
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ খ্রিস্টান পল্লী মেহেরপুরের মুজিবনগর। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর-এর আম্রকাননে শুধু একটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়নি; সেখানে ইতিহাস গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত, নিঃশব্দ শ্রম আর সাধারণ মানুষের অসাধারণ অংশগ্রহণে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ একটি দিন, একটি দৃশ্য, একটি নিঃশব্দ প্রত্যয়ের নাম। মুজিবনগর-এর সেই বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন আজও যেন বাতাসে বহন করে সেই গোপন প্রস্তুতির গন্ধ, গ্রামবাসীর নিঃশব্দ সাহসের প্রতিধ্বনি। সকালের রোদ তখন নরম। আমগাছের ছায়া মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। ১৩ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকানন-এ দাঁড়িয়ে মনে হলো এই নীরবতা কখনোই নিছক নীরব ছিল না। ১৯৭১-এর সেই দিনটিতে, এই মাটিই ছিল উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্র।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পপথ গ্রহণ করেন। দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিলুপ্তি হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (বর্তমানে মুজিবনগর) গ্রামের সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশ না নিলেও, তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সরকার গঠন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হতে পারতো না। তাদের ভূমিকা ছিল সমর্থন, সহানুভূতি, নিরাপত্তা, এবং সরবরাহ সংক্রান্ত সহায়তায়।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য যেকোনো ধরনের প্রস্তুতির জন্য গ্রামবাসীরা সহায়তা করেছিলেন। যেমন- মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের জন্য স্থান তৈরি, খাবার এবং পানীয় সরবরাহ, অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। তারা এই কাজগুলো নিজেরাই করেছিলেন।
সূর্য সেদিন ছিল নির্মম। বৈশাখের খরতাপ যেন মাটিকেও দগ্ধ করছিল। সূর্যও যেখানে মুজিবনগর আম্রকাননকে কুর্ণিশ করে। সেই মুজিবনগর আম্রকানন-এর গাছের ছায়াও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই তাপদাহ উপেক্ষা করেই ইতিহাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। সেদিন মেহেরপুরের ১২ জন আনসার সদস্য। সাধারণ পোশাকে, কিন্তু চোখে কঠোর দৃঢ়তা। তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানান নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার-কে।
দেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেনÑ আমাদের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বড় ভূমিকা ছিল। ১৬ এপ্রিল জাতীয় নেতারাসহ ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন মুজিবনগরে এসে স্থান নির্ধারণ করে যান। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সফল করার দায়িত্ব ছিল বিএসএফের। ১৭ এপ্রিল কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের একত্রিত করে বিশাল গাড়ী বহর নিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সবাই মুজিবনগরে হাজির হয়েছিল। সেদিন মুজিবনগরের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতনা।
সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দোয়াজ আলী বয়সের ভারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। স্মৃতি হাতড়ে জানান- সেদিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার, নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মূখার্জি এবং বিএসএফের ৭৬ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে: কর্ণেল চক্রবর্তী দুজনে সাদা পোশাক পরে আসেন। আমি সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জেনে মুজিবনগর আমবাগানের একটি স্থানকে চিহ্নিত করে একটি তোরণসহ মঞ্চের চর্তুরদিক বাঁশ দিয়ে ঘেরার নির্দেশ দিয়ে ফিরে গেলেন। তখনও জানিনা তারা এখানে কিসের অনুষ্ঠান করবে। নির্দেশমত এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে চৌকি, কাপড়, দড়ি, ঝাঁড় থেকে বাঁশ এবং দেবদারুর পাতা এনে স্থানীয়দের সহায়তায় তৈরী করা হয় তোরণ ও বড় মঞ্চ। সারারাত ধরে এই কাজ করা হয়। খুব সকালে তারা এখানে আসলে দেখেন ভারতীয় হেলিকপ্টার আকাশে মহড়া দিচ্ছে। এরপরপরই মুজিবনগর সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে অসংখ্য জীপ ও ট্রাক ঢুকতে শুরু করে। এই সমস্ত গাড়ি করে জাতীয় নেতারাসহ বিদেশী সাংবাদিক ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা আসেন। বিএসএফ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। অনুষ্ঠানের জন্য চেয়ার, মাইক, টেবিল সবই আসে ভারত থেকে। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাধারণ জনতাকে যে মিষ্টি ও পাউরুটি দেয়া হয়েছিল সেটাও এসেছিল ভারত থেকে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় খ্রিস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পাঠ করা হয় ধর্মগ্রন্থ। ইতিহাসের সূত্রে জানা যায়, এক হিন্দু ভদ্রলোক গীতা পাঠ করেন- যা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের এক প্রতীকী ঘোষণা। এরপর বাজে জাতীয় সঙ্গীত- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। কণ্ঠে হয়তো ছিল কম্পন, কিন্তু সেই সুরে ছিল স্বাধীনতার দৃঢ় অঙ্গীকার। সেদিন গানটা ছিল বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা।
মুজিবনগরের দারিয়াপুর ডিগ্রী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক বাকের আলী সেই শপথ অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলোয়াত করেছিলেন। তিনি জানান, সেদিন খুব সকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে উপস্থিত হন। তিনি তাদের চিনতেন না। স্থানীয় নেতাদের সাথে তিনি জাতীয় নেতাদের সন্মুখে গেলে অনুষ্টানে তাকে কোরআন তেলোয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ তার নাম লিখে নিলেন এবং রিহার্সালের সময় তেলোয়াত শুনলেন। মাত্র ৩০ মিনিট অনুষ্ঠানটির স্থায়ীত্ব থাকলেও উপস্থিত সকলের মধ্যে ছিল স্বাধীনতার উম্মাদনা ও জীবনবাজির শপথ।
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সামরিক কায়দায় সালাম দিয়েছিলেন মেহেরপুরের ১২জন আনসার সদস্য। ইতোমধ্যে ১০ জন মারা গেছে। বেঁচে আছেন দুইজন। এদেরই একজন বয়োবৃদ্ধ মো. সিরাজ উদ্দীন। প্রতিদিন তিনি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে আসেন। তিনি বলেন- সেদিন আমাদের ডাক পড়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে রাস্ট্রিয় মর্যাদায় সালাম জানানোর। আমরা গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম ১২ জন আনসার। ওইদিনই ট্রেনিং দিয়েছিলেন তৎকালীন ঝিনাইদহের সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা গার্ড অব অনার দিই সরকারকে। আর এক আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন বলেন- তখন আনন্দ ভয় উত্তেজনা কাজ করছিলো। দেশি বিদেশী সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষের সামনে প্রথম সারকারকে সালাম জানানোর সময় মনে যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম তা বলে বোঝানো যাবেনা। পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
প্রত্যক্ষদর্শীর সুভাষ মল্লিকের ভাষায়- ওদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না, কিন্তু যে ভঙ্গিতে সালাম দিল- মনে হচ্ছিল এটাই স্বাধীন দেশের প্রথম সেনাবাহিনী। সেই অভিবাদন ছিল প্রতীকী, কিন্তু তা-ই হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সূচনালগ্নের প্রতিচ্ছবি।
মুজিবনগর স্মৃতিপ্রকল্প এলাকায় দেখা মেলে প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী আহম্মদ খাঁ (৭১) রিক্সা ভ্যানে করে শষা ফেরি করছেন। তিনি বলেন- সে বছরই আমার বিয়ে হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানের দিন হঠাৎ করেই হাজার মানুষ জড়ো হলো মুজিবনগরের এই আমবাগানে। তখন বাগানটি ভাগাড় হিসেবে গ্রামের মানুষ ব্যবহার করতো। সেদিন আমিসহ একদল যুবক বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুড়ি সংগ্রহ করে মানুষকে খেতে দিই। আশপাশের বাড়ি থেকে বউ ঝিরা পানি এনে মানুষের পিপাসা মিটায়। সেদিন সেই সরকারের পরিচালনায় দেশ স্বাধীন হয়। এখন আমি গর্বভরে বলি আমিও স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সাক্ষি।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণা রোকসানা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেনÑ তখন আমি গৃহবধু এই বাড়ির। বৈশাখের দাবদাহে সবচেয়ে বড় দরকার ছিল পানি। চারপাশে তখন নিরাপত্তার ঝুঁকি, খোলা চলাফেরা কঠিন। গ্রামের কিশোর কিশোরিরা কলস কাঁখে নিয়ে কূপ থেকে পানি এনে দিচ্ছিল। আমরা আগে নিজেরা খাইনি, আগে তাদের পানি দিয়েছি। তখন মনে হচ্ছিলÑ ওরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। ওরা যখন আমাদের দেয়া মুড়ি, রুটি আর পানি খাচ্ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল, নিজের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি।
সেদিন চারপাশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামের তরুণরা। কেউ গাছে উঠে, কেউ দূরের পথের দিকে তাকিয়েÑ যদি পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়। একটি সংকেত ঠিক করা ছিলÑ কিছু হলে দ্রুত খবর পৌঁছে যাবে। আমরা ছিলাম চোখ, যাতে অনুষ্ঠানটা চোখের আড়ালেই থেকে যায় শত্রুর। বললেন স্মৃতিসৌধের পাশের প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। সব কিছু শেষ হওয়ার পরও কোনো উল্লাস ছিল না। ছিল নিঃশব্দ স্বস্তি।
কারণ সবাই জানত- এটা শেষ নয়, শুরু।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুল হক মন্টু বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে ভাষ্কর্যের মাধ্যমে। ৫ আগস্ট পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটি পক্ষ সেসব ভাষ্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছে। সেগুলি শুধু পাথর বা কংক্রিটের ছিল না। সেখানে ছিল আমাদের ইতিহাস, আমাদের পরিচয়। ওগুলো ছিল আমার বাবার মতো হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের দৃশ্যমান সাক্ষী। প্রতিমাসের একটি শুক্রবার আমি আমার সন্তানকে নিয়ে মুজিবনগর আসি। ছেলেকে দেখিয়ে বলতাম- দেখ- তোমার দাদুদের গল্প এখানে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমি তাকে কী দেখাবো?
ভবেরপাড়া গ্রামের প্রবীণ সুভাষ মল্লিক, বয়স এখন আশির কোঠায়। ৭১-এ ভবেরপাড়া মিশনের ফাদার ছিলেন। তিনি বলেনÑ আমরা তখন বুঝিনি এত বড় কিছু হতে যাচ্ছে। শুধু জানতাম, কিছু বড় মানুষ আসবে, দেশ বাঁচানোর কথা বলবে। ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল আশা। শপথগ্রহণের পর শুধু অনুষ্ঠান শেষ হয়নিÑ শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। গ্রামের অনেকেই সরাসরি যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধে। কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ খাবার, কেউ তথ্য। আমরা বন্দুক ধরিনি সবাই, কিন্তু যারা ধরেছে, তাদের পেছনে আমরা ছিলাম।
মুজিবনগর সরকার-এর শপথ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল যুদ্ধের সংগঠিত রূপ, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। একটি গ্রামের অমরত্ব
আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু সেই ১২ আনসারের সালাম, গীতা পাঠের মৃদু উচ্চারণ, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক কলস পানি- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। এই ইতিহাস শুধু বড় নেতাদের নয়- এটি সেই নামহীন মানুষের, যারা নিজেদের আড়ালেই রেখে একটি দেশকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিল।
আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু এই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিস্ফোরণ স্বপ্নের, সাহসের, আত্মত্যাগের। এই গ্রামবাসীরা ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়াননি, কিন্তু ইতিহাসকে দাঁড় করিয়েছেন। তাদের নাম হয়তো বইয়ে নেই, কিন্তু তাদের অবদান ছাড়া ১৭ এপ্রিলের সেই শপথ শুধুই একটি অসম্পূর্ণ আয়োজন হয়ে থাকত। মুজিবনগরের বাতাস আজও যেন বলেÑ আমরা ছিলাম, আছি, থাকবÑ বাংলার স্বাধীনতার নীরব প্রহরী হয়ে। আর
মুজিবনগরের মাটি বলে- স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, অসংখ্য ছোট ছোট ত্যাগের সমষ্টি।

