
মেহেরপুরে একদিকে রোদের তীব্রতা ও ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। শহরে কিছুটা বিদ্যুৎ মিললেও গ্রামের অনেক এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। গরমে অতিষ্ঠ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে প্রতিদিন। এতে বিপাকে পড়েছেন
শিক্ষার্থী, কৃষক,ব্যবসায়ী ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল কল কারখানার মালিকসহ সকল শ্রেনীপেশার মানুষ।
কতদিনে বিদ্যুতের এমন দুর্ভোগ কাটবে তা নিশ্চিত নয়,বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুত কর্তৃপক্ষ।
মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুত অফিসের তথ্যমতে, মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতির আওতায় চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মিলে চুয়াডাঙ্গা সদর,আলমডাঙ্গা,জীবননগর, এবং দামুড়হুদা, এসকল এলাকায় ২ টি চুয়াডাঙ্গা ও কুস্টিয়া গ্রীডে ১৩২ /৩৩ কেভি গ্রীড উপকেন্দ্র এবং ১২ টি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র থেকে ৭৭ টি ১১ কেভি ফিডারের মাধ্যমে প্রায় ৫ লক্ষ,২৪ হাজার ৬০০ গ্রাহক রয়েছেন। অত্র সমিতির বর্তমান পিক ডিমান্ড ১৩৭ মেগাওয়াট।
এদিকে মেহেরপুর জেলার তিনটি উপজেলায় মোট গ্রাহক রয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ১৫৯ জন। এদের মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ১ লাখ ৭৭ হাজার,৯৮৮ জন,বাণিজ্যিক গ্রাহক ৯ হাজার ৭০২, শিল্প সংযোগ ২ হাজার ১৭৫, সেচ পাম্প রয়েছে ৩ হাজার ৪২৩ জন। অন্যান্য গ্রাহক রয়েছে ২ হাজার ৮৭১ টি। অত্রাঞ্চলে লোডশেডিং মুক্ত নিরবিছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহে ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও অফ পিক আওয়ার রাত ১২ হতে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত ৫৫ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও পাপ্তি বিদ্যুত ৪০ মেগাওয়াট। এখানে ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১৫ মেগাওয়াট।
এবং পিক আওয়ার সন্ধা ৬ টা হতে রাত ১২ টা পর্যন্ত চাহিদা ৬২ মেগাওয়াট, পাপ্তি ৪১ মেগাওয়াট। ঘাটতি দেখানো হয়েছে ২১ মেগাওয়াট। অফ পিক আওয়ারে লোডশেডিং ২৭% এবং পিক আওয়ারে ঘাটতি ৩০ থেকে ৩৪%।
জেলার গ্রাহকদের অভিযোগ, দাপ্তরিকভাবে বিদ্যুতের ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে,বাস্তবে তার চিত্র অনেকটা ভিন্ন। সারদিনে ৫/ ৬ ঘন্টা বিদ্যুত থাকছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন গ্রাহক সাধারণ। গ্রাম ও শহরের মধ্যেও বিদ্যুত সরবরাহে রয়েছে বিস্তর বৈষম্য। শহরের তুলনায় গ্রামে চার ভাগের এক ভাগ বিদ্যুত সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সব চেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, এখন বর্ষা মৌসুম হলেও বৃষ্টি নেই মেহেরপুরের আকাশে। ফলে প্রখর রোদে পুড়ছে মাঠের ফসল। প্রতিনিয়ত সেচ দিতে হচ্ছে ধান,মরিচসহ নানা ক্ষেতে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে আমন ধান রোপনের মৌসুম।
আমন ধান লাগানোর জন্য সেচের অভাবে জমি প্রস্তত ব্যহত হচ্ছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাওবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মুন্তাজ আলী বলেন, এখন শ্রাবন মাস,তবুও বৃষ্টি হয়নি প্রায় একমাস। প্রতিদিন ধানের জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুত না থাকায় এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে ৩/৪ বার বিদ্যুত চলে যায়। যায় ঘন ঘন,আসে দেরীতে। এতে বিদ্যুত বিল বেশি আসছে এবং মাঠেই দিন কাটছে। বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি থাকলে ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটবে।
অন্যদিকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন স্কুলে অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষা। রাতের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুত না থাকায় পড়ার টিবিলে বসে কস্ট পাচ্ছেন এমন কথা জানিয়েছেন পরীক্ষার্থী সিমা আক্তার।
গাংনীর সাাহারবাটী বাজারের ওয়েল্ডিং ব্যবসায়ী বিষু কর্মকার জানান, তার দোকানে ৪ জন শ্রমিক কাজ করে। তাদের প্রতিদিনের হাজিরা ৭০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। বিদ্যুত না থাকলেও তাদের প্রতিদিনের হাজিরা দিতে হচ্ছে। বিদ্যুত না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সময় মতো কাজ দিতে পারছেননা গ্রাহকদের।
ভাটপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী নুসরাত জামান বলেন, দিনে যেমন তেমন,সন্ধার পর বিদ্যুত না থাকায় পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্রত সময়ের মধ্যে বিদ্যুত সরবরাহ ঠিক না হলে সিলেবাস শেষ হবে না।
মেহেরপুর জেলায় জেনারেল হাসপাতালসহ জেলায় চারটি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এবং বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে প্রায় অর্ধশত। কোনো হাসপাতালে নেই জেনারেটর ব্যাবস্থা। ফলে হাসপাতালে বিদ্যুত চলে গেলে রোগী ও তাদের স্বজনরা পড়ছেন কস্টে।
নিরবছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ চান ভুক্তভোগীরা। বিদ্যুত না পেয়ে কয়েক দফা বিদ্যুত অফিস ঘেরাও করেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। তাদের দাবী সারাদিনে মাঠে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে বাড়িতে এসে বিদ্যুত পাচ্ছিনা।
এবিষয়ে মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতির জেনারেল ম্যানেজার ( ডিজিএম) স্বদেশ কুমার ঘোষ দৈনিক আগামীর সময়কে বলেন, মেহেরপুরে যে পরিমান বিদ্যুত প্রয়োজন তা পাচ্ছিনা। প্রতিদিন গড়ে ৩০/৩৪% লোডশেডিং থাকছে। শহরের দিকে গরুত্ব দিতে গেলে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি নিরসনে জেলা প্রশাসকের কাছে গত ২৮ জুন বিদ্যুতের চাহিদা, সমাধানে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। এখনও সুরাহা পাইনি। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুত বরাদ্দ কম পাওয়ায় এমন সমস্যা তৈরী হয়েছে। কবে নাগাদ সমাধান হবে তা বলা যাচ্ছে না।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী জানান, মেহেরপুর জেলায় সকল এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোড ম্যানেজমেন্ট এর মাধ্যমে বিদ্যুত সচল রয়েছে।জাতীয় গ্রীড থেকে সমস্যা ঠিক হলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

