
বিএনপি সরকার ছাত্র-জনতার নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ধ্বংস করে দিচ্ছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ১২টি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি তাদের দলীয় পদধারী নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি। তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের সরকার জনগণের স্বপ্ন আজ ধ্বংস করে দিচ্ছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই সরকার রাষ্ট্রের সব দপ্তরে নিজেদের দলীয় পদধারী লোকজন নিয়োগ দিচ্ছে।
এছাড়াও আখতার হোসেন বলেন, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপির পদধারী একজনকে বসিয়েছেন সরকার। এই নিয়োগের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন কমিশন কুক্ষিগত করার চক্রান্ত শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠানে সরাসরি দলীয় পদধারী লোক নিয়োগের যে নজির বিএনপি স্থাপন করেছে, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সেই সঙ্গে এই নিয়োগ বাতিল করতেই হবে।
গতকাল রোববার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঝিনাইদহ জেলা শাখার উদ্যোগে ‘জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক পদযাত্রা শেষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, বিএনপিকে মনে রাখতে হবে এই বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিমসহ সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বাংলাদেশ। দেশের জনগণ কোনো ধরনের বৈষম্য মেনে নেবে না। দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে তাড়িয়েছে, কাজেই বিএনপিকে মনে রাখতে হবে। এমন কিছু আপনারা করবেন না, যেন দেশের মানুষের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজার সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, জাতীয় নারী শক্তির সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু এমপি। এসময় ঝিনাইদহের জুলাই শহিদ ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল ইসলামের বাবা আবু বকর সিদ্দিক, মা হাফিজা খাতুন ও শহিদ সাব্বির হোসেনের বাবা আমোদ আলীসহ এনসিপির জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, শেখ হাসিনা ভারতের ওই হেডকোয়ার্টারে বসে বারবার হুঙ্কার দিচ্ছেন, তিনি নাকি দেশে ফিরে আসবেন। শেখ হাসিনা ‘পালাই না, পালাই না’ বলে হুঙ্কার দিয়ে আত্মীয়স্বজন নিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে বলতে চাই, দেশে ফিরে আসুন। আপনাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। ১৪শ’ নিরীহ মানুষকে হত্যার দায়ে, ২৪-এর জুলাই-আগস্টে গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে।
এসময় বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে সরোয়ার তুষার বলেন, নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু তারা নির্বাচিত হওয়ার পরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এই হলো বিএনপির চরিত্র। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের মানুষ ভালোবাসে, সম্মান করে। কিন্তু তারেক রহমান মানুষের সেই ভালোবাসা ও আবেগের সঙ্গে বেইমানি করেছেন।
আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে তুষার আরও বলেন, ঝিনাইদহে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা। আমরা জানি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জেলা সদর ও শহরের আশপাশেই করা হয়। কিন্তু আইনমন্ত্রী তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই মেডিকেল কলেজকে একটি উপজেলায় নিয়ে যাচ্ছেন। এই আইনমন্ত্রী বিএনপির গুপ্তচর হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি বিএনপির আইনমন্ত্রী। এই আইনমন্ত্রী প্রতারণা করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে সর্বপ্রথম বাধা দিয়েছেন। তার চক্রান্তেই সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ থেকে সরে এসেছে। তারেক রহমানের এক কানে ফুঁ দিচ্ছে আইনমন্ত্রী, আরেক কানে ফুঁ দিচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই আইনমন্ত্রীর নির্দেশে ঝিনাইদহে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। বিএনপিকে বলতে চাই, আপনারা আওয়ামী লীগের পথে হাঁটবেন না। আওয়ামী লীগ তো ভারতে আশ্রয় পেয়েছে, আপনারা কোথায় আশ্রয় নেবেন? আপনাদের বঙ্গোপসাগরে ডুবে মরতে হবে।
সমাবেশে এনসিপির নারী শক্তির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু এমপি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আজ খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই বেড়ে গেছে। কিন্তু সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণকে যে প্রত্যাশার গল্প শুনিয়েছিল, তার কোনো বাস্তবায়ন দেশে এখন আর হচ্ছে না। দেশে আজ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, কিন্তু সেই জায়গা দখল করেছে বিএনপি। যুবদল, ছাত্রদল, বিএনপি নেতারা আজ চাঁদাবাজির রেকর্ড গড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে দেশের মানুষ এমন সরকার চায়নি। দেশের মানুষের সঙ্গে তারেক রহমান প্রতারণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলবাজি ও দলীয় লোকজনের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে নির্লজ্জের মতো। সরকারি সব দপ্তরে বিএনপি কেবল তার দলীয় লোকজন নিয়োগ দিচ্ছে। এই সরকার এভাবে চলতে থাকলে তাদের পরিণতি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো হবে। তাদের পালানোর পথ থাকবে না।
এর আগে দুপুর ৩টায় ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ‘জুলাই পদযাত্রা ও শহিদদের স্মরণে’ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শহিদ মিনারের সামনে থেকে পদযাত্রা বের হয়। পদযাত্রাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পায়রা চত্বরে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশ শেষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
এর আগে সকালে জুলাই শহিদ ইঞ্জিনিয়ার রাকিবুল ইসলাম ও শহিদ সাব্বির হোসেনের কবর জিয়ারত করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় তারা শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

