
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, যুক্তিবোধ ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে কুষ্টিয়ায় এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইনোভেশন আইডিয়া’ কার্যক্রম।
শনিবার সকালে প্রতিষ্ঠানটির মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তা, গবেষণাধর্মী ধারণা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভাবনী আইডিয়া উপস্থাপন করে। তাদের উপস্থাপনায় দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সহজ, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধানের বিভিন্ন ধারণা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রাসেল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. সোহেল রানা মানিক, অধ্যক্ষ (একাডেমিক) মিস দিলরুবা, ভাইস প্রিন্সিপাল মো. রেজাউ রহমান খানসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘ইনোভেশন আইডিয়া’ কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত ধারণার মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, সামাজিক উন্নয়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয় গুরুত্ব পায়। কেউ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সময় ও শ্রম কমানোর ধারণা তুলে ধরে, কেউ পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের কথা বলে। আবার কেউ কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে নতুন চিন্তার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার সম্ভাবনা উপস্থাপন করে।
শিক্ষার্থীদের এসব উপস্থাপনায় তাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সমস্যা শনাক্তকরণ, যুক্তিনির্ভর চিন্তা এবং সমাধান খোঁজার মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। আয়োজকদের মতে, একটি উদ্ভাবনী ধারণা সবসময় বড় কোনো আবিষ্কার দিয়ে শুরু হয় না; বরং নিজের চারপাশের ছোট সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার মধ্য দিয়েই উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটে।
এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, “শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, প্রশ্ন করা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ দিতে হবে। ‘ইনোভেশন আইডিয়া’ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা সেই চর্চাটাই তৈরি করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু ভাবতে উৎসাহিত করা হলে তাদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলি বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যতে এসব শিক্ষার্থী দেশ ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীদের মেধা শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে বাস্তব জীবনের কাজে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ‘ইনোভেশন আইডিয়া’ সেই সুযোগ তৈরি করছে।”
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন জরুরি। এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত করবে।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. সোহেল রানা মানিক বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা বিকশিত করতে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কোনো সমস্যা নিয়ে চিন্তা করে সমাধানের ধারণা তৈরি করলে তাদের শেখার আগ্রহ আরও বাড়ে।
অধ্যক্ষ (একাডেমিক) মিস দিলরুবা বলেন, “একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের চিন্তা দিয়ে একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করে, তখন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। একই সঙ্গে তার গবেষণা, উপস্থাপন ও দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়।”
ভাইস প্রিন্সিপাল মো. রেজাউ রহমান খান বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিকল্প নেই। নিয়মিতভাবে এ ধরনের কার্যক্রম আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী মানসিকতা আরও শক্তিশালী হবে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রচলিত ক্লাসের বাইরে নিজেদের চিন্তা ও আইডিয়া অন্যদের সামনে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়ে তারা উৎসাহিত হয়েছে। একটি সমস্যা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং তার সম্ভাব্য সমাধান কীভাবে বের করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তারা।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু ওবাইদা মাহাদীর বাবা মোমিন উদ্দিন নামের এক অভিভাবক বলেন, “আমরা সাধারণত সন্তানদের ভালো ফলাফলের জন্য পড়াশোনায় উৎসাহ দিই। কিন্তু ভবিষ্যতে শুধু ভালো ফলাফল নয়, নিজের চিন্তা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও প্রয়োজন। স্কুলের এমন আয়োজন সন্তানদের সেই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে।”
তিনি আরও বলেন, মোবাইল আসক্তি এড়িয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করলে শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা সম্ভব।
শিক্ষাবিদদের মতে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এ সময়ে শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই হবে না; তাদের সৃজনশীল চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, সমস্যা সমাধান এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইনোভেশনভিত্তিক কার্যক্রম এ লক্ষ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আয়োজকরা জানান, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতে আরও পরিমার্জন ও বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভালো ধারণাগুলোকে প্রকল্প আকারে এগিয়ে নেওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বাস্তব সমস্যার সমাধানেও ভালো কিছু করা’ এমন মানসিকতা তৈরির একটি নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

