
আলমডাঙ্গা পৌরসভা নামেই শুধু প্রথম শ্রেণির পৌরসভা; বাস্তবে এখানে রাস্তাঘাট ও পানি নিষ্কাশনের উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই, মেলেনি কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবাও। সকল প্রকার উন্নয়নের বাইরে রয়ে গেছে বন্ডবিল ৯ নম্বর ওয়ার্ডসহ পৌরসভার বেশিরভাগ এলাকা। দৃশ্যমান কিছু আধুনিকতার ছোঁয়া কেবল মেলে উপজেলা চত্বর, হাইরোড ও থানার সম্মুখে। পৌরসভার পাশ ঘেঁষেই রয়েছে মাছের বাজার, কাপড়পট্টি ও টহবাজার, যেখানে অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
চার দশকের অপেক্ষা আর ৫ হাজারের বেশি মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন— “আমরা কি সত্যিই পৌরসভার নাগরিক?”
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আলমডাঙ্গা পৌরসভাটি দীর্ঘ পথচলায় প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা, ড্রেন, সড়কবাতি ও বাজার উন্নয়নসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও সেই উন্নয়নের ছোঁয়া এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বন্ডবিল এলাকায়।
পৌরসভা সূত্রমতে, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মোট জনসংখ্যা ৫ হাজার ৪৮১ জন। এখানে ৭৩৭টি হোল্ডিং এবং প্রায় ২ হাজার৩০০ ভোটার রয়েছেন। প্রতি বছর এই ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ— কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়মিত পরিশোধ করলেও নাগরিক সুবিধা থেকে তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকায় কোনো পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকার মানুষকে এখনও কাঁচা রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও তাদের জীবনযাত্রার মান অনেকাংশে ইউনিয়ন পর্যায়ের অনুন্নত এলাকার মতোই রয়ে গেছে। ওয়ার্ডের ভেতরের প্রধান সড়কটিও বিভিন্ন স্থানে ভেঙেচুরে পড়ে আছে, যা সংস্কারে দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, সড়কবাতির অবস্থাও অত্যন্ত হতাশাজনক। কিছু স্থানে খুঁটি ও বাতি স্থাপন করা হলেও অনেকগুলোতে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে রাতের বেলায় চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষায়, “পৌরসভা হওয়ার পর থেকে অনেক নির্বাচন দেখেছি। প্রতিবারই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে বন্ডবিলে বড় ধরনের কোনো উন্নয়ন চোখে পড়েনি।”
তরুণদের অভিযোগ আরও স্পষ্ট। তাদের মতে, আলমডাঙ্গা পৌরসভার অন্যান্য ওয়ার্ডের তুলনায় ৯ নম্বর ওয়ার্ড উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। নাগরিক সুবিধার দিক থেকে এই ওয়ার্ডটি এখনো পৌর এলাকার পরিবর্তে একটি অবহেলিত ইউনিয়নের চিত্র বহন করছে।
একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যদি ইউনিয়নের অধীনে থাকতাম, তাহলে কর কম দিতে হতো। কিন্তু প্রথম শ্রেণির পৌরসভার নাগরিক হয়েও আমরা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না।”
স্থানীয়দের দাবি— এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশনের জন্য কালভার্ট ও ব্রিজ নির্মাণ, ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং কার্যকর সড়কবাতির ব্যবস্থা করা হোক।
২০০৪ সালে আলমডাঙ্গা পৌরসভা প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার পর দুই দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বন্ডবিল এলাকার মানুষের প্রত্যাশিত নাগরিক উন্নয়ন বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটাররা এবার প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তাদের মতে, রাস্তা, ড্রেনেজ, সড়কবাতি, নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই হবে আগামী নির্বাচনের প্রধান ইস্যু।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভার পরিচয় পাওয়ার বহু বছর পরও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাজারো মানুষের মনে আজও একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— “আমরা পৌরসভাকে কর দিচ্ছি, কিন্তু পৌরসভার নাগরিক সুবিধা কি সমানভাবে পাচ্ছি?” এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে বন্ডবিলের প্রায় আড়াই হাজার ভোটার এবং ৫ হাজারের বেশি সাধারণ নাগরিক।

