
‘মৌলবাদ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অধিকাংশের মনে প্রথমেই ধর্মীয় উগ্রতার কথা আসে। বিশেষ করে ধর্মের প্রসঙ্গে শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে, অনেকের কাছে মৌলবাদ যেন ধর্মের অজ্ঞতা বা বাড়াবাড়ির একটি সমার্থক শব্দ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মৌলবাদ কি শুধুই ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস, মতাদর্শ বা দলীয় আনুগত্য যখন চরম, অসহিষ্ণু ও আপসহীন হয়ে ওঠে, তখন তাকে কি মৌলবাদী প্রবণতা বলা যাবে না?
শব্দটির আক্ষরিক অর্থের দিকে তাকালে ‘মৌলবাদ’ বলতে মূল বা মৌলিক বিষয়কে আঁকড়ে ধরার ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো মূলনীতি বা আদর্শকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করাই তো খারাপ কিছু নয়। বরং একটি বিশ্বাস বা আদর্শের প্রতি দৃঢ় থাকা ব্যক্তির নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানেরই অংশ হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সেই মূলনীতিকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরা হয় যে, ভিন্নমত, ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা অন্যের অস্তিত্বের অধিকার পর্যন্ত অস্বীকার করা শুরু হয়।
অর্থাৎ, মৌলবাদকে শুধু ‘মূলকে আঁকড়ে ধরা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কঠোরতা, আপসহীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা।
এই জায়গা থেকেই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকানো দরকার।
আমরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক, কর্মী কিংবা নেতা হতে পারি। নিজের দলের আদর্শে বিশ্বাস করা, দলের পক্ষে কাজ করা, নির্বাচনে দলকে ভোট দেওয়া কিংবা অন্য দলের নীতির সমালোচনা করা—এসব গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। রাজনৈতিক দল মানেই তো মতাদর্শের পার্থক্য, প্রতিযোগিতা এবং মতের সংঘাত।
কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন দলীয় আনুগত্য যুক্তি ও বিবেকের ওপর প্রাধান্য পায়।
যখন একজন মানুষ মনে করতে শুরু করেন, ‘আমার দলই একমাত্র সত্য, আর অন্য দল মানেই ভুল’; যখন নিজের দলের নেতার ভুলও ভুল বলে স্বীকার করা যায় না; যখন অন্য দলের একজন মানুষকে শুধু তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সন্দেহের চোখে দেখা হয়—তখন বিষয়টি আর সাধারণ দলীয় আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারণ করতে শুরু করে। অন্য রাজনৈতিক দলের একজনের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হবে না, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না, একই অনুষ্ঠানে ছবি থাকলে প্রশ্ন উঠবে, এমনকি কারও সামাজিক যোগাযোগের তালিকায় ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ থাকলেও তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে—এমন প্রবণতা কি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ?
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান করা, হেনস্তা করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করাকে কেউ নিজের দলীয় দায়িত্ব বলে মনে করেন। তখন রাজনৈতিক মতপার্থক্য আর মতপার্থক্য থাকে না; তা পরিণত হয় শত্রুতায়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—প্রত্যেক রাজনৈতিক কঠোর অবস্থানকে ‘মৌলবাদ’ বলা ঠিক হবে না। একজন মানুষ নিজের রাজনৈতিক আদর্শে দৃঢ় থাকতে পারেন, অন্য দলের নীতির তীব্র সমালোচনাও করতে পারেন। সেটি নিজে মৌলবাদ নয়। কিন্তু যখন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করত্র ভিন্নমতের মানুষের প্রতি ঘৃণা, সামাজিক বর্জন, অমানবিক আচরণ কিংবা সহিংসতাকে বৈধ বা কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই আচরণকে রাজনৈতিক মৌলবাদী প্রবণতা হিসেবে বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট কারণ থাকে।
ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মবিশ্বাস নিজে মৌলবাদ নয়। ধর্মের মৌলিক শিক্ষা অনুসরণ করাও মৌলবাদ নয়। বরং সমস্যা তখন, যখন ধর্মের নামে অন্যের ওপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া হয়, ভিন্নমতকে সহ্য করা হয় না কিংবা নিজের বিশ্বাসের বাইরে থাকা মানুষকে ঘৃণা বা আক্রমণের যোগ্য মনে করা হয়।
ইসলাম ধর্মেও বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকার শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু ‘বাড়াবাড়ি’ শব্দটিকে শুধু ধর্মীয় আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে বিষয়টির ব্যাপ্তি কমিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ ধর্মে যেমন বাড়াবাড়ি করতে পারে, রাজনীতিতেও পারে। কোনো দল, নেতা, মতাদর্শ, জাতি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিও মানুষ এমন অন্ধ আনুগত্য তৈরি করতে পারে, যেখানে যুক্তি ও বিবেকের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়।
গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো মতের বৈচিত্র্য। এখানে সবাই একই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবে না, একই আদর্শে বিশ্বাস করবে না, একই নেতাকে পছন্দ করবে না। বরং ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, বিরোধিতা থাকবে। কিন্তু সেই বিরোধিতা যেন ঘৃণায় পরিণত না হয়, সেটিই সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরীক্ষা।
আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার শত্রু নন। তিনি এমন একজন নাগরিক, যিনি আমার চেয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করেন। আমি তার মতের বিরোধিতা করতে পারি, তার রাজনৈতিক কর্মসূচির সমালোচনা করতে পারি, নির্বাচনে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করতে পারি—কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার অধিকার আমার নেই।
তাই মৌলবাদ নিয়ে আমাদের আলোচনাও আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার। শুধু ধর্মীয় মানুষের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করলে চলবে না; রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য ও মতাদর্শের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন করতে হবে।
আমি কি আমার আদর্শকে ধারণ করছি, নাকি আদর্শের নামে অন্য মানুষদের সাথে জুলুম করতে শিখছি?
এই প্রশ্নটি ধর্মের ক্ষেত্রেও যেমন জরুরি, রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনই জরুরি।
তাই মৌলবাদকে শুধু মসজিদ-মন্দিরে খুঁজবেন না; কখনো কখনো দলীয় কার্যালয়ে, রাজনৈতিক স্লোগানে, সামাজিক সম্পর্কের দেয়ালে—এমনকি নিজের মনেও খুঁজে দেখুন।

