
বিবাহ বিচ্ছেদ শব্দটি শুনলেই আমাদের সমাজে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে একজন অসহায় নারীর ছবি। যেন একটি সম্পর্কের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তার স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং পরিচয়ও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব জীবন অন্য কথা বলে।দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রেই ডিভোর্সি নারীকে একজন মানুষ হিসেবে নয়, একটি সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখে। তাঁর হাসি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে,তাঁর পোশাক নিয়ে ফিসফাস হয়, তাঁর বন্ধুত্বকে কুৎসার রঙ দেওয়া হয়,আর তাঁর চরিত্রকে বিচার করা হয় এমন মানুষদের দ্বারা, যারা তাঁর জীবনের একটি দিনও দেখেনি।কেউ জানতে চায় না একটি সংসার ভাঙার আগে সেই মেয়েটি কতবার নিজেকে ভেঙেছে। সংসার ভাঙার আগে সেই নারী কতবার নিজের ভাঙা মন জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছেন।কত অপমান নীরবে সহ্য করেছেন, কত অবহেলা গিলে ফেলেছেন, কত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে,কত অশ্রু, কত আপস আর কত রাত নির্ঘুম কেটেছে কান্নায়, কতবার নিজের ইচ্ছাকে হত্যা করে সম্পর্কটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।মানুষ বিচ্ছেদের সংবাদ জানে, কিন্তু বিচ্ছেদের ইতিহাস জানে না।
বাংলাদেশে সমাজের প্রতিটি স্তরেই অধিকাংশ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বেশি থাকে কে কী করছে সেটা নিয়েই জানার। ডিভোর্স বিষয়টাকে অনেক সময় মানুষ গুজব ও চমকদার গল্পে পরিণত করে ফেলে।বিবাহবিচ্ছেদের কাগজে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে নারীর বিরুদ্ধে অদৃশ্য এক আদালত বসে যায়। বিচারক হয়ে যায় সমাজ,সাক্ষী হয় গুজব, আর রায় হয় নারী চরিত্রের বিপক্ষে। নিশ্চয়ই মেয়েটির কোনো সমস্যা ছিল তকমা প্রমাণ হয়ে যায় তাদের আদালতে। প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, যুক্তিরও দরকার পড়ে না। কারণ আমাদের সমাজে একজন নারীর বিরুদ্ধে সন্দেহই যেন সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য।সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, আমাদের সমাজে একজন নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা সবচেয়ে সহজ কাজ। প্রমাণ লাগে না, সত্য লাগে না কিছু ইঙ্গিত, কিছু গুজব, আর কিছু পূর্বধারণাই যথেষ্ট থাকে নারীকে কুলসিত করার জন্য।অথচ একটি মানুষের সম্মান নষ্ট করার চেয়ে বড় অন্যায় পৃথিবীতে খুব কমই আছে। প্রশ্ন হলো একটি সম্পর্ক কি কখনো একা একজন মানুষ ভাঙে? সংসার কি একতরফা ভাবে ধ্বংস হয়? যদি না হয়, তাহলে বিচ্ছেদের সমস্ত দায় কেন কেবল নারীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়? কেন একজন পুরুষের ডিভোর্সকে তার নতুন জীবনের শুরু বলে স্বাগত জানানো হয়? অথচ একজন ডিভোর্সি নারীকে সন্দেহ, কটূক্তি এবং অবজ্ঞায় ঢেকে দেয় সমাজ ?
আমরা প্রায়ই পরিবার রক্ষার কথা বলি।কিন্তু যে পরিবারে প্রতিদিন অপমান, সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন কিংবা অসম্মান থাকে, সেই সম্পর্ক ধরে রাখাই কি আদর্শ? একটি বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত দুর্বলতার নয়, অনেক সময় সেটিই সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। কারণ আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাকে সুখী সংসার বলা যায় না।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন নারীর পরিচয় তাঁর বৈবাহিক অবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন মানুষ, একজন নাগরিক, একজন পেশাজীবী, একজন মা, একজন কন্যা, একজন স্বপ্নবাজ।তাঁর পরিচয় তাঁর চরিত্র, কর্ম, মানবিকতা এবং যোগ্যতায় ডিভোর্স শব্দে নয়।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো,অনেক কর্মক্ষেত্র, এমনকি বাসা ভাড়া নেওয়া বা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও একজন বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীকে অতিরিক্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যেন তাঁর বৈবাহিক অবস্থা তাঁর দক্ষতা, সততা বা মানবিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই মানসিকতা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, গভীরভাবে অমানবিক।একজন বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীকে করুণা নয়, সম্মান দিতে শিখতে হবে। তাঁর জীবন নিয়ে গল্প বানানোর আগে তাঁর সংগ্রামকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ প্রত্যেক বিচ্ছেদের পেছনে একটি দীর্ঘ নীরব ইতিহাস থাকে, যা আদালতের নথিতে লেখা থাকে না, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে বেঁচে থাকে।
একজন নারী যখন একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ায় তখন সে শুধু একটি নতুন জীবন শুরু করে না,সে নিজের ভেতরের শক্তিকেও নতুন করে আবিষ্কার করে। যে নারী একসময় সংসারের আড়ালে ইচ্ছা, স্বপ্ন এবং পরিচয়কে গুটিয়ে রেখেছিলো।সেই নারীই সন্তানদের মানুষ করে, নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলে,পরিবারের দায়িত্ব পালন করে এবং নিজের আত্মসম্মানকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যায়।
ইতিহাস বলে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি সৌন্দর্য নয়, সম্পদও নয়,সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মমর্যাদা। যে নারী প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সম্মানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেই নারী আসলে কোনো যুদ্ধে পরাজিত হয় না। হয়তো একটি সম্পর্ক শেষ হয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব, সাহস এবং সম্ভাবনা শেষ হয় না।
তাই বিবাহ বিচ্ছেদকে একজন নারীর ব্যর্থতার গল্প হিসেবে নয়, বরং তার পুনর্জন্মের গল্প হিসেবে দেখা উচিত। কারণ অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় শুরু হয় সেই জায়গা থেকে, যেখানে অন্যরা মনে করে সবকিছু শেষ।একটি সম্পর্ক ভাঙতে পারে, কিন্তু একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীকে ভাঙা এত সহজ নয়।
ইসলাম দাম্পত্য জীবনে শুধু অধিকারের নয়, কর্তব্যেরও শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, “স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে।” (সুরা বাকারা: ২২৮)। আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে দুই পরিবারের প্রতিনিধির মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করার নির্দেশও পবিত্র কোরআনে দেওয়া হয়েছে (সুরা নিসা: ৩৫)। অর্থাৎ ইসলাম বিচ্ছেদকে উৎসাহিত করে না; বরং সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার নির্দেশ দেয়। তালাককে বৈধ করা হয়েছে একান্ত অনিবার্য পরিস্থিতির জন্য।তবে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এবং একসঙ্গে থাকা যদি কষ্ট, নির্যাতন কিংবা অসম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিচ্ছেদ কখনও কখনও মানবিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বিবাহ বিচ্ছেদকে একজন নারীর ব্যর্থতার গল্প হিসেবে নয়, বরং তার পুনর্জন্মের গল্প হিসেবে দেখা উচিত। কারণ অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় শুরু হয় সেই জায়গা থেকে, যেখানে অন্যরা মনে করে সবকিছু শেষ। একটি সম্পর্ক ভাঙতে পারে, কিন্তু একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীকে ভাঙা এত সহজ নয়।একটি সম্পর্কের সমাপ্তি একজন মানুষের সম্ভাবনা, মর্যাদা কিংবা স্বপ্নের সমাপ্তি নয়।
লেখক: কবি ও উদ্যোক্তা

