
ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানায় আশরাফুল ইসলাম নামের এক সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ডেকে এনে ১৪ ঘণ্টা আটকে রাখার পর একটি হত্যা মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগে গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাত ১২টার দিকে উপজেলার গাড়াগঞ্জের বড়দা ব্রিজ এলাকা থেকে তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত তাকে শৈলকুপা থানার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময় আটকে রাখার কোনো কারণই জানায়নি পুলিশ। ওই সাংবাদিকের পরিবারের দাবি, ১৪ ঘণ্টা আটকে রাখার পর কেন বা কী উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলো তা স্পষ্ট নয়। অথচ সংঘর্ষে হত্যার শিকার মোহন শেখ তার চাচাতো দাদা হন।
আশরাফুল ইসলাম বাংলা এডিশনের ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি এবং ঝিনাইদহ মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি শৈলকুপা উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আক্কাচ আলীর ছেলে। পূর্বে তার নামে কোনো মামলা নেই বলে জানিয়েছে শৈলকুপা থানার পুলিশ।
আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী শান্তা খাতুন বলেন, শনিবার রাতে তার স্বামী আশরাফুল ইসলাম স্ত্রীর বাবার বাড়ি ব্রাহিমপুর গ্রামে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাত ১২টার দিকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বড়দা ব্রিজ এলাকায় ডেকে আনেন শৈলকুপা থানার এসআই তরিকুল ইসলাম। থানার ওসি ওই সাংবাদিকের সঙ্গে চা খাবেন জানিয়ে তাকে শৈলকুপা থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে থানায় তাকে প্রায় ১৪ ঘণ্টা আটক রাখা হয়।
আশরাফুলের বাবা আক্কাচ আলী বলেন, “আমার ছেলে পেশায় একজন সংবাদকর্মী। সে দীর্ঘদিন ধরে জেলা শহরে বসবাস করে আসছে। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও পুলিশ তাকে থানায় ১৪ ঘণ্টা আটকে রেখে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। আমার ছেলে নিরপরাধ। যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেই মামলার বাদী আমার আপন চাচাতো ভাই। যিনি হত্যার শিকার হয়েছেন, তিনি আমার ছেলের আপন চাচাতো দাদা। আমার ছেলেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।”
মামলার বাদী মোহন শেখের ছেলে হারুন অর রশিদ বলেন, “গত ২৩ এপ্রিল সকালে আমার বাবাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। এ ঘটনায় ৪২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করি। অথচ রোববার দুপুরে সেই মামলায় আমার আপন চাচাতো ভাতিজা আশরাফুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আমার বাবা হত্যার ঘটনায় ভাতিজা জড়িত নয়। ষড়যন্ত্র করে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার ভাতিজা সাংবাদিকতা করে, জেলা শহরে থাকে। সে হত্যার সঙ্গে জড়িত নয় এ কথা জানালেও পুলিশ তাকে আদালতে পাঠিয়েছে।”
শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা জানান, “একটি মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আশরাফুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তিকে আটক রাখা হয়েছিল। এখন তাকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।” কী মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, “আদালতে খোঁজ নিয়ে মামলার বিবরণ জেনে নিন।”
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাংবাদিক আশরাফুল ইসলামকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, নিহতের সঙ্গে তার নিবিড় পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। মামলার এজাহারে নাম না থাকার পরও তাকে গ্রেপ্তার এবং স্বয়ং বাদীর আপত্তির বিষয়টি পুলিশের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনাকে ‘আইনের অপপ্রয়োগ’ হিসেবে অভিহিত করে নিন্দা জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতেই এই নাটকীয় গ্রেপ্তারের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জেলার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা অবিলম্বে ওই সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।

