
কুষ্টিয়াজুড়ে তামাক চাষের বিস্তারে কৃষিজমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তামাক কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন প্রণোদনা ও আশ্বাসে জেলার হাজারো কৃষক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এতে কৃষি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তামাক চাষ কৃষকদের তাৎক্ষণিক নগদ আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। যে জমিতে সরিষা, ডাল, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব, সেই জমি তামাক চাষে ব্যবহৃত হলে এর প্রভাব শুধু একজন কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি, মাটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা।
পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ, আইন প্রয়োগ এবং তামাকের বিকল্প লাভজনক ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা না গেলে কুষ্টিয়ার কৃষিজমি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মিরপুর উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা ও বোরো ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের পরিবর্তে তামাক চাষ করা হচ্ছে। ফলে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তামাক কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন প্রণোদনা, বীজ ও ঋণের সহজলভ্যতা এবং আগ্রাসী বিপণন ব্যবস্থার কারণে কৃষকেরা তামাক চাষে আকৃষ্ট হচ্ছেন। তবে এই সাময়িক অর্থনৈতিক লাভের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা কমে যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমানের মতে, তামাক চাষের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে খাদ্যশস্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের টেকসই কৃষিব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ভুট্টা, মিষ্টিকুমড়া, সরিষা ও বোরো ধানের মতো লাভজনক ফসল চাষে সরকারি প্রণোদনা, ঋণসুবিধা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
তামাক চাষের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে বিএটিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরে তথ্য দেওয়া হবে বলে তাঁরা জানান।
তামাক চাষের বিস্তারে একদিকে ফসলি জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে সরকার রাসায়নিক সারে দেওয়া ভর্তুকির কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করতে পারছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি বছর রাসায়নিক সারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দেয়। অভিযোগ রয়েছে, তামাক চাষিরা বিভিন্ন কার্ড ও কোম্পানির ঋণসুবিধার মাধ্যমে এসব ভর্তুকিমূল্যের সার ব্যবহার করছেন। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিবর্তে তামাক চাষে ভর্তুকিযুক্ত সার ব্যবহারের বিষয়টি কৃষি ও সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

