
মু. আলম হুসাইন একাধারে একটি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং একই ইউনিয়নের সরকারি কাজী (বিবাহ রেজিস্ট্রার)।
আইন অনুযায়ী একই ব্যক্তি সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান বা কোষাগার থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিধান না থাকলেও, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মু. আলম হুসাইনের ক্ষেত্রে ঘটছে তার উল্টোটা। তিনটি পদ থেকেই তিনি নিয়মিত নিচ্ছেন সরকারি বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা।
ত্রিমুখী দায়িত্বের বেড়াজালে পড়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজই ঠিকমতো হচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, অন্যদিকে চরম নাগরিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন ইউনিয়নবাসী। অভিযুক্ত চেয়ারম্যান নিজেও এই অব্যবস্থাপনার কথা আংশিক স্বীকার করেছেন।
বিদ্যালয়ে হ য ব র ল অবস্থা
অনুসন্ধানে জানা যায়, মু. আলম হুসাইন ২০১৮ সালে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী করমদি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু যোগদানের পর থেকেই বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ ধসে পড়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, “হেডস্যার স্কুলে ঠিকমতো আসেন না। সেই সুযোগে অন্যান্য শিক্ষকরাও নিজেদের ইচ্ছামতো স্কুলে আসেন, মন চাইলে ক্লাস নেন। আমাদের কত সুন্দর খেলার মাঠ আছে, অথচ কোনো খেলাধুলা করানো হয় না।”
প্রধান শিক্ষকের এই অনুপস্থিতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, একজন মানুষ একই সাথে পুরো একটা ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন না। দুটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে ম্যানেজ করা অসম্ভব। এর ফলে বিদ্যালয়টি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে কারিগরি শাখাসহ প্রায় ৫৫৩ জন শিক্ষার্থী এবং ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন, যারা এখন প্রশাসনিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
সপ্তাহে ১-২ দিন যান ইউপিতে, সেবা পেতে ছুটতে হয় ‘নিজস্ব অফিসে’
কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, মু. আলম হুসাইন ২০১১ সালে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি পুনরায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বর্তমানেও পদে বহাল আছেন।
ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মতিয়ার রহমান জানান, চেয়ারম্যান একই সাথে প্রধান শিক্ষক ও কাজীর দায়িত্ব পালন করায় সপ্তাহে মাত্র এক থেকে দুই দিন পরিষদে আসেন। জরুরি কোনো কাজ বা স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে নাগরিকদের চেয়ারম্যানের ‘হাড়াভাঙ্গা’ এলাকার নিজস্ব অফিসে গিয়ে কাজ করিয়ে আনতে হয়। এতে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্বজনপ্রীতি ও বিধিবহির্ভূত কাজী নিয়োগের অভিযোগ
মেহেরপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৮ জুন কাজিপুর ইউনিয়নের কাজী (বিবাহ রেজিস্ট্রার) হিসেবে নিয়োগ পান আলম হুসাইন। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা অনুযায়ী, কাজী নিয়োগ কমিটির অন্যতম সদস্য হলেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আলম হুসাইন তৎকালীন সময়ে চেয়ারম্যান পদে থেকে নিজেই নিজের নিয়োগ কমিটিতে ছিলেন, যা চরম স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এবং নীতিবহির্ভূত।
কী বলছে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিমালা?
আইন ও বিধি অনুযায়ী মু. আলম হুসাইনের এই একাধিক পদে থাকা এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
সরকারি চাকুরিজীবী আইন ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পদে কর্মরত থেকে অন্য কোনো লাভজনক পদে (যেমন- নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কাজী) নিয়োজিত থাকতে পারেন না। এটি চাকুরির শর্তাবলির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, একজন কাজী সংশ্লিষ্ট এলাকা ব্যতীত অন্য কোনো এলাকার কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় সবেতনে (মাসিক বেতন বা আর্থিক সুবিধায়) চাকরি করতে পারবেন না। আলম হুসাইন ২০১৮ সালে সবেতনে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিয়ে এই বিধি সরাসরি লঙ্ঘন করেছেন।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধি একই সাথে সরকারের অন্য কোনো লাভজনক পদে বা সবেতন চাকুরিতে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। তদুপরি, সরকারি কোষাগার বা একাধিক উৎস থেকে একই সাথে একাধিক আর্থিক সুবিধা (ভাতা ও বেতন) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
অভিযুক্ত ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মু. আলম হুসাইন অস্বীকার না করে বলেন, “সারাদেশে এমন অনেকেই আছেন। তিনটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব জায়গায়তেই ঝামেলা যে হয় না, তা বলবো না। তবে আমি সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি নাগরিক সেবা দিতে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন মিটিং ও পরীক্ষার কারণে উপজেলা অফিসে যেতে হয়, তাই নিয়মিত স্কুলে যাওয়া হয় না। তবে পরিবেশ ভালো করার চেষ্টা করছি।”
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং করমদি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা কাজিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সরকারি ভাতাটা দিচ্ছি। বিদ্যালয়ের বিষয়টি আমার জানা ছিল না, খোঁজখবর নিয়ে দেখবো। যদি আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জেলা রেজিস্ট্রার সালাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, “পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান কাজী নিয়োগ কমিটির সদস্য থাকেন। সেই কমিটিতে থেকে তিনি কীভাবে নিজে কাজী হলেন তা তৎকালীন কমিটিই বলতে পারবে। তবে একজন কাজী অন্য কোথাও সবেতনে চাকরি করতে পারবেন না, এটি নিয়মের পরিপন্থী। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা মন্ত্রণালয়ে জানাবো এবং নির্দেশানুযায়ী ব্যবস্থা নেব।”
মেহেরপুরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (ডিডি এলজি) পার্থ প্রতিম শীল বলেন, “একজন ব্যক্তি কোনোভাবেই সরকারের একাধিক কোষাগার বা উৎস থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন না। বিষয়টি যেহেতু এখন আমাদের নজরে এসেছে, তদন্তপূর্বক দ্রুত এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, অতি দ্রুত এই অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক এবং ইউনিয়নবাসীকে প্রশাসনিক হয়রানি থেকে মুক্ত করা হোক।

