
মহান আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বকে ˆবচিত্র্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে তিনি যে ভিন্নতা রেখেছেন, তার মূল রহস্য হলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা|
সমাজে কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র; কেউ মালিক, আবার কেউ শ্রমিক| তবে এই পার্থক্য কোনো আভিজাত্যের লড়াই নয়, বরং সামাজিক শৃঙ্খলা ও কর্মবন্টনের এক বিশেষ ব্যবস্থা মাত্র| ইসলামি জীবনদর্শনে শ্রম কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত এবং নবীদের পবিত্র সুন্নত| আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মেষ চরিয়েছেন, শ্রমসাধ্য ব্যবসা পরিচালনা করেছেন এবং খন্দকের যুদ্ধের বিভীষিকাময় মুহূর্তেও সাধারণ মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিখা খনন করেছেন| তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, নিজ হাতের শ্রমলব্ধ উপার্জনই হলো শ্রেষ্ঠতম উপার্জন| এই একটি বাণীতেই শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা আসমানে আসীন হয়েছে।
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক নিছক ‘প্রভু ও ভৃত্যের’ রুক্ষ কোনো সমীকরণ নয়, বরং এটি হলো হৃদয়ের মায়ায় জড়ানো এক সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন| একজন শ্রমিকের প্রথম এবং প্রধান অধিকার হলো তার হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য মূল্য পাওয়া| শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে টালবাহানা করা বা কাজ শেষে পাওনা পরিশোধ না করাকে ইসলামে চরম ঘৃণ্য ও জঘন্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে| হাদীসে কুদসীতে ¯^য়ং মহান রব্বুল আলামিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কিয়ামতের কঠিন দিনে তিনি সেই মালিকের বিপক্ষে ¯^য়ং শত্রু হয়ে দাঁড়াবেন, যে ব্যক্তি কাজ আদায় করে নিয়েও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করেনি| শ্রমিকের হাহাকার আর চোখের জল আরশের মালিক সইতে পারেন না| তাই তো রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালজয়ী নির্দেশ দিয়েছেন— ‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই চুকিয়ে দাও|’ এই নির্দেশ কেবল একটি আইনি কাঠামো নয়, বরং শ্রমিকের প্রতি মালিকের সহমর্মিতা ও দ্রুত ন্যায়বিচারের এক অনুপম স্মারক।
মালিকের ওপর অর্পিত অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো শ্রমিকের সামর্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া| কোনো মানুষকে তার শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতার বাইরে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করা ইসলামের নীতি বিরুদ্ধ| মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মালিকপক্ষকে উদ্দেশ্য করে সতর্ক করেছেন যে, যাদের তোমরা নিয়োগ দিয়েছ তারা তোমাদের দাস নয়, বরং তোমাদেরই ভাই| আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনে রেখেছেন মানে এই নয় যে তোমরা তাদের ওপর জুলুম করবে| বরং যদি কোনো কাজ তাদের জন্য অধিক কষ্টকর হয়, তবে মালিকের উচিত নিজে সেই কাজে হাত লাগিয়ে তাদের সহযোগিতা করা| ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, হযরত সালমান ফারসী (রা.) যখন একটি প্রদেশের গভর্নর ছিলেন, তখনো তিনি নিজ হাতে আটা পিষতেন যেন তার খাদেমের ওপর কাজের অতিরিক্ত বোঝা না চাপে| এই যে সহমর্মিতা, এটিই হলো মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
একজন শ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করা মালিকের ˆনতিক ও ধর্মীয় আবশ্যকতা| মালিক যেন নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে অহংকারের সাগরে ভেসে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে ইসলাম| একজন শ্রমিক যে খাবার ˆতরি করেন, আগুনের তাপ আর ধোঁয়ার কষ্ট সহ্য করে মালিকের মুখে অন্ন তুলে দেন, তাকে অবজ্ঞা করার কোনো অবকাশ নেই| রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভব হলে শ্রমিককে নিজের সাথে একই দস্তরখানে বসিয়ে খাওয়াতে হবে| আর যদি খাবারের পরিমাণ কম হয়, তবে অন্তত এক-দুই লোকমা হলেও তাকে দিতে হবে| এতে প্রকাশ পায় যে, ইসলাম কেবল অর্থনৈতিক সমতা নয়, বরং আত্মিক ও মানসিক সমতায় বিশ্বাসী।
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের আত্মিক উন্নতির পথ সুগম করাও মালিকের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত| শ্রমিক আপনার অধীনস্থ হতে পারে, কিন্তু সে সবার আগে মহান আল্লাহর বান্দা| তাই তার ইবাদত-বন্দেগি, বিশেষ করে নামাজ ও রোজার মতো ফরজ ইবাদত পালনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া মালিকের জন্য আবশ্যক| কাজের দোহাই দিয়ে কাউকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়| একইসাথে, মানুষ হিসেবে শ্রমিকের ভুল হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক| তুচ্ছ কোনো ভুলের কারণে তাকে গালমন্দ করা, প্রহার করা বা চাকরিচ্যুত করা ইসলামের মহানুভবতার পরিপন্থী| যখন জনৈক সাহাবী জানতে চাইলেন তিনি তার খাদেমকে দিনে কতবার ক্ষমা করবেন, রহমতের নবী উত্তর দিলেন— দৈনিক সত্তর বার’| নিজের সন্তান ভুল করলে আমরা যেভাবে স্নেহের পরশ দিয়ে তা ঢেকে রাখি, শ্রমিকের ভুলকেও সেই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা ইসলাম আমাদের দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, শ্রমিকরা হলো সমাজের জীবনীশক্তি, যাদের ঘাম আর ত্যাগের বিনিময়েই গড়ে ওঠে সভ্যতার সুউচ্চ মিনার| আজকের মালিক হয়তো কাল ভাগ্যচক্রে শ্রমিকে পরিণত হতে পারেন, কারণ ভাগ্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ| তাই ক্ষমতার দাপট ভুলে শ্রমিকের মানবিক অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হওয়া প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানি দায়িত্ব| যদি কর্মক্ষেত্রে মালিকগণ নবীজির শেখানো ক্ষমা, সহমর্মিতা এবং ইনসাফের নীতি অনুসরণ করেন, তবে দুনিয়াতে যেমন শান্তি নেমে আসবে, তেমনি আখেরাতেও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হবে| আসুন, আমরা শ্রমিকের প্রতি দয়ালু হই, তাদের প্রাপ্য সম্মান দেই এবং ইসলামের সুমহান ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করি| মহান আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সংকলকঃ লেখক ও গবেষক

