
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৬৫২ জন। অন্যদিকে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমেছে ২ হাজার ৬৭০ জন। শিক্ষার্থীদের আবারও বিদ্যালয়মুখী করতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। অপরদিকে, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও পাঠদান পদ্ধতির উন্নতির পাশাপাশি স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে গাংনী উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থী ছিল ২৮ হাজার ৮২০ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ১৫০ জনে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ২ হাজার ৬৭০ জন। উপজেলায় মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা রয়েছে ৭৪টি।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ১৯ হাজার ৭২৫ জন। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩৭৭ জনে। অর্থাৎ, এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৬৫২ জন। উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৬২টি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিন দিন গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। মাদকাসক্তি ও বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী প্রজন্ম শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের মতে, চলতি বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
আয়েশা খাতুন নামের এক অভিভাবক বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির অন্যতম কারণ স্কুল ফিডিং কার্যক্রম। এ উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়ত। কার্যক্রমটি চালু থাকলে ২০২৭ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়বে বলে আশা করছি। এ ছাড়া আগের তুলনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানও বেড়েছে।
রফিকুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, প্রতিটি বাবা-মায়ের উচিত নিজের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখা। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক অভিভাবক সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করেন। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর অনেকেই সন্তানের পড়ালেখার বিষয়ে তেমন খোঁজখবর রাখেন না। এতে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে পড়ালেখা থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আশপাশের দোকানে গিয়ে বিড়ি-সিগারেট সেবন করে। একপর্যায়ে তারা মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আশরাফুল আলম নামের এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে শিক্ষক ও অভিভাবক—উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকদের নজর রাখতে হবে। বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে সে কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। নজরদারির অভাবে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যেতে পারে এবং খারাপ সঙ্গের কারণে মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মো. বাবর আলী বলেন, মাঝেমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করা উচিত। বিদ্যালয়ে বিড়ি-সিগারেট আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো শিক্ষক এ ধরনের কাজে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের ধূমপানের বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক সচেতন না হলে শিক্ষার্থীরা ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে এবং কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরও খোঁজ রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ব শিক্ষকের, আর সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর রাখা অভিভাবকের দায়িত্ব।
আরিফুল ইসলাম নামের এক সচেতন ব্যক্তি বলেন, বিদ্যালয়ের আশপাশের দোকানগুলোতে স্কুল চলাকালে কোনো শিক্ষার্থী বিড়ি-সিগারেট কিনছে কি না, তা নজরদারি করতে হবে। এ সময় কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। শিক্ষকদেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের দোকানে বসে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। অনেক সময় শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের পাশের দোকানে বসে ধূমপান করতে দেখা যায়। দায়িত্ববোধ থেকে তাঁদের এ ধরনের আচরণ পরিহার করা উচিত।
মতিয়ার রহমান নামের এক শিক্ষক বলেন, তিন বছর আগেও তাঁদের বিদ্যালয়ে ৫০০ থেকে ৫৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে ৩০০ থেকে ৩৫০ জনে। এভাবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থী কমছে। তাঁর মতে, মাদকাসক্তি, বাল্যবিবাহ ও মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখা ছেড়ে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আবারও বিদ্যালয়মুখী করতে এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গাংনী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং পাঠদান পদ্ধতির উন্নতির কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের কারণেও শিক্ষার্থী বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গাংনী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের তুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। শিক্ষার্থীদের আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করতে কাজ করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশ ও মা সমাবেশ আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান এ নির্দেশনা অমান্য করলে সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদকাসক্তি, বাল্যবিবাহ ও মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা কমানো গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আবারও বাড়তে পারে। এ বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষার্থী ভুল পথে এগিয়ে যাক, তা তাঁরা কখনোই চান না।

