
ধার করা টাকায় বীজ কিনেছিলেন। ভোরের আঁধারে মাঠে গেছেন, রোদ-ঝড় উপেক্ষা করে সারাদিন পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় দেখলেন মোচায় দানা নেই। মাঠ শূন্য। আর বুকের ভেতরে একটাই প্রশ্ন এখন কী হবে? এটি কোনো একজন কৃষকের গল্প নয়; চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার কৃষকের এবারের মৌসুমের বাস্তব চিত্র।
বাংলাদেশের ভুট্টার অন্যতম প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চুয়াডাঙ্গা। অথচ এ মৌসুমে আলমডাঙ্গায় যা ঘটেছে, তা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয় বরং মানবসৃষ্ট বিপর্যয় বলে অভিযোগ উঠেছে। নকল বীজ, ভেজাল সার এবং বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজারো কৃষক।
উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১৩ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন। কিন্তু মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে বিঘাপ্রতি ৪০-৫০ মণ ফলনের কথা, সেখানে কৃষকরা পাচ্ছেন মাত্র ১৫-২০ মণ। জগন্নাথপুর, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিঘা জমির ভুট্টার মোচায় দানা নেই। গাছ ও মোচা থাকলেও ভেতরে শূন্য যার জন্য কৃষকরা নকল বীজকে দায়ী করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে নামীদামী কোম্পানির মোড়কে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নকল ও নিম্নমানের বীজ। বাইরে থেকে বোঝার উপায় না থাকায় তারা প্রতারিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে সারের বাজারেও চলছে কারসাজি। অসাধু ব্যবসায়ী চক্র সিন্ডিকেট করে সারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে, চাহিদার সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে এবং ভেজাল সার বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ এক কৃষক বলেন, “কৃষি কর্মকর্তারা শুধু পরামর্শ দেন। কিন্তু নকল বীজে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যায়, আর সেই ডিলারদের কিছুই হয় না। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। আমরা এখন কার কাছে বিচার চাইব?”
কৃষক পিন্টু রহমান বলেন, “ঋণ করে ভুট্টার বীজ কিনেছি। ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু এখন দেখি মোচায় দানা নেই। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব এই চিন্তায় ঘুম আসে না।”
কৃষক বিপুল আলী বলেন, “সার আর বীজ কিনতে যা ছিল সব শেষ করেছি। দোকানদারের কথা বিশ্বাস করে বুনেছি। কিন্তু ফলন নেই বললেই চলে। পুরো মাঠ এখন শূন্য। কৃষি অফিসে বললেও শুধু পরামর্শ পাই, বাস্তব কোনো সমাধান নেই।”
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান পলাশ বলেন, চুয়াডাঙ্গার মাটি ভুট্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে একই জমিতে বারবার ভুট্টা চাষের ফলে মাটির উর্বরতা কমছে। তিনি বিকল্প হিসেবে গম চাষের পরামর্শ দেন এবং জানান, বাজার সিন্ডিকেট দমনে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। পাশাপাশি অনুমোদিত ডিলার ছাড়া বীজ না কেনার আহ্বান জানান তিনি।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন যারা ইতোমধ্যে ঋণের বোঝা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য এই পরামর্শ কতটা কার্যকর? প্রতি বছর কৃষি খাতে বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবের কারণে নকল বীজ ও ভেজাল সারের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের দাবি নকল বীজ ও ভেজাল সার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, মাঠপর্যায়ে বাজার তদারকিতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ।
এই দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে চুয়াডাঙ্গার কৃষি ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

