
মেহেরপুর জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উদ্যোগে আজ এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নবগঠিত সঞ্জীবন প্লাটুন গঠনের রূপরেখা এবং ঐতিহাসিক গার্ড অব অনার প্রদানকারী সদস্যদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার সময় মুজিবনগর উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানমালার প্রথম পর্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার প্রদানকারী জীবিত দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিমুদ্দিন শেখ ও সিরাজুল ইসলামকে সম্মাননা জানানো হয়।
দ্বিতীয় পর্বে “সঞ্জীবন প্লাটুন গঠন, প্রকল্প নির্বাচন ও সদস্য/সদস্যাদের করণীয়” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
দুটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিভিএম, পিভিএমএস, খুলনা রেঞ্জ কমান্ডার আব্দুস সামাদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও মেহেরপুর জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জেলা কমান্ড্যান্ট আল-আমিন উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আনসার বাহিনীর যে বীর সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন, তাঁদের বীরত্বগাথা স্মরণ করে তাঁদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে জেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের সঞ্জীবন প্লাটুনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই বিশেষ টিম গ্রামীণ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কীভাবে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ করবে, তার একটি দিকনির্দেশনামূলক রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
মুজিবনগর উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার ডিঙ্গেদহ ৯ আনসার ব্যাটালিয়নের পিভিএমএস সাজ্জাদ মাহমুদ।
আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যের দুটি মূল বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ঐতিহাসিক গার্ড অব অনার প্রদানকারী সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঐতিহাসিক মুহূর্তটি স্মরণ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁদের স্মরণ করছি, যাঁরা একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে আমাদের প্রথম সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন।
তাঁদের সেই সাহসিকতা ছিল আমাদের স্বাধীনতার প্রাথমিক ভিত্তি। আনসার বাহিনীর জন্য এর চেয়ে বড় গৌরবের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। এই সম্মাননা প্রতীকী মাত্র; প্রকৃত সম্মাননা হলো তাঁদের আদর্শকে বুকে ধারণ করে দেশের জন্য কাজ করা। বর্তমান প্রজন্মের আনসার সদস্যদের এই গৌরবময় ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত হতে হবে এবং সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে।”
সঞ্জীবন প্লাটুন গঠন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সঞ্জীবন প্লাটুন’ গঠনের লক্ষ্য হচ্ছে বর্তমান বাস্তবতায় জনসংখ্যার চাপ, সীমিত কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ বিপুল মানবসম্পদকে সুসংগঠিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে বাহিনীর অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলা, স্থানীয় পর্যায়ে গভীর সম্পৃক্ততা এবং দ্রুত সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা দেশের জন্য এক অনন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ শক্তিকে কাজে লাগানো গেলে এটি একটি কার্যকর ও টেকসই কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়ন মডেলে রূপান্তরিত হতে পারে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রায় ৬০ লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবী সদস্য দেশের সর্ববৃহৎ সংগঠিত জনশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
এ বাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সহযোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীর দায়িত্ব ও কার্যপরিধি এখন ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা সহায়তার গণ্ডি অতিক্রম করে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গার ডিঙ্গেদহ ৯ আনসার ব্যাটালিয়নের পিভিএমএস সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, “আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এমন একটি বাহিনী, যার নামের মধ্যেই প্রাণের সঞ্চার করার শক্তি লুকিয়ে আছে।” আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের মূল দায়িত্ব হবে গ্রামীণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা করা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও মাদক প্রতিরোধের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা এবং সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। মনে রাখবেন, আপনাদের আচরণ এবং কাজের মাধ্যমেই আনসার বাহিনীর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিটি পদক্ষেপে নিষ্ঠা ও সততার পরিচয় দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে উন্নয়ন ব্যাংক, গাংনী, মেহেরপুর; উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা (সদর ও গাংনী), আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, আনসার ও ভিডিপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীবৃন্দ, ইউনিয়ন দলনেতা, দলনেত্রী, আনসার কমান্ডার এবং সদস্য-সদস্যারা উপস্থিত ছিলেন।

