
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ, দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে। খাজনা পরিশোধ, হোল্ডিং খোলা, নামজারি, পর্চা উত্তোলনসহ ভূমি অফিসের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি আদালতে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নামেও ভূমি মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মে নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও কাজ না হওয়ায় একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে সেবা প্রত্যাশীদের। এভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন সেবা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মাসে লাখ টাকারও বেশি বাড়তি আয়ের অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসের বিভিন্ন কাজের জন্য আদায় করা অর্থের একটি অংশ ওপর মহলে দিতে হয় বলেও তিনি কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছে দাবি করেছেন। তবে ওপর মহলে কারা রয়েছেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসের সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ এখন এক ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। খাজনা পরিশোধের মতো সাধারণ কাজেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হচ্ছে। নামজারি, হোল্ডিং খোলা কিংবা বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে হয়রানি আরও বেশি। কোনো ভূমি মালিক প্রতিবাদ করলে কিংবা অতিরিক্ত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাঁকে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।
জুগিন্দা গ্রামের আব্দুল করিম বলেন, তহশিলদার হুমায়ুন কবির ইচ্ছেমতো অফিস করেন। প্রয়োজনের সময় তাঁকে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অনেক সময় অফিসে গিয়েও তাঁর দেখা মেলে না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেন না। ফলে জমিজমাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাজ করতে গিয়ে আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গাড়াডোব গ্রামের হামিদুল ইসলাম বলেন, ভূমি মালিক ও সেবা প্রত্যাশীদের অনেকটা জিম্মি করে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোনো বিষয়ে কিছু বলতে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। সাধারণ মানুষ জমিজমাসংক্রান্ত কাজে বাধ্য হয়ে ভূমি অফিসে যায়। আর সেই সুযোগেই তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ধানখোলা গ্রামের হাফিজুল ইসলাম বলেন, খাজনা পরিশোধ করার জন্য দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। সহজ একটি কাজ করতেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সময়মতো সেবা না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
আড়পাড়া গ্রামের রহিদুল ইসলাম বলেন, তহশিলদার হুমায়ুনকে খুশি করলে খাজনা কমে যায়। খুশি না করলে খাজনার পরিমাণ বেড়ে যায়। অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বিভিন্ন কাজে অযথা হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এদিকে ওই কর্মকর্তার কর্মস্থলসংক্রান্ত বিধিবিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থল ধানখোলা ইউনিয়নে হলেও তিনি নিজ কর্মস্থলের বাইরে সদর এলাকায় বসবাস করেন। পাশাপাশি সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভূমি অফিস সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সেবাকেন্দ্র। কৃষিজমি, বসতভিটা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি কিংবা জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাজে প্রতিনিয়ত মানুষকে এই অফিসে যেতে হয়। সেখানে ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সরকারি সেবার মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, সাধারণ মানুষের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের দাবি, ধানখোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। সরকারি সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, তদন্ত প্রতিবেদনের নামে টাকা নেওয়া এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এ বিষয়ে তহশিলদার হুমায়ুন কবিরের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।

