
বাড়ির দেয়াল উঁচু হয়, মানুষের মন উঁচু হয় না।
ছলিমদ্দিনের পাকা বাড়ি দেখে মফিজউদ্দিনের বুকে আগুন জ্বলে। মফিজউদ্দিনের দোতালা দেখে ইয়াজউদ্দীনের ঘুম হারাম। এই যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা — এর কোনো শেষ নেই, কোনো বিজয়ী নেই। শুধু আছে একটার পর একটা বিসর্জন।
প্রথমে বিসর্জন দেওয়া হয় নিজেকে। তারপর সংসারকে।
বিমানবন্দরে যেদিন বাবা চলে যায়, ছেলেটার বয়স হয়তো এক বছর। মা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা পেছন ফিরে তাকায়, চোখ ভেজে, তারপর গেটের ভেতর হারিয়ে যায়। সেই যে হারানো — সেটা আর কখনো পুরোপুরি ফেরে না।
বাবা ফেরে। দুই বছরে একবার, তিন বছরে একবার। ব্যাগ ভর্তি কাপড়, মিষ্টি, হয়তো একটা খেলনা। কিন্তু ছেলেটা তখন আর সেই এক বছরের শিশু নেই। সে এখন পাঁচ, সাত, দশ। বাবার সাথে তার একটা অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে — যে দূরত্ব টাকায় মাপা যায় না, ভালোবাসায়ও ঘোচানো কঠিন।
বাবা জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছিস?”
ছেলে বলে, “ভালো।”
তারপর দুজনেই চুপ।
এই নীরবতাই প্রবাসের আসল মূল্য।
মা একা। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।
সংসার সামলায়, শাশুড়ি সামলায়, পাড়ার কথা সামলায়। রাতে ঘর ফাঁকা। পাশে কেউ নেই কথা বলার। স্বামীর গলার স্বর এখন শুধু ফোনের স্পিকারে। ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়, কিন্তু স্পর্শ পৌঁছায় না।
এই শূন্যতা ভরাট করতে টিভি জ্বলে, মোবাইল জ্বলে। স্টার জলসার মা মরলে কাঁদে, নিজের একাকীত্বে চোখ শুকনো থাকে। মানুষ অভ্যাস করে নেয় — ব্যথাটাকেও।
কিন্তু সন্তান? সন্তান তো মায়ের এই ভেতরের ক্লান্তি বুঝতে পারে না। সে শুধু দেখে মা সারাদিন ফোনে থাকে। সেও শেখে — ফোনই সঙ্গী।
স্মার্টফোনটা এলো ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে।
বাবা পাঠিয়েছে — যাতে মুখ দেখতে পায়, কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই ফোনের ভেতরে শুধু বাবার মুখ নেই। আছে এক অসীম দুনিয়া — যেখানে কোনো দরজা নেই, কোনো পাহারাদার নেই।
তেরো বছরের একটা মেয়ে, যে ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতে পারে না, সে অনায়াসে খুঁজে নেয় এমন সব জগৎ — যেখানে তার যাওয়ার কথা ছিল না আরো দশ বছর। কৌতূহল দোষের নয়। দোষ হলো — পাশে কেউ নেই বোঝানোর।
বাবা নেই। মা ক্লান্ত। শিক্ষক ব্যস্ত। সমাজ নির্বিকার।
তখন ফোনই হয় বন্ধু, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক — আর কখনো কখনো সর্বনাশের নিমন্ত্রণকর্তা।
ঘরের দেয়াল উঠছে।
ভেতরের বন্ধন খসে পড়ছে।
বাবা বিদেশে বসে হিসেব করে — আর কত বছর? আর কত টাকা? তারপর ফিরে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সময় কারো জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। মেয়ে বড় হয়ে গেছে অচেনা পথে। ছেলে শিখে গেছে বাবা ছাড়া বাঁচতে। বৌ শিখে গেছে একা থাকতে — আর একা থাকতে থাকতে কখনো কখনো ভুল পথে সান্ত্বনা খুঁজতে।
এই ক্ষতগুলো টাকায় সারে না। দামি টাইলসের মেঝেতে এই ব্যথার দাগ ঢাকা পড়ে না।
কথাটা এই নয় যে বিদেশ যাওয়া পাপ।
কথাটা এই — যাওয়ার আগে ভাবতে হবে কী রেখে যাচ্ছি।
টাকা রোজগার জীবনের দরকার। কিন্তু জীবনটা শুধু টাকার জন্য নয়। একটা বাচ্চার বাবার কণ্ঠস্বর দরকার — শুধু ফোনে নয়, কাছে থেকে। একটা মেয়ের নিরাপত্তা দরকার — শুধু পাকা ঘরের নয়, উপস্থিত অভিভাবকের। একটা মায়ের সঙ্গ দরকার — শুধু মাসে মাসে টাকা পাঠানোর নয়, পাশে থাকার।
পরিবার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয় যে শুধু জমা দিলেই সুদসহ ফেরত পাবে।
পরিবার হলো গাছের মতো — নিয়মিত জল না পেলে শিকড় শুকিয়ে যায়, তখন যত পানিই ঢালো, আর কাজ হয় না।
প্রবাসের মাটিতে প্রতিটি দিন যুদ্ধ।
রোদে পুড়ে, শীতে কাঁপে, অপমান হজম করে, মাটি কামড়ে পড়ে থাকে মানুষ। শুধু একটা স্বপ্নের জন্য — ফিরে গিয়ে পরিবারকে একটু ভালো রাখবে।
কিন্তু যখন শোনে — মেয়ে চলে গেছে, বৌ নেই, ছেলে অচেনা হয়ে গেছে — তখন সেই যুদ্ধের কোনো মানে থাকে না।
অনেকেই ভাববেন, তাহলে কি প্রবাসে যেয়ে ভাগ্য অন্বেষণ করা ভুল, এগুলো কি শুধু প্রবাসীদের ক্ষেত্রেই ঘটে। না, এখানে প্রবাসী একটা মেটাফর বা উপমা। এ দেশে থেকে যারা প্রবাসীদের মতো জীবন যাপনে অভ্যস্ত বা পারিবারিক দ্বায়িত্ব থেকে উদাশীন বা অজ্ঞ, বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পরিবারকে দেখভাল, সন্তান সন্তানাদিদের যথাযথ মানুষ করা একজন অভিভাবক হিসেবে প্রধান কাজ। না হলে সব কিছু অর্জন বিসর্জন হয়ে ঘরে ফেরার জায়গা না থাকে আপনার ভবিষ্যত বলে কিছুই থাকলো কি? জয়ী হওয়া যোদ্ধার ফেরার জায়গা না থাকলে বিজয়টা কোথায়?
টাকা পয়সা দরকার আছে। অবশ্যই দরকার আছে কিন্তু তার চেয়েও আমাদের দরকার নৈতিকতা মানবিকতা সুশিক্ষা ও সুশৃঙ্খল একটা জীবন। বিদেশের মাটিতে এক একটা দিন যে কি কঠিন তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে।
শেষ পর্যন্ত হিসেব মেলানোর দিনে — কত ইট গাঁথলাম সেটা জিজ্ঞেস করবে না কেউ। জিজ্ঞেস করবে, কতটুকু মানুষ হলাম — আর কতটুকু মানুষ গড়লাম।
গরিব কৃষকের চার সন্তান। তিনের চালের দূর ঘরে, দুমুঠো ভাত, ভায়ে ভায়ে কি অদ্ভুত মিল। কৃষক আজ ধনী হয়েছে। পাচ তলা বাড়ি – সব ছেলেকে প্রতি তলা ভাগ করে দিয়েছে।
এখন ভায়ে ভায়ে প্রতিদিন ঝগড়া, ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মামলাও আছে। চাচাতো ভাইরা কেউ কাউরের মুখ দেখে না। তারা পরষ্পর আজ ভাই না, হিস্যা আদায়কারী।
বাবা মা ভাই বোন সবাই মিলেমিশে একটা পরিবার গড়ে না উঠলে এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতির ভিতর আমাদের বেচে থাকার নামই কি জীবন????
লেখক: বিএসএস (সম্মান), সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢা.বি।

