
মায়ের সম্পত্তি বোনদের নাদিয়ে জাল করে নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ায় বোনের মামলায় কারাগারে গেলেন ৩ ভাই। আরেক ভাই ইংল্যাণ্ডে পলাতক রয়েছেন।
গতকাল গাংনী আমলী আদালতে হাজির হয়ে দুই ভাই জামিন চাইলে বিচারক নাসিম উদ্দিন ফারাজি তাদের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এক ভাই রবিবার রাতে পুলিশের হাতে আটক হন। ঘটনাটি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াবাড়ীয়া গ্রামে।
তিন ভাই হলেন, গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের মৃত সামুসজ্জোহা বিশ্বাসের ছেলে সামসুল ইসলাম খোকন, ইমদাদুল হক ও হেলাল। মামলা বাদি তাদের বোন আখতার বানু। মামলা নম্বর-১১৩৫/২০২৪।
বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান ও তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার আরজিতে বাদির অভিযোগ, আসামিরা বাদীনির আপন সহদোর ভাই। মৃত মজিরা খাতুন বাদীনি বিবাদীদের মা হইতেছে। তাদের মা গত ইং ০৪/০৫/২০২৩ তারিখে মৃত্যু বরণ করেন। তাদের মা মারা যাওয়ার পর বাদীনি ও বিবাদীগন ওয়ারিশ থাকেন। ওয়ারিশ সনদপত্র অনুযায়ী বিবাদীরা ৪ ভাই ও বাদীনিরা তিন বোন বাদীনি নিজেসহ মোছাঃ মোমেনা খাতুন, মোহাঃ আরিফা খাতুন। তারা সকলে বিবাহিত।
প্রত্যেকের স্বামী, সন্তান ও সংসার রহিয়াছে। বাদীনির মা জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় আসামিরা গত ২০০৪ সালেল ১ এপ্রিল ২৭৭৫ নং হেবা দলিল মূলে রেজিঃ করিয়া দিয়া নিঃস্বত্ববান হন। বাদীনির মা হেবা দলিল মুলে নিম্ন তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি পাওয়ার পর স্বত্ব দখল থাকাবস্থায় গত ২০২৩ সালের ৬ মে মৃত্যুবরণ করিলে আমরা ৩ বোন ও আসামীরা ওয়ারিশ থাকে। মা মৃত্যুর পর বাদীনির ৩ বোন নিম্ন তফসিল বর্ণিত সম্পত্তির ওয়ারিশ সুত্রে নালিশী জমি ১২ শতক জমির অংশ থাকে। বিবাদীরা বোনদের ন্যায্য অধিকার হইতে বা তাদের ৩ বোন এর অংশ ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রতারনা ও আত্মসাৎ করিবার কু-মতলবে বোনদের অংশ না দেখাইয়া তাহা সংশ্লিষ্ট রেজিঃ অফিসের কর্মচারী কর্মকর্তাকে গোপন করিয়া সম্পূর্ণরুপে জালিয়াতির মাধ্যমে আসামিরা যোগসাজস মূলে ভুল বুঝাইয়া বিবাদীরা ৪ ভাই একে অপরকে ৪ খানা ভুয়া দলিল সৃষ্টি করিয়া সমম্পূর্ণরূপে তঞ্চকি মুলে রেজিঃ করিয়া নিয়ে উল্লেখিত বাদীনি সহ ৩ বোনের প্রাপ্য ১২ শতক জমি জবর দখল করে এবং ৪ খানা ভুয়া দলিল কাথুলি ভূমি অফিসে দাখিল করিয়া নামজারি করে নেয়। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর গাংনী সাব-রেজিঃ অফিস হইতে কপি উত্তোলন করিয়া নাম জারি কেসে আপত্তি জানাইলে বিবাদীরা বোনদের আপন ভাই হওয়ায় তাহারা আপোষে তাদের হিস্যা মতো নিম্নে তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি ফেরত দিতে চাহিয়া ফেরৎ না দিয়ে ঘুরাইতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তারা ফেরত দেবে না বলে জানিয়ে দেয়।
এদিকে, আদালতের নির্দেশে কুষ্টিয়া পিবিআই মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনের পিবিআই বলেন যে, বাদীনি আখতার বানুর বাবার পরিবারে ৪ ভাই (বিবাদী) ও ৩ বোন। বর্তমানে সবাই বিবাহিত, তাদের পৃথক-পৃথক সংসার আছে। ৩ বোনের মধ্যে মেঝো বোন আরিফা খাতুন ২০২৪ সালে মৃত্যু বরণ করেছে। নালিশী জমি রেকর্ডীয় মালিক ও তার ওয়ারিশদের মধ্যে সুষম বন্টনের নিমিত্তে ০১.০৪.২০০৪ খ্রি. তারিখে ২৭৭৫ নম্বর পারিবারিক বন্টন দলিলের মাধ্যমে তাদের বর্ণিত তফসিলের জমি বন্টন দলিল সম্পাদিত হয়। উক্ত দলিল মুলে বাদীনির মা মোজিরা খাতুন, স্বামী-শামসুজ্জোহা বিশ্বাস ২নং গাড়াবাড়িয়া মৌজার ৩১৪ নম্বর খতিয়ান ভুক্ত ৬০৮ নম্বর দাগের শ্রেণি ধানী ০.৭৪০০ একরের মধ্যে ০.৬৬০০ একর জমির মালিকানা অর্জন করেন। অবশিষ্ট ০.০৮০০ (৮শতক) একর জমি শামসুল আলম প্রাপ্ত হন। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) মোতাবেক বাদীনির মা মোজিরা খাতুনের ০.৬৬০০ (৬৬ শতক) একর জমির ন্যায্য হিস্যা মোতাবেক প্রত্যেক ভাই চার জনে ১২ শতক করে মোট ৪৮ শতক এবং প্রত্যেক বোন ৬ শতক করে তিন বোন মোট ১৮ শতক জমি পাবে।
প্রতিবেদনে পিবিআই উল্লেখ করেন, আসামিরা দন্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
অপরদিকে, মেহেরপুর পৌর ভূমি কর্মকর্তা পৃথক প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
আদালতের বিচারক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত ২৭ এপ্রিল আসামি আপন চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
গত ৩মে রবিবার পুলিশ সামসুল ইসলাম খোকনকে আটক করে। গতকাল বুধবার সামসুল আলমের অপর দুই ভাই ইমদাদুল হক ও হেলালখান সহ তিনজন জামিন আবেদন করলে আদালত তাদের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলায় বাদি পক্ষে অ্যাড. কামরুল হাসান এবং আসামী পক্ষে রফিকুল ইসলাম, পল্লব ভট্টাচার্য, মারুফ আহমেদ বিজন, মোখলেসুর রহমান স্বপন আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেন।

