
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খানের মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী পদের বেতন ও ঈদুল আজহার উৎসব ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্তটি প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটি ও অধ্যক্ষ এমপিও বিধিমালা অনুযায়ী যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্য একটি বড় ধরনের বার্তা।
খবরে প্রকাশ, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি খাতা-কলমে শিক্ষক পদে বহাল থাকলেও মাদ্রাসায় নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য কারও মাধ্যমে বেতন শিটে স্বাক্ষর করিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা এমপিওভুক্ত তহবিল থেকে সুবিধা গ্রহণের মতো অনৈতিক অভিযোগও উঠেছে। একজন শিক্ষক যখন দেশের আইনপ্রণেতা বা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন তাঁর কাঁধে জাতীয় ও আঞ্চলিক দায়িত্ব অর্পিত হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নিজ এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা তাঁর মূল ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। এমন এক মহান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও একটি স্থানীয় মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী পদের ক্ষুদ্র সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা চরম নৈতিক স্খলনের শামিল।
সংসদ সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্র থেকে প্রটোকল, বেতন, ভাতা ও অন্যান্য বহুবিধ আকর্ষণীয় সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা একজন সাধারণ শিক্ষকের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এরপরেও নিয়মবহির্ভূতভাবে মাদ্রাসার চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং বিনা ছুটিতে বা ছদ্ম-উপস্থিতির মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি কেবল ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকারকেই ক্ষুণ্ন করেনি, বরং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দেরিতে হলেও মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটি ও অধ্যক্ষ বিধি মোতাবেক এমপি মহোদয়ের বেতন-ভাতা বন্ধের যে সাহসী ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। আইন সবার জন্য সমান—এই বাক্যটি যে শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও প্রয়োগ করা সম্ভব, মানিকনগর মাদ্রাসার এই পদক্ষেপ তা প্রমাণ করে। ক্ষমতার দাপটে প্রতিষ্ঠানের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানোর যে অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে জেঁকে বসেছে, তা ভাঙার জন্য এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
আশা করি, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর যে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত ও আইনানুগ নির্দেশনা আসবে। একই সাথে, মাননীয় সংসদ সদস্যও নিজের ভুল অনুধাবন করে নৈতিক অবস্থান থেকে মাদ্রাসার চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি নেবেন এবং নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করবেন। জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও সততা হওয়া উচিত প্রশ্নাতীত, কারণ তাঁদের দিকেই তাকিয়ে থাকে পুরো সমাজ ও আগামী প্রজন্ম।

