
বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ফরহাদ মঝহার বলেছেন, লালনের দর্শনে দেহতত্ত্ব, রসতত্ত্ব ও ভাবতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি বলেন, “আমরা রস উপলব্ধি করি। রস মানে ভালোবাসা। আমরা আজ সাধুভক্তরা এখানে এসেছি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে। পরস্পরের সঙ্গে জানাশোনা, মিলন—এসবই রসের প্রকাশ।”
সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের স্মরণোৎসব ও দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাধুসঙ্গের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, লালনের দর্শনে দেহতত্ত্ব, রসতত্ত্ব ও ভাবতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি মানুষকেই সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। জাত-পাত, বর্ণভেদ ও ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মিলনের যে দর্শন তিনি দিয়েছেন, দোল উৎসব সেই চর্চারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
দোল পূর্ণিমা ও সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য উল্লেখ করে ফরহাদ মঝহার বলেন, লালনের জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার রাতে সাধুসঙ্গ আয়োজনের রীতি ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় এই দোল উৎসব পালিত হয়। দেশ-বিদেশ থেকে বাউল, ফকির, গবেষক ও দর্শনার্থীরা এখানে সমবেত হন। আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে চলে লালনগীতি পরিবেশন, দর্শনচর্চা ও সারারাতব্যাপী সাধুসঙ্গ।
ফরহাদ মঝহার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি ছাত্র থাকাকালে এখানে আসতাম। তখন কুপি জ্বালিয়ে বাঁশবাগানে সাধুসঙ্গ হতো। এখন অনেকেই আর নেই।” তিনি দোল উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে সকলকে বিনয়ী থাকার আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন, নারীদের মধ্যে এই বিনয়ের চর্চা বেশি দেখা যায়।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. ইকবাল হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন।
অনু্ষ্ঠানে মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মীর তনিমা।
জানা গেছে, মরমি সাধক লালন শাহ তার জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার রাতে শিষ্যদের নিয়ে রাতে কালীগঙ্গার ধারে সাধুসংঘে বসতেন। তারই ধারাবাহিকতায় লালন শাহের তিরোধানের পরও প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শেষদিকে লালনের আখড়াবাড়িতে দোলপূর্ণিমা বা স্মরণোৎসব উদযাপন হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় দোলপূর্ণিমা তিথিতে প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় ফকির লালন শাহ স্মরণোৎসব। সাধু-গুরু, লালনভক্তদের সরব উপস্থিতি, গান ও গ্রামীণ মেলায় জমজমাট হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ। এবার রমজানের কারণে একদিনই উদযাপিত হয় স্মরণোৎসব। ছিল না সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা।
এদিকে এই উৎসব উপলক্ষে কয়েক দিন আগে থেকেই আখড়াবাড়িতে আসতে শুরু করেছেন লালনভক্ত বাউল ফকিররা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে লালনের গান। দলে দলে বিভক্ত হয়ে বাদ্যযন্ত্রের তালে গান পরিবেশন করছেন তারা। তবে এবার আখড়াবাড়িতে ভক্তদের উপচেপড়া ভিড় নেই। আখড়াবাড়ির প্রবেশপথের দেওয়াল ঘেরা বিকেলে সরেজমিন এমর দৃশ্য দেখা যায়।

