
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামে প্রায় ছয় যুগেরও বেশি সময় ধরে ভোগদখলে থাকা জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা, জমিতে থাকা পেঁপে গাছ কর্তন এবং লাগানো ঘাস কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নজু গংয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা বিরাজ করছে। ঘটনার পর সুষ্ঠু বিচার ও পারিবারিক নিরাপত্তা চেয়ে দর্শনা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে দলিল সূত্রে জমিটির মালিক বাবর আলীর সন্তানরা। তবে কয়েক মাস ধরে আক্কাস আলীর ওয়ারিশগণের সঙ্গে অপর পক্ষের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং থানায় বসে আপস-মীমাংসাও করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
ভুক্তভোগী বাবর আলীর ওয়ারিশ মো. রাজু আহমেদ জানান, তার বাবা ও চাচারা তাদের বড় চাচা মো. জাবের আলীর কাছ থেকে সাব-কবলা রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে মোট ৪.৪৩ একর জমি বৈধভাবে ক্রয় করেন। প্রায় ৭৪ বছর ধরে ওই জমি তাদের পরিবার শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছে এবং সেখানে চাষাবাদ করছেন।
কিন্তু একই গ্রামের আক্কাস আলীর ওয়ারিশগণ মো. নজরুল ইসলাম (নজু), মো. আহসান হোসেন (আসান), মো. বাদল, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. সাইদুল, মো. সাইফুল, মো. শরিফুল ইসলাম (শরীফ), মো. আসাদুল ইসলাম, মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (তেলু), মো. সিরাজুল ইসলাম, মো. আরিফুল ইসলাম ও মো. ছানোয়ার হোসেন (ছানু) ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিবাদীরা একাধিকবার জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশ করেছে, চাষাবাদে বাধা দিয়েছে এবং বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছে। তবে তারা যদি প্রকৃত মালিক হয়, তাহলে কাগজপত্র দেখিয়ে আইনি বা সামাজিকভাবে বিষয়টি সমাধান করতে পারে। কিন্তু ফসল নষ্ট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিযোগে বলা হয়, গত শুক্রবার ছয়ঘরিয়া মাঠে বিবাদীরা জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা চালায় এবং জমিতে থাকা পেঁপে গাছ কেটে ও লাগানো ঘাস তুলে নিয়ে যায়।
এর আগে ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে রাজু, তার বাবা আব্দুর রশিদ ও চাচাতো ভাই মিলন জমি চাষ করতে গেলে নজু গংয়ের লোকজন সেখানে গিয়ে তাদের মারধর করে জোরপূর্বক জমি থেকে বের করে দেয় এবং চাষাবাদ বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পারকৃষ্ণপুর মৌজার ময়না গাড়ি মাঠে অবস্থিত আরেকটি জমিতে একইভাবে আব্দুর রশিদ, রাজু ও মিলনকে মারধর করে জমি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অবৈধ ভূমি দখলের বিষয়টি স্থানীয় থানা বিএনপির সভাপতির কাছে জানানো হলে তিনি গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। ভুক্তভোগীরা তাদের বৈধ দলিল উপস্থাপন করলেও অভিযুক্ত পক্ষ জমির মালিকানার কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলে দাবি করা হয়। এ সময় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিযুক্তদের অবৈধভাবে জমি দখল থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।
পরে নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে আইনগত সহায়তা চান। পুলিশ সুপার বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে থানায় উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই করে বাবর আলীর ওয়ারিশদের দখলে জমি থাকবে মর্মে আপস-মীমাংসা করা হয়।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আপসনামায় স্বাক্ষরের পরও বিবাদীরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে পুনরায় জমিতে চাষাবাদে বাধা দিচ্ছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে ভুক্তভোগী পক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ও ১০৭ ধারায় চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত নজু বলেন, “আমাদের জমি ফাঁকি দিয়ে তারা কাগজপত্র করে দীর্ঘদিন ভোগদখল করে আসছিল। এখন আমরা কাগজপত্র পেয়ে আমাদের পাওনা জমি দখলে নিয়েছি।”
এ বিষয়ে দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মো. হিমেল রানা বলেন, “জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানে ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

