
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উদ্বেগজনক এবং নজিরবিহীন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজনীতিতে আদর্শ, যুক্তি আর জনকল্যাণের বিতর্কের জায়গাটি ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ, ব্যক্তিগত কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং চরম অশ্লীল ভাষা।
সম্প্রতি গত ৩০ মে শনিবার মেহেরপুরের গাংনীতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদৎ বার্ষিকী পালন উপলক্ষে এক সমাবেশে অশালীন ও কুরুচিকর বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান বাবলু।
সেখানে যে ধরনের অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন তা সচেতন সমাজকে স্তব্ধ ও লজ্জিত করেছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাগাড়ম্বর বা তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিরোধিতার নামে প্রকাশ্য জনসভায় অশ্লীল শব্দচয়ন, প্রতিপক্ষকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ কিংবা নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ধরনের আচরণ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক শ্রেণির নেতার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অবক্ষয়ের শেষ সীমা কোথায়?
একজন রাজনৈতিক নেতা যখন মঞ্চে দাঁড়ান, তখন তিনি কেবল নিজের দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেন। জনসভার সামনে দাঁড়িয়ে যখন প্রকাশ্য মাইকে অশালীন শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশকেই বিষাক্ত করে না, বরং গোটা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দেয়। প্রশ্ন উঠছে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের এবং নেতাদের ন্যূনতম আচরণবিধি শেখাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? ক্ষমতার দাপট বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অন্ধ মোহ কি আমাদের ন্যূনতম সৌজন্যবোধকেও গ্রাস করে নিয়েছে?
বিষাক্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ
রাজনীতির মাঠ থেকে আসা এই নোংরা ভাষা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের মুঠোফোনে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম। তারা যখন দেখে সমাজের তথাকথিত ‘নেতারা’ কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই অনায়াসে এসব ভাষা ব্যবহার করছেন, তখন তারা একেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছে। এটি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষার পরিপন্থী।
রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা ও দায়
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, দলের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতার মুখ থেকে এমন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আসার পর দলের পক্ষ থেকে সাধারণত কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। উল্টো অনেক সময় একে ‘স্লিপ অফ টাং’ বা ‘কথার কথা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ই অন্য নেতাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
রাজনীতি হোক যুক্তির, মতাদর্শের এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার। কাদা-ছোড়াছুড়ি আর অশ্লীলতা দিয়ে সাময়িক করতালি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা পুরো জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করা তাদেরও দায়িত্ব। এই নোংরা সংস্কৃতির অবসান এখনই প্রয়োজন।

