
একই ব্যক্তি একই সাথে একটি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং আবার একই ইউনিয়নের সরকারি কাজী (বিবাহ রেজিস্ট্রার)!
সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান বা কোষাগার থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার আইনি নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মু. আলম হুসাইনের বিরুদ্ধে এমন নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
তিনি তিনটি পদ থেকেই নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছেন।
সম্প্রতি মেহেরপুর প্রতিদিনে এই সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের একটি চিঠির প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গাংনী উপজেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন।
তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মু. আলম হুসাইন ২০১৮ সালে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী করমদি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তার যোগদানের পর থেকেই ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, প্রায় ৫৫৩ জন শিক্ষার্থী ও ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী সম্বলিত বিদ্যালয়টিতে প্রশাসনিক স্থবিরতা ও শিক্ষার মান ধসে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায় যে, প্রধান শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে আসেন না। ফলে অন্য শিক্ষকেরাও নিজেদের ইচ্ছামতো চলেন এবং সুন্দর খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও কোনো খেলাধুলার আয়োজন করা হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একজন মানুষের পক্ষে একই সাথে একটি পুরো ইউনিয়ন পরিষদ ও বিদ্যালয় পরিচালনা করা অসম্ভব। বিদ্যালয়টি বর্তমানে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো কাজিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া আলম হুসাইন সপ্তাহে মাত্র এক থেকে দুই দিন পরিষদে আসেন। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মতিয়ার রহমান জানান, জরুরি কাজের জন্য নাগরিকদের চেয়ারম্যানের ‘হাড়াভাঙ্গা’ এলাকার নিজস্ব অফিসে গিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে আনতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম হয়রানি ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেহেরপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে কাজিপুর ইউনিয়নের কাজী (বিবাহ রেজিস্ট্রার) হিসেবে নিয়োগ পান আলম হুসাইন। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা অনুযায়ী, কাজী নিয়োগ কমিটির অন্যতম সদস্য হলেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আলম হুসাইন তৎকালীন সময়ে চেয়ারম্যান পদে থেকে নিজেই নিজের নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন, যা চরম স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এবং নীতিবহির্ভূত।
সরকারি চাকুরিজীবী আইন ও এমপিও নীতিমালা মোতাবেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পদে কর্মরত থেকে অন্য কোনো লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকা চাকুরির শর্তাবলির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ মোতাবেক একজন কাজী সংশ্লিষ্ট এলাকা ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে সবেতনে (মাসিক বেতন বা আর্থিক সুবিধায়) চাকরি করতে পারবেন না।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ মোতাবেক কোনো জনপ্রতিনিধি একই সাথে সরকারের অন্য কোনো লাভজনক পদে বা সবেতন চাকুরিতে অধিষ্ঠিত থাকতে বা একাধিক উৎস থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন না।
সম্প্রতি মাউশি’র জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছে, এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীর একই সময়ে দুটি লাভজনক পদ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই।
ফলে তাঁকে এমপিও বেতন-ভাতা অথবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা সদস্য হিসেবে প্রাপ্য সম্মানী যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে।

