
মেহেরপুরে মাচা পদ্ধতিতে দেশীয় জাতের লাউ চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে তাপপ্রবাহের কারণে কিছুটা ফলন কম হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় সন্তুষ্ট তারা। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় তিনগুণ লাভের আশা করছেন চাষিরা।
জেলার বিভিন্ন মাঠে সবুজে ঘেরা মাচায় ঝুলছে শত শত লাউ। গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামের কৃষক বাবলু হোসেন প্রতি বছরের মতো এবারও অন্যান্য সবজির পাশাপাশি লাউ চাষ করেছেন। তিনি জানান, এবার দুই বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে লাউয়ের আবাদ করেছেন। শুরু থেকেই সঠিক পরিচর্যা, উন্নত মাচা তৈরি, পরিমিত সার প্রয়োগ ও সেচ ব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষেতে ভালো ফলন এসেছে।
তিনি আরও বলেন, চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই লাউ বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিটি লাউ পাইকারি বাজারে ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহে তিন দিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি লাউ উত্তোলন করা যাচ্ছে। এক বিঘা জমিতে বাঁশের খুঁটি, তার, চারা ও জমি প্রস্তুতে খরচ হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তবে এই অবকাঠামো ব্যবহার করে একাধিক মৌসুমে চাষ করা সম্ভব। প্রতি বছর এক বিঘা জমি থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকার লাউ বিক্রি করা যায় বলে জানান তিনি।
শুধু বাবলু হোসেন নন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক কৃষকই এখন মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে বরবটি, ধনিয়া, ঢেঁড়স, লালশাকসহ অন্যান্য সবজি চাষ করছেন, যা থেকে অতিরিক্ত আয় করা যাচ্ছে।
জুগিন্দা গ্রামের কৃষক ফয়জা জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে লাউয়ের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে বরবটি চাষ করেছেন। বরবটি একদিন পরপর তুলে বাজারে বিক্রি করা যায়, এতে নিয়মিত আয় হচ্ছে। বর্তমানে লাউ গাছেও ভালো ঝাঁলি ধরতে শুরু করেছে, এতে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি। তার মতে, মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ লাভজনক, কারণ এতে রোগবালাই কম হয় এবং একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করা যায়।
বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের লাউচাষি ফকির মাহমুদ বলেন, লাউয়ের মাচা পদ্ধতি এখন আমাদের এলাকায় অনেকেই করছেন। এ পদ্ধতিতে লাউ চাষে খরচ একটু বেশি হলেও একবার মাচা তৈরি করলে কয়েকবার ব্যবহার করা যায়। লাউ চাষে শুরুতে একটু পরিশ্রম বেশি, কিন্তু গাছ বড় হলে পরিচর্যা সহজ হয়ে যায়। এবার গরমের কারণে কিছু ফুল ঝরে গেছে, তবুও যা লাউ হচ্ছে তাতে খারাপ না। বাজারে দাম ভালো থাকায় লাভের আশা করছি।
কৃষকদের ভাষ্যমতে, মাচা পদ্ধতিতে চাষ করলে গাছ মাটির সংস্পর্শে কম থাকে, ফলে রোগবালাই ও সেচ খরচ কমে। পাশাপাশি লাউয়ের গুণগত মান ভালো হওয়ায় মেহেরপুরের উৎপাদিত লাউয়ের চাহিদা রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত মেহেরপুরে লাউ চাষ এখন অনেক কৃষকের আর্থিক স্বচ্ছলতার অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেলায় ৩১০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছরে সেই আবাদ বেড়ে ৩০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪০ হেক্টরে।
এ বছর লাউ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ২০০ টন। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে শতকোটি টাকার লাউ বিক্রির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা জানান, মাচা পদ্ধতির পাশাপাশি মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাউ চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘসময় ধরে রাখা যায়, আগাছার পরিমাণ কমে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে উৎসাহিত করার ফলে জেলায় লাউয়ের আবাদ বাড়ছে এবং কৃষকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

