
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো-রাষ্ট্র মানুষের জন্য। মানুষ রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে নিজের অধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য; রাষ্ট্র মানুষকে সৃষ্টি করেনি। জন লক মনে করতেন, মানুষ তার জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য রাষ্ট্র গঠন করেছে। রুশো রাষ্ট্রকে দেখেছেন সামাজিক চুক্তির ফল হিসেবে, যার বৈধতার উৎস জনগণ ।
আর আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত উক্তি-“Government of the people, by the people, for the people”-এই ধারণাকেই আরও সুদৃঢ় করে। তবে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে-আইন মানা, কর প্রদান, ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং দেশের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা।
কিন্তু অগ্রাধিকার সবসময় মানুষের, কারণ রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান; মানুষই তার মালিক । আর সেই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো রাজনীতি । তাই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ-রাজনীতি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাজনীতির জন্য ?
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষকে “Political Animal” বলেছিলেন। এর অর্থ, মানুষ সমাজবদ্ধ জীব; তাই ন্যায়বিচার, শাসন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে রাজনীতির প্রয়োজন । রাজনীতির জন্ম মানুষের জীবনকে উন্নত করার জন্য, বিভক্ত করার জন্য নয় । কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতি মানুষের সেবার পরিবর্তে ক্ষমতার সিঁড়িতে পরিণত হয়েছে । বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন এক সত্যের সাক্ষী । ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন-প্রতিটি সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ । মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার দাবিই রাজনীতিকে অর্থবহ করেছে । অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় নাগরিক পরিচয়ের ওপর প্রাধান্য পেয়েছে ।
এই পরিবর্তনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আজও আমাকে ভাবায়। প্রায় এক যুগ আগে ডিএমপির এক থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম । এমন সময় তার বিয়ের দাওয়াতের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলো । সে আমাদেরও সঙ্গে নিয়ে গেল ।
খাবারের টেবিলে বসার পর তিনি জানতে চাইলেন, “এটা কার বিয়ে?” উত্তর এলো-বিরোধী দলের এক সাবেক এমপির মেয়ের । মুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল । তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন, “চলো, আর খাওয়া যাবে না । ঊর্ধ্বতনরা জানলে আমার পোস্টিং-প্রমোশন ঝুঁকিতে পড়বে ।” আরেকজন পরিচিত, যিনি একটি মহানগরের অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন, একদিন বলেছিলেন-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তার রুমমেট একই শহরে থাকলেও কখনো অফিসে ডাকার সাহস পাননি । কারণ, কেউ দেখে ভুল ব্যাখ্যা করলে পেশাগত সমস্যায় পড়তে হতে পারে ।
এই দুটি ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; বরং এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন সামাজিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং নাগরিক আস্থাকেও প্রভাবিত করে । আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায়ও আজ মানুষের গুরুত্ব বেড়েছে । এক সময় রাষ্ট্রই ছিল নিরাপত্তার একমাত্র কেন্দ্র ।
এখন “Human Security” ধারণা বলছে, নিরাপত্তা মানে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও নিরাপত্তার অংশ । অর্থাৎ আধুনিক বিশ্বও স্বীকার করছে-রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষ । তবে এক্ষেত্রে দায় শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; নাগরিকদেরও । যদি আমরা দলীয় আনুগত্যকে নাগরিক বিবেকের ওপরে স্থান দিই, যুক্তির বদলে অন্ধ সমর্থনকে উৎসাহিত করি, তবে রাজনীতি মানুষকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে ।
সুস্থ গণতন্ত্র গড়তে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের উচিত প্রশ্ন করার সংস্কৃতি, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং জবাবদিহির চর্চা বাড়ানো । কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনের ঘটনা নয়; এটি প্রতিদিনের অংশগ্রহণ, সমালোচনা ও জবাবদিহির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তরুণ প্রজন্ম। একসময় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, ভদ্র ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই ছাত্রনেতৃত্ব তৈরি হতো । সেই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠত। আজ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মেধার চেয়ে পেশীশক্তি বা আনুগত্য নেতৃত্ব নির্ধারণে বেশি প্রভাব ফেলছে । ফলে আদর্শভিত্তিক নেতৃত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে এবং মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । তরুণদের শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে ।
তাদের তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও নৈতিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি । কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন দ্রুত মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি বিভ্রান্তিকর তথ্য গণতন্ত্রকে দুর্বলও করতে পারে ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে-রাজনীতি মানুষের জন্য, না মানুষ রাজনীতির জন্য ? ইতিহাস, দর্শন এবং গণতন্ত্রের উত্তর একটাই-রাজনীতি মানুষের জন্য ।
মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়াই রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য । রাজনীতি তখনই সফল, যখন কৃষক ন্যায্য মূল্য পান, শ্রমিক মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারেন, শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখার সাহস পায় এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতেও ভয় লাগে না ।
কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার চেয়ারে নয়, মানুষের আস্থায় । সুতরাং মানুষকে রাজনীতির জন্য নয়; রাজনীতিকে মানুষের জন্য ফিরিয়ে আনাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ।
লেখকঃ মাহবুবুর রহমান বকুল,
বিএসএস (সম্মান), রাষ্ট্রবিজ্ঞান
এলএল.এম.-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
মাস্টার্স-আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

