
ভোরের আলো ফোটার আগেই কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন এলাকায় শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। পত্রিকার বাণ্ডিল গোছানো, হকারদের মাঝে বণ্টন এবং বিভিন্ন রুটে পাঠানোর প্রস্তুতি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রবীণ সংবাদপত্র এজেন্ট ইউসুফ আলী। ১৯৭২ সাল থেকে সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটি কুষ্টিয়ার পত্রিকা পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার এক পরিচিত নাম।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সংবাদপত্র ছিল মানুষের তথ্য ও সচেতনতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা সীমিত থাকলেও সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজে ছিল দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা। ইউসুফ আলীর পথচলাও শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকেই।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ইউসুফ আলী পত্রিকার বাণ্ডিল গোছাতে ব্যস্ত। হকারদের বুঝিয়ে দেওয়া, টাকা গ্রহণ এবং হিসাব খাতায় লিপিবদ্ধ করার কাজও নিজ হাতে করছেন তিনি।
কথা হলে ইউসুফ আলী জানান, ১৯৭২ সালে তিনি পত্রিকার হকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময় দেশের জনপ্রিয় দৈনিকগুলোর মধ্যে ছিল ইত্তেফাক, পূর্বদেশ, গণকণ্ঠ, সংবাদ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক আজাদ এবং ইংরেজি দৈনিক অবজারভার। এসব পত্রিকা নিয়মিত পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন তিনি।
তৎকালীন সময়ে ঢাকায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলো প্রথমে বিমানে করে যশোরে আনা হতো। পরে যশোর থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাত। গভীর রাত কিংবা ভোরে স্টেশনে গিয়ে পত্রিকার বাণ্ডিল সংগ্রহ করে তা দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। সেই সংগ্রামী সময়ের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইউসুফ আলী।
প্রথমদিকে হকার হিসেবে কাজ করলেও ধীরে ধীরে নিজের সততা, নিষ্ঠা ও শ্রমের মাধ্যমে সংবাদপত্র ব্যবসায় একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। সাপ্তাহিক পত্রিকা সরবরাহের মাধ্যমে কাজের পরিধি বাড়িয়ে পরবর্তীতে জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার এজেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্সি কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের পরিবেশনা ও বিপণনের দায়িত্বও যুক্ত হয় তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ইউসুফ আলীর এজেন্সির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় সংবাদপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। তার অধীনে কাজ করে বহু হকার ও কর্মচারী জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পেয়েছেন। অনেকেই পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং নিজ নিজ পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও সফল ইউসুফ আলী। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন এবং সবার বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি একটি আদর্শ ও সুখী পরিবারের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত। পরিবারে রয়েছে পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের চর্চা, যা তাকে আরও সম্মানিত করেছে স্থানীয় সমাজে।
প্রবীণ এই সংবাদপত্র ব্যবসায়ীর মতে, একসময় পত্রিকার জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। ভোরে পত্রিকা হাতে না পেলে অনেক পাঠক অপেক্ষা করতেন। রাজনৈতিক সংবাদ, খেলাধুলা, সাহিত্য, চাকরির খবর কিংবা সম্পাদকীয় পড়ার জন্য আলাদা আগ্রহ ছিল পাঠকদের মধ্যে। বর্তমানে অনলাইন গণমাধ্যমের প্রসার বাড়লেও এখনও অনেক পাঠকের কাছে ছাপা পত্রিকার আবেদন অটুট রয়েছে।
দীর্ঘ এই পথচলায় নানা প্রতিকূলতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। বন্যা, পরিবহন সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও সংবাদপত্র সরবরাহ বন্ধ রাখেননি তিনি। দায়িত্ববোধ ও পেশার প্রতি ভালোবাসাই তাকে আজও মানুষের কাছে অনুকরণীয় করে রেখেছে।
স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক আবদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, “ইউসুফ আলী শুধু একজন পত্রিকা এজেন্ট নন, তিনি কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র জগতের একটি নির্ভরতার নাম। দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সংবাদপত্র পরিবহনের কাজ করে যাচ্ছেন। তার মতো পরিশ্রমী মানুষদের কারণেই ভোরবেলায় পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে যায়। সংবাদপত্র শিল্পে তার অবদান অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।”
দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার নিজস্ব প্রতিনিধি তারিকুল হক তারিক বলেন, “একসময় সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। সেই কঠিন সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইউসুফ আলী অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি শুধু নিজের কর্মজীবনই গড়ে তোলেননি, তার মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি পরিশ্রম ও সততার একটি অনুকরণীয় উদাহরণ।”
কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে ইউসুফ আলী শুধু একজন পত্রিকা এজেন্ট নন, তিনি একটি ইতিহাসের অংশ। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সংবাদপত্র পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন এই অঙ্গনের এক নীরব সংগ্রামী, পরিশ্রমী ও সফল ব্যক্তিত্ব।

