
মেহেরপুরের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ভাই এবং যুবলীগ নেতা শহীদ সরফরাজ মৃদুলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদালতের নির্দেশ দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ব্যবসায়ী অংশীদার দেবাশীষ কুমার বাগচির দায়ের করা এনআই এ্যাক্টের অধীনে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলাটি যেভাবে আইনি পরিণতির দিকে এগোচ্ছে, তা ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের জন্য একটি কড়া বার্তা।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দায়ের করা এই মামলায় আদালত নিয়মমাফিক বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালত যখন আসামিকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার দ্বিগুণ জরিমানা অর্থাৎ ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে আইনের চোখে সবাই সমান। বিবাদী পক্ষ নির্ধারিত সময়ে আপিল না করায় সাজাটি চূড়ান্ত হয় এবং বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা অনুযায়ী সম্পত্তি ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তির খতিয়ান আদালতের নির্দেশে আসামির ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা সমপরিমাণ সম্পদের তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেহেরপুর ও হরিরামপুর মৌজার প্রায় ৩.৩৬ একর জমি এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী। এই বিশাল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের মাধ্যমে বাদি দেবাশীষ কুমার বাগচির পাওনা আদায়ের যে পথ প্রশস্ত হয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। সাধারণত রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভয় পান, কিন্তু এই মামলার অগ্রগতি প্রমাণ করে যে ধৈর্য ও আইনি লড়াই বৃথা যায় না।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) জানিয়েছেন যে, জেলা প্রশাসকের বদলিজনিত কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, তবুও আগামী সপ্তাহের মধ্যে আদেশ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি আশাব্যঞ্জক। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, “Justice delayed is justice denied”। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সম্পত্তি ক্রোকের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করে। তাই মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের উচিত হবে কোনো প্রকার চাপের মুখে না নতি স্বীকার করে আদালতের এই রায়টি দ্রুত কার্যকর করা।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, মন্ত্রীর আত্মীয় বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হলে আইনের উর্ধ্বে থাকা যায়। কিন্তু শহীদ সরফরাজ মৃদুলের এই মামলাটি সেই মিথ ভেঙে দিচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়িক অংশীদারকে ঠকানো বা চেক জালিয়াতির মতো অপরাধ যে পার পায় না, তা এই রায়ের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেবাশীষ কুমার বাগচির আইনি জয় কেবল এক ব্যক্তির জয় নয়, এটি সকল ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। মেহেরপুর জেলা প্রশাসন যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে সফলভাবে এই সম্পত্তি ক্রোক সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমরা আশা করি, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পাবে এবং সমাজ থেকে জালিয়াতি ও ক্ষমতার দাপট নির্মূল হবে। আইনের এই কঠোর প্রয়োগ যেন কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে না হয়ে সর্বস্তরে বজায় থাকে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

