
একসময় পাঁচ পয়সা, দশ পয়সায় জুতা-স্যান্ডেল মেরামত করতেন। ২৫ পয়সায় করতেন জুতা পালিশ। সময় বদলেছে, বদলেছে টাকার মূল্য। এখন জুতা মেরামতের একই ধরনের কাজে মজুরি পান কমপক্ষে ১০ টাকা। জুতা পালিশের জন্য নেন ৩০ থেকে ৪০ টাকা। কিন্তু এত বছরেও বদলায়নি তার জীবনের হিসাব। অভাব ছিল, এখনো আছে। বয়সের ভারে শরীর চলে না, চোখেও কম দেখেন। তবু পেটের ক্ষুধা মেটাতে প্রতিদিন বসতে হয় কাজের জায়গায়। ৭৫ বছর বয়সী গোপাল দাসের বাড়ি মেহেরপুর শহরের ক্যাশবপাড়ায়।
স্বাধীনতার আগের সময় থেকে শহরের বড় বাজার মোড়ে রাস্তার পাশে বসে জুতা-স্যান্ডেল মেরামতের কাজ করছেন তিনি। কয়েক দশক ধরে রাস্তার ধারে বসে মানুষের পায়ের জুতার যত্ন নিয়ে চললেও নিজের জীবনের জীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি এই পাদুকা কারিগর। দূর্গা উৎসবে মহাসপ্তমী রাতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে মাটিতে বসে জুতা মেরামত করছেন গোপাল দাস। সামনে কাজের সরঞ্জাম, পাশে একটি জুতা। আলো বলতে ছোট একটি চার্যার বাতি। কাস্টমার পেলে চার্যারের আলো জ্বলে, নাহলে স্ট্রিট লাইটের আলোয় বসে থাকে। কখনো লোডশেডিংয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে। তবু কাজ থামে না। কারণ শারদীয় দুর্গা উৎসবে বাড়িতে এসেছে মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিরা। সংসারের খরচও বেড়েছে। সেই বাড়তি ব্যয় সামলাতে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয় তাকে। গোপাল দাস বলেন, আগে সন্ধ্যার আগেই কাজ গুটিয়ে বাড়ি চলে যেতাম। এখন তেমন কাজ পাই না। তাই রাত আটটা পর্যন্ত বসে থাকি। মেয়েরা, জামাই আর নাতি-নাতনিরা বেড়াতে এসেছে পূজায়। তাই খরচ বেড়েছে।
বদলেছে মজুরি, বদলায়নি অভাব। গোপালের কর্মজীবনের শুরু এমন এক সময়ে, যখন পাঁচ পয়সা কিংবা দশ পয়সাতেই জুতা মেরামতের কাজ করা যেত। ২৫ পয়সায় জুতা পালিশ করে দিতেন। সেই সময়ের পয়সা আর এখনকার টাকার মধ্যে ব্যবধান অনেক। কিন্তু সেই ব্যবধানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার জীবনে স্বচ্ছলতা আসেনি। গোপালের ভাষায়, ‘আগেও অভাব ছিল, এখনো অভাব আছে।’ কথাটি বলার সময় তার সামনে পড়ে থাকে মানুষের ব্যবহারে পুরোনো হয়ে যাওয়া জুতা। কোনোটির সেলাই ছিঁড়েছে, কোনোটির তলা খুলে গেছে। সেগুলো ঠিকঠাক করে দেন তিনি। কিন্তু নিজের জীবনের ছেঁড়া হিসাবগুলো আর জোড়া লাগানো হয়ে ওঠে না। একসময় সন্ধ্যার আগেই কাজ শেষ করতেন। এখন কাজ কমে যাওয়ায় রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। মানুষ আর ছেড়া ফাটার কাজ করান না।
সারাদিন বসে থেকেও কত টাকা আয় হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তারপরও কাজের জায়গাটি ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই তার। কারণ, কাজ বন্ধ হলে আয়ও বন্ধ। স্ত্রী নেই, সংসারের দায় এখনো আছে। পাঁচ বছর আগে স্ত্রী মারা গেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে, ছেলের বউ নিয়ে সংসার গোপাল দাসের। ছেলে শংকর দাস স্থানীয় একটি তেল পাম্পে কাজ করেন। বাবা ও ছেলের আয়ে কোনোভাবে চলে সংসার। কিন্তু সংসারের ব্যয় তো শুধু প্রতিদিনের খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। বছর শেষে ঘর মেরামতের প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন উৎসবে বাড়তি খরচ থাকে। মেয়েরা স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এলে গোপালের মন ভরে ওঠে, কিন্তু সংসারের হিসাবেও চাপ পড়ে। সেই খরচ সামলাতে তাঁকে আরও বেশি সময় কাজ করতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার সামর্থ্য কমেছে। দীর্ঘ সময় মাটিতে বসে থাকতে কষ্ট হয়। চোখেও আগের মতো দেখতে পান না। তবু কাজ ছেড়ে দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। যে পেশার সঙ্গে জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে, সেই পেশাই এখনো তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন।
মেহেরপুর শহরের বড় বাজার মোড় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের কারও জুতার সেলাই খুলে গেলে, কারও জুতার তলা উঠে গেলে কিংবা পালিশের প্রয়োজন হলে গোপাল দাসের কাছে আসেন। কাজের বিনিময়ে পাওয়া সামান্য মজুরিই তার প্রতিদিনের আয়ের উৎস। কিন্তু বয়সের কারণে যখন বিশ্রামের প্রয়োজন, তখনো তাকে কাজ করতে হয়। কখনো কাজ আসে, কখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেলে ছোট্ট বাতির আলোও নিভে যায়। পূজার বাড়তি খরচের কথা ভেবে সেই অন্ধকারেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। গোপাল দাসের জীবন তাই কেবল একজন প্রবীণ পাদুকা কারিগরের পেশাগত জীবনের গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যার বয়স হয়েছে, শরীরের শক্তি কমেছে, চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়েছে; কিন্তু সংসারের প্রয়োজন তাকে অবসর নিতে দেয়নি। পাঁচ পয়সা থেকে দশ টাকা, ২৫ পয়সা থেকে ৩০-৪০ টাকা মজুরির অঙ্ক বদলেছে বহুবার।
বদলেছে শহর, বদলেছে মানুষের জীবনযাপনও। কিন্তু গোপালের জীবনে স্বস্তি আসেনি। ৭৫ বছর বয়সেও তাই রাস্তার পাশে বসে জুতা মেরামত করেন তিনি। জীবিকার এই লড়াইয়ে তার অবসর নেই, নেই নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ। সংসারের খরচ আর পেটের ক্ষুধাই তাকে প্রতিদিন আবারও বসিয়ে দেয় কাজের জায়গায়।

