবা-মা হিসেবে তাঁদের সম্পর্ক কখনো ভাঙার সুযোগ নেই। কারণ তাঁদের বিচ্ছেদের পরও একটি শিশুর পৃথিবী তার বাবা-মা।তাই সংসার ভাঙার আগে আরেকবার ভাবুন। আর যদি ভাঙতেই হয়, তাহলে অন্তত সন্তানের মনটা যেন না ভাঙে।কারণ বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় শিকার কখনোই বাবা বা মা নয় শিশুটিই।

