
এক সময় বিকেল হলেই গাংনী উপজেলার গ্রাম ও পাড়া-মহল্লার খেলার মাঠগুলো শিশু-কিশোরদের কোলাহলে মুখর থাকতো। ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকতো তরুণরা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। খেলার মাঠগুলোতে নেমে এসেছে নীরবতা, আর তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোনে গেম খেলে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো মাঠে খেলাধুলার দৃশ্য এখন প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ কিশোর-তরুণ দিনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে মোবাইল স্ক্রিনে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গাংনী পৌর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, আগে বিকেল হলেই মাঠে ছেলেদের খেলতে দেখা যেত। এখন তারা মোবাইলে বেশি সময় দিচ্ছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের মেম্বার জিনারুল ইসলাম বলেন, আমি নিজেও দীর্ঘদিন সুনামের সাথে খেলাধুলা করেছি এবং বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে খেলেছি। সেই সময় খেলাধুলার একটি সুন্দর পরিবেশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই প্রজন্মকে দেখে আমি সত্যিই অবাক হই। তারা খেলাধুলা থেকে অনেকটাই বিমুখ হয়ে মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে মাদকাসক্তির ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন মেম্বার হিসেবে বলছি, আমার মনে পড়ছে না শেষ কবে কোনো ছেলে আমার কাছে খেলার বল চেয়েছে। তারা তো এখন আর খেলাধুলামুখী নয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের খায়রুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলে এখন আর খেলাধুলা করে না। আগের মতো মাঠে যাওয়ার অভ্যাসও নেই।
বর্তমানে তারা মোবাইল ফোনে বেশি ব্যস্ত থাকে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। অবসর সময়ের অপব্যবহারের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনই সবাইকে সচেতন হতে হবে।
প্রবীণ ফুটবল খেলোয়াড় হাফিজুর রহমান বলেন, এক সময় আশেপাশের ৭-১০ গ্রামের খেলোয়াড়রা একসাথে মাঠে খেলতাম, এখনো অনেকেই আমাদের খেলোয়াড় হিসেবে চেনে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলা শরীর-মন ভালো রাখার পাশাপাশি সামাজিকতা ও সম্মানবোধ শেখায়। তাই তরুণদের আবার মাঠমুখী করা জরুরি, যাতে তারা মাদকের মতো ক্ষতিকর পথে না যায়।
কুতুবপুর স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের সময় মাঠ মানেই ছিল খেলোয়াড়ে ভরা। আমরা নিয়মিত খেলাধুলা করতাম এবং বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে সুনামের সঙ্গে খেলতাম। এমনকি ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও মাঠে খেলোয়াড়দের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যেত। কিন্তু এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এত বড় মাঠেও একজন খেলোয়াড় দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্ম খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গিয়ে মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে ভয়াবহভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা একটি পুরো প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এতে পরিবার ও সমাজ উভয়ই চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় তরুণ প্রজন্মকে খেলামুখী করতে পারলে মাদকাসক্তির ঝুঁকি কমবে।
শিক্ষক রেজাউর রহমান জানান, খেলাধুলা শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মোবাইল আসক্তির কারণে তারা সামাজিকতা ও সৃজনশীলতা হারাচ্ছে।
গাড়াবাড়ীয়া ফুটবল একাদশের অধিনায়ক হামিম আহমেদ বলেন, এখন প্র্যাকটিসের জন্য খেলোয়াড় পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে খেলা হলেও অনেকেই মোবাইলে ব্যস্ত থাকে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তিও বাড়ছে।
এদিকে সমাজকর্মীদের মতে, খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়ায় তরুণরা অবসর সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না, যা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মাদকের মতো ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক অভ্যাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তারা মনে করেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম আয়োজন, খেলার মাঠ সংরক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণদের সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
শিক্ষক ও সমাজসচেতন মহল মনে করছেন, খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়া তরুণদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তারা বলছেন, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

