
মেহেরপুর জেলার নারী শিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ “মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়”। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। দিন দিন শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, সরকারি ও বেসরকারি ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ, বিদ্যালয়ের মূল্যবান সম্পদ তছরুপ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে চরম অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গত রবিবার সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সাথে আলাপকালে বিদ্যালয়টির চরম অনিয়ম ও হরিলুটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন ৬টি করে ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা জানায়, অধিকাংশ দিনই মাত্র ৩ থেকে ৪টি ক্লাস সম্পন্ন হয়। অবশিষ্ট সময় ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভেঙে যে যার মতো স্কুল প্রাঙ্গণ ও বাইরে ঘোরাঘুরি করে। প্রতিদিনের টিফিনের টাকা নেওয়া হলেও টিফিন দেওয়া হচ্ছে না।
ক্লাসরুম এবং বারান্দার দেয়ালে দেয়ালে অত্যন্ত আপত্তিকর ও নোংরা কথাবার্তা লেখা রয়েছে, যা প্রকাশ করা লজ্জাজনক।
পরিদর্শনে দেখা যায়, কম্পিউটার ল্যাবের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও পরিত্যক্ত। কোনো টেবিলে সচল কম্পিউটার নেই। পাবলিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার খাতা মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় রাখা হয়েছে। নথিতে ১১টি কম্পিউটার ও ৫টি ল্যাপটপের থাকা কথা থাকলেও ল্যাবে কোনো ল্যাপটপের অস্তিত্ব মেলেনি এবং কয়েকটি ভাঙাচোরা কম্পিউটার মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিটি ধুলোবালি ও নোংরা পরিবেশে আচ্ছন্ন, যেখানে পড়াশোনার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। লাইব্রেরির রেজিস্টার খাতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরে মাত্র কয়েকবার শিক্ষার্থীদের বই ইস্যুর জন্য এই কক্ষটি খোলা হয়।
শিক্ষক কনফারেন্স রুমে সরকারি অর্থায়নে ২টি এসি লাগানো ছিল। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যোগদানের পর মেরামতের অজুহাতে দুইট এসি খুলে নিয়ে যান। পরে একটি এসি লাগানো হলেও বিগত দেড় বছরেও আর একটি এসি বিদ্যালয়ে ফেরত আনা হয়নি।
বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের বাউন্ডারি রেলিং দীর্ঘদিন ধরে ভেঙে পড়ে থাকলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ে ৩টি মূল্যবান কাঠের খাট (প্রতিটির মূল্য ৫০,০০০ টাকার বেশি) থাকার কথা থাকলেও মাত্র ১টি পুরাতন খাট পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষকরা জানান, প্রত্যেক প্রধান শিক্ষক যোগদান করার সময় আগের প্রধান শিক্ষকের কাছে থেকে বিদ্যালয়ের সকল কিছুর হিসাব বুঝে নেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফও যোগদানের সময় আগের প্রধান শিক্ষকের সাথে সবকিছু বুঝে নিয়েছেন। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতেন। আব্দুল লতিফ স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে শিক্ষকদের সাথে অসাদাচারণ, বিভিন্ন ফান্ডের টাকা গোপনে আত্মসাৎ, স্কুলের এসি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ক্যামেরা তছরুপ করেছেন। ছাত্রীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে অত্যবশ্যক ফান্ডের নামে নিয়মিত টাকা আদায় করা হলেও বেসরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বন্ধ করার অভিযোগ ছিলো। টিফিনের ফিস নেওয়া হলেও নিয়মিত টিফিনও দেওয়া হয়না। সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কাজের অনিয়মের মিথ্যা অপবাদ ও ভয় দেখিয়ে প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাইটগার্ড আকবর এবং দপ্তরি আব্দুস সালামের বেতন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে।
শিক্ষকরা আরো জানান, এ বছর মন্ত্রণালয় থেকে গাছ লাগানোর জন্য মোটা অংকের টাকা বরাদ্দ এসেছে। কতটাকা এসেছে তা শিক্ষকদের জানানো হয়নি। এছাড়া বিদ্যালয়ের ভবন মেরামতের জন্য বরাদ্দ আসলেও কোন মেরামত করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের দপ্তরি আব্দুস সালাম বলেন, “আমি হেডস্যারের ব্যক্তিগত কথা শুনিনি বলে তিন মাস আমার বেতন বন্ধ করে রেখেছিলো। পরে অনেক বলাবলির পর এখন বেতন দিচ্ছে।”
বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সেকেন্দার আলী মেহেরপুর প্রতিদিনের প্রতিবেদকদের সামনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফকে বলেন, আপনি যাওয়ার আগে আমাকে সকল কিছুর হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন, না হলে আমি দায়িত্ব নিতে পারবো না। আমি যা যা বুঝে পাবো, সেগুলোর দায় আমার থাকবে। উল্লেখ্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ চলতি মাসে ৩০ তারিখে অবসরে যাবেন। বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সেকেন্দার আলী সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাবেন।
তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ের কম্পউটার, ক্যামেরা, খাটের বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। আগের প্রধান শিক্ষক আমাকে কিছুই বুঝিয়ে দিয়ে যায়নি। ক্লাসের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকদিন পর সব ক্লাস শুরু হবে। গাছ লাগানোর বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের পিছন দিকে গাছ লাগানো হয়েছে।

