
জেলার সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র যখন নিজেই তীব্র ‘রোগাক্রান্ত’ হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকার যে কতটা বিপন্ন হতে পারে, তার এক নির্মম বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতিতে।
গতকাল মঙ্গলবার মেহেরপুর প্রতিদিনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক রোগী চিকিৎসাধীন থাকছেন, যাদের অধিকাংশেরই প্রধান উপসর্গ জ্বর, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য ঋতুপরিবর্তনজনিত রোগ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ২৫০ শয্যার এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে লুকিয়ে আছে অত্যন্ত দুর্বল ও অপ্রতুল এক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার হলেও এখনো চলছে মাত্র ১০০ শয্যার পুরোনো জনবল কাঠামো দিয়ে, যা জেলার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
সরকারি নথিপত্রে এই হাসপাতালটিকে বড় আকারে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মেহেরপুরের সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।
যেখানে শয্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আনুপাতিক হারে জনবল, ওষুধ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সেখানে হাসপাতালটি চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ১০০ শয্যার কাঠামো অনুযায়ী যেখানে ৪১টি চিকিৎসকের পদ রয়েছে, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, হাসপাতালের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন সিনিয়র মেডিসিন কনসালটেন্ট দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
তদুপরি, একজন মাত্র অ্যানেসথেসিস্ট ছিলেন, তাকেও জরুরিভাবে বদলি করায় বর্তমানে হাসপাতালের মেজর অপারেশনগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একটি আধুনিক জেলা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। হাসপাতালের আধুনিক ৫ শয্যার আইসিইউ ওয়ার্ড থাকলেও ডেডেকেটেড জনবলের অভাবে কাঙ্খিত সেবা মিলছে না। ৩টি জীবনরক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্সের বিপরীতে চালক আছেন মাত্র ১ জন।
এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই; শয্যাহীন রোগীদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঋতু পরিবর্তনের ফলে শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা ও পেটের পীড়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং ধূমপানে আসক্ত ব্যক্তিরা এই শ্বাসকষ্টের প্রধান শিকার হচ্ছেন। এই বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে হাসপাতালে কর্মরত নার্স ও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও, এই অপ্রতুল জনবল নিয়ে মানসম্মত ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চিকিৎসকের অভাবের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ও সেবামূলক সহায়তার অভাব রোগীদের জীবনকে দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়কের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন মহলকে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে জানালেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান আসেনি। বরং সংকট আরও ঘনীভূত করে এখান থেকে চিকিৎসক বদলি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই ধরণের বৈষম্যমূলক চিকিৎসকদের বদলি নীতি এবং নতুন পদায়নে অবহেলা প্রান্তিক জনপদের মানুষের প্রতি এক ধরণের চরম অবিচার। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে এভাবে উপেক্ষিত রেখে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়।
মেহেরপুরের সাধারণ মানুষের এই তীব্র চিকিৎসাকষ্ট দূর করতে অবিলম্বে জরুরি ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, হাসপাতালের জন্য ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো দ্রুত অনুমোদন এবং তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে দক্ষ চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিতে হবে এবং বন্ধ থাকা অপারেশন থিয়েটার চালু করতে অনতিবিলম্বে অ্যানেসথেসিস্টের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আইসিইউ-এর মতো জীবনরক্ষাকারী ইউনিটকে ডেডিকেটেড জনবল নিয়োগ করতে হবে। জেলা শহরের এই প্রধান হাসপাতালের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং জনগণের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর মেহেরপুরবাসীর এই মানবিক সংকটের গুরুত্ব অনুধাবন করে অবিলম্বে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক করার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

